|
| |
সোমবার, ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

কীভাবে কম কাজ করে বেশি ফল পাবেন? কৌশল জানুন

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:৫৯ এএম
১৮৬ পঠিত
কীভাবে কম কাজ করে বেশি ফল পাবেন? কৌশল জানুন
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
অনেকেরই মনে হয়, দিনের ২৪ ঘণ্টা প্রয়োজনীয় কাজের জন্য যথেষ্ট নয়। প্রতিদিন কাজের তালিকা দীর্ঘ হয়, কিন্তু সব কাজ শেষ করা সম্ভব হয় না। এতে মানসিক চাপ বাড়ে এবং কাজের প্রতি অনীহাও তৈরি হতে পারে।

দিনের ২৪ ঘণ্টা কি কাজের তুলনায় কম মনে হয়? প্রতিদিনের কাজের তালিকা শেষ করতে গিয়ে কি হিমশিম খেতে হয়? অনেক পরিশ্রম করার পরও কি মনে হয়, প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য আসছে না?

এমন সমস্যার সমাধানে সময় ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদনশীলতা নিয়ে আলোচিত একটি ধারণা হতে পারে ৮০/২০ নীতি। ব্রিটিশ পরামর্শক, লেখক ও বিনিয়োগকারী রিচার্ড কখ তাঁর ‘দ্য ৮০/২০ প্রিন্সিপল: অ্যাচিভ মোর উইথ লেস’ বইয়ে এই নীতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, বেশি কাজ করলেই যে বেশি ফল পাওয়া যাবে, এমন নয়। বরং কোন কাজগুলো সবচেয়ে বেশি ফল বয়ে আনে, তা চিহ্নিত করে সেগুলোতে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।

এই ধারণা শুধু কর্মক্ষেত্রের জন্য নয়; ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক, অবসর কাটানো এবং মানসিক প্রশান্তি অর্জনের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে এর অর্থ দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া কিংবা সব কাজ কমিয়ে দেওয়া নয়। বরং সময় ও শ্রম কোথায় ব্যয় হচ্ছে, তা বুঝে গুরুত্বপূর্ণ কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

৮০/২০ নীতি কী
৮০/২০ নীতি ‘প্যারেটো নীতি’ নামেও পরিচিত। ইতালীয় অর্থনীতিবিদ ভিলফ্রেডো প্যারেটো (১৮৪৮-১৯২৩) উনিশ শতকের ইংল্যান্ডে সম্পদ ও আয়ের বণ্টন নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তিনি দেখতে পান, সম্পদের বড় একটি অংশ তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের হাতে ছিল ৮০ শতাংশ সম্পদ।

পরবর্তী সময়ে এই ধারণা অর্থনীতি ও ব্যবসা ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। এর মূল কথা হলো, সব প্রচেষ্টা বা কাজ সমান পরিমাণ ফল দেয় না। অনেক ক্ষেত্রে অল্প কিছু কাজ থেকেই অধিকাংশ ফল পাওয়া যায়।

ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠানের মোট আয়ের ৮০ শতাংশ আসে তার ২০ শতাংশ পণ্য, ক্রেতা কিংবা নির্দিষ্ট কিছু কার্যক্রম থেকে। সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে, কোন পণ্য বা কার্যক্রম সবচেয়ে বেশি আয় এনে দিচ্ছে, তা শনাক্ত করা। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী সেসব ক্ষেত্রে বেশি সময়, অর্থ ও শ্রম বিনিয়োগ করা যেতে পারে।

উদ্যোক্তা হওয়ার ধারণার সঙ্গেও বিষয়টির সম্পর্ক রয়েছে। ফরাসি অর্থনীতিবিদ জ্যঁ-বাতিস্ত সে ১৮০০ সালের কাছাকাছি সময়ে ‘এন্টারপ্রেনিউরশিপ’ ধারণাটির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে দেখিয়েছিলেন, একজন উদ্যোক্তা কম উৎপাদনশীল ক্ষেত্র থেকে সম্পদ সরিয়ে বেশি উৎপাদনশীল ও লাভজনক ক্ষেত্রে কাজে লাগান। অর্থাৎ সাফল্যের জন্য শুধু পরিশ্রম করাই যথেষ্ট নয়; সেই পরিশ্রম কোথায় কাজে লাগানো হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে মনে রাখা প্রয়োজন, ৮০ ও ২০ শতাংশ এখানে একটি সাধারণ অনুপাত। সব ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা পরিস্থিতিতে এই অনুপাত হুবহু মিলে যাবে, এমন নয়। মূল বিষয় হলো, অল্প কিছু কাজ অনেক বেশি ফল দিতে পারে—এমন প্রবণতা শনাক্ত করা।

ব্যক্তিগত জীবনেও প্রযোজ্য এই নীতি
কর্মক্ষেত্রের বাইরেও ৮০/২০ নীতির প্রয়োগ সম্ভব। জীবনের কোন কাজগুলো সবচেয়ে বেশি আনন্দ, তৃপ্তি কিংবা মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়, তা ভেবে দেখা যেতে পারে।

কারও ক্ষেত্রে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা কিংবা প্রকৃতির মধ্যে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করা মানসিক প্রশান্তির বড় উৎস হতে পারে। আবার কেউ বই পড়া, গান শোনা কিংবা পছন্দের কোনো সৃজনশীল কাজে সময় দিয়ে আনন্দ পান। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন হতে পারে, দৈনন্দিন জীবনের কোন কাজগুলো সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে? কোন সম্পর্কগুলো মানসিকভাবে সমৃদ্ধ করছে? কোন কাজগুলো সময় নিলেও তেমন কোনো উপকার বয়ে আনছে না?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে সময় ব্যবহারের ধরন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তখন সব কাজ সমান গুরুত্ব দিয়ে করার পরিবর্তে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে বেশি সময় দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

তবে মানুষকে কেবল উৎপাদনশীলতার মাপকাঠিতে বিচার করা ঠিক নয়। মানুষ কোনো যন্ত্র বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়, যার কাজ শুধু কম খরচে বেশি ফল উৎপাদন করা। জীবনের উদ্দেশ্যও শুধু কাজের পরিমাণ বাড়ানো কিংবা সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করা নয়। সৃজনশীলতা, সম্পর্ক, আনন্দ ও মানসিক সুস্থতারও নিজস্ব মূল্য রয়েছে।
তাই সময় ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য হওয়া উচিত, জীবনে সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া।

সময়ের অভাব, নাকি সময় ব্যবহারে সমস্যা
অনেকেরই মনে হয়, দিনের ২৪ ঘণ্টা প্রয়োজনীয় কাজের জন্য যথেষ্ট নয়। প্রতিদিন কাজের তালিকা দীর্ঘ হয়, কিন্তু সব কাজ শেষ করা সম্ভব হয় না। এতে মানসিক চাপ বাড়ে এবং কাজের প্রতি অনীহাও তৈরি হতে পারে। রিচার্ড কখের মতে, সমস্যাটি অনেক সময় সময়ের প্রকৃত অভাব নয়; বরং সময় ব্যবহারের ধরন। তাঁর প্রস্তাব হলো, কম গুরুত্বপূর্ণ কাজে অতিরিক্ত সময় ব্যয় না করে অধিক ফলদায়ক কাজগুলোতে মনোযোগ দেওয়া।

ধরা যাক, একজন চাকরিজীবী প্রতিদিন ই-মেইল দেখা, সভায় অংশ নেওয়া, প্রতিবেদন তৈরি, নতুন কাজের পরিকল্পনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সময় ব্যয় করেন। দিনের শেষে দেখা গেল, জরুরি প্রতিবেদন তৈরির কাজটি অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। সে ক্ষেত্রে প্রতিটি কাজের জন্য সমান সময় বরাদ্দ না দিয়ে কাজের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী সময় ভাগ করা যেতে পারে।

একইভাবে, একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনার জন্য অনেক সময় ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পেতে পারেন। তখন শুধু পড়ার সময় বাড়ানোর পরিবর্তে কোন পদ্ধতিতে পড়লে বেশি শেখা হচ্ছে, কোন বিষয়গুলোতে বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার এবং কোন অভ্যাসগুলো সময় নষ্ট করছে, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

৮০/২০ নীতির প্রয়োগে কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ কমিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজে বেশি সময় দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কখের মতে, সবচেয়ে ফলদায়ক কাজগুলোতে সময় দ্বিগুণ করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে কম সময় কাজ করেও আগের চেয়ে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। তবে এটি তাঁর প্রস্তাবিত ধারণা, সব পেশা বা পরিস্থিতিতে নিশ্চিত ফলের নিশ্চয়তা নয়।

সব কাজ নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না
৮০/২০ নীতির একটি সীমাবদ্ধতা হলো, প্রত্যেকের পক্ষে নিজের সময় ও কাজের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব নয়।

অনেকের পরিবার ও সন্তানের দায়িত্ব রয়েছে। কাউকে পরিবারের অন্য সদস্যদের দেখাশোনা করতে হয়। অনেক চাকরিজীবীকে নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে কাজ করতে হয়। অফিসের সভা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশনা, সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় কিংবা জরুরি দায়িত্বের কারণে সব সময় নিজের পছন্দমতো কাজ সাজানো যায় না।

বাংলাদেশের কর্মজীবীদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। দীর্ঘ যাতায়াত, যানজট, নির্দিষ্ট অফিস সময়, পারিবারিক দায়িত্ব এবং কর্মক্ষেত্রের অতিরিক্ত চাপের কারণে অনেকের অবসর সীমিত হয়ে পড়ে। একজন কর্মীর পক্ষে সব কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ দেওয়া কিংবা নিজের ইচ্ছামতো কর্মঘণ্টা কমানো সব সময় সম্ভব নয়। এ কারণে বাস্তবসম্মত উপায় হলো, নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিষয়গুলো চিহ্নিত করা। কোন কাজ কখন করা হবে, কীভাবে কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে, অপ্রয়োজনীয় অনলাইন ব্যবহার কতটা কমানো সম্ভব কিংবা কোন কাজ অন্য কারও সহায়তায় করা যায়—এসব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।

নিজের সময় ব্যবহারের হিসাব যেভাবে করবেন
৮০/২০ নীতি প্রয়োগের সহজ উপায় হলো, একটি সাধারণ কর্মদিবসে কীভাবে সময় কাটছে, তার হিসাব রাখা। এতে কোন কাজে কতটা সময় ব্যয় হচ্ছে এবং কোন কাজগুলো সবচেয়ে বেশি ফল দিচ্ছে, তা বোঝা সহজ হবে।

প্রথমে দিনের বিভিন্ন কাজের একটি তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। এরপর প্রতিটি কাজে ব্যয় করা সময়ের আনুমানিক হিসাব লিখে রাখতে হবে। ব্যক্তির পেশা ও দায়িত্ব অনুযায়ী সময়ের বণ্টন ভিন্ন হবে। কেউ দিনের বড় অংশ যাতায়াতে ব্যয় করেন, কেউ গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলেন, আবার কেউ লেখালেখি, প্রশিক্ষণ কিংবা গবেষণায় সময় দেন।

সময়ের এই হিসাব তৈরির পর কয়েকটি প্রশ্ন নিয়ে ভাবা যেতে পারে।

১. কোন কাজগুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
যে কাজগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে, সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে। সাফল্যের সংজ্ঞা সবার জন্য এক নয়। কারও কাছে তা কাজের মান, কারও কাছে আয়, আবার কারও কাছে শেখা, মানুষের উপকার করা কিংবা সৃজনশীল কিছু তৈরি করা।

২. গুরুত্বপূর্ণ কাজে আরও বেশি সময় দেওয়া সম্ভব কি না?
কম গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যয় করা সময় কিছুটা কমিয়ে প্রয়োজনীয় কাজের জন্য সময় বাড়ানো যায় কি না, তা দেখতে হবে। এতে কাজের মান উন্নত হতে পারে।

৩. কোন কাজগুলো কমানো বা বাদ দেওয়া সম্ভব?
যেসব কাজ খুব কম ফল দিচ্ছে, সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা দরকার। অপ্রয়োজনীয় সভা, বারবার নোটিফিকেশন দেখা কিংবা উদ্দেশ্যহীনভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের মতো অভ্যাস কমানো সম্ভব হতে পারে।

৪. কোন কাজগুলোতে ‘না’ বলা যায়?
সব অনুরোধ গ্রহণ করা সম্ভব নয়। কোনো কাজ নিজের দায়িত্বের বাইরে হলে, সময়ের তুলনায় তার গুরুত্ব কম হলে কিংবা জরুরি কাজের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে ভদ্রভাবে না বলার প্রয়োজন হতে পারে। তবে কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে।

এই বিশ্লেষণ সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান দেবে না। তবে এটি কাজের অগ্রাধিকার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারে। কোন কাজে সময় দেওয়া প্রয়োজন এবং কোন কাজে সময় ব্যয় কমানো যায়, তা বোঝার ক্ষেত্রে এটি সহায়ক হতে পারে।

লেখা: আনা ক্যাথারিনা শ্যাফনার/সাইকোলজি টুডে

সূত্র: প্রথম আলো