টাইমড আউট: নাজমুল–সাকিবের বিতর্কিত কাণ্ডে আজ নড়েচড়ে বসেছিল ক্রিকেট–বিশ্ব
গণমাধ্যম ডেক্স
নাজমুল হোসেনকে এমনিতে দেখে পাশের বাড়ির সুবোধ ছেলে বলেই মনে হয়। কিন্তু বাড়ি থেকে বের হয়ে মাঠে নামলে ভিন্ন কথা। ওই যে কথায় আছে না, ‘দুষ্টের শিরোমণি লঙ্কার রাজা, চুপিচুপি খায় চানাচুর ভাজা!’
টেস্ট অধিনায়ককে ‘রাজা’ বিবেচনা করলে শুধু ‘লঙ্কা’র জায়গায় ‘বাংলাদেশ’ বসিয়ে নিলেই হয়। অধিনায়ক নাজমুল যে মাঠে দুষ্টুমিতেও কম যান না, সেটা প্রতিপক্ষ দলের ব্যাটিংয়ের সময়ই বোঝা যায়। মানসিক চাপে রাখতে অম্লমধুর স্লেজিং চালিয়ে যান। কিন্তু আজ যে নাজমুলের কথা বলা হচ্ছে, সেটা এই নাজমুল নয়।
তিন বছর আগের সেই নাজমুলের কাঁধে অধিনায়কত্বের ভার ছিল না। কিন্তু চোখ–কান সজাগ ছিল এখনকার মতোই। সেদিন অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুসের সেই ‘ট্রেন’ মিস করার সুবিধাটা নাজমুলই টের পেয়েছিলেন সবার আগে।
আক্ষরিক অর্থেই ট্রেন মিস নয়। মাঠের বিশেষ এক পরিস্থিতি বোঝাতে রূপকভাবে কথাটি বলা। তিন বছর আগে দিল্লিতে ওয়ানডে বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেই ম্যাচে ম্যাথুস সত্যি সত্যিই ব্যাটিং করার ‘ট্রেন’ মিস করেছিলেন! অপরাধী কে? লঙ্কানদের মুখে এখন সেই স্বীকারোক্তি প্রকাশ না পেলেও তাঁদের মনের কাঠগড়ায় নাজমুল অথবা সাকিব আল হাসান যে এখনো দাঁড়িয়ে, তা আন্দাজ করে নেওয়া যায়। আর বাংলাদেশ দল বলতে পারে, অপরাধী আর কে—‘টাইমড আউট’–এর নিয়ম!
ঘটনাটা এবার নিশ্চয়ই ধরতে পেরেছেন।

যেভাবে ঘটল
আগে ব্যাট করা শ্রীলঙ্কার রান তখন ৪ উইকেটে ১৩৫। নতুন ব্যাটসম্যান হিসেবে মাঠে এলেন অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস। কিন্তু উইকেটে গিয়ে দেখলেন, তাঁর হেলমেটের স্ট্র্যাপে কোনো একটা সমস্যা। সম্ভবত ওটা ছেঁড়াই ছিল। ড্রেসিং রুমে ইশারা করলেন নতুন হেলমেটের জন্য। অতিরিক্ত খেলোয়াড়ের মাধ্যমে নতুন হেলমেট আনতে কিছুটা দেরি হলো। এই সময় অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুসের বিপক্ষে টাইমড আউটের আপিল করে বাংলাদেশ।
ক্রিকেটের আইনপ্রণেতা এমসিসির ওয়েবসাইটে ‘টাইমড আউট’ অংশে ৪০.১.১ ধারায় বলা হয়েছে, ‘উইকেট পতনের পর কিংবা ব্যাটসম্যান রিটায়ার্ড হওয়ার পর নতুন ব্যাটসম্যান ৩ মিনিটের মধ্যে পরবর্তী বলের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত হবেন। এই শর্ত পূরণ করতে না পারলে নতুন ব্যাটসম্যান আউট হবেন। টাইমড আউট।’
তবে সেই বিশ্বকাপে আইসিসির প্লেয়িং কন্ডিশনে বলা হয়েছিল, ৩ মিনিট নয়, ব্যাটসম্যানকে পরবর্তী বলের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত থাকতে হবে ২ মিনিটের মধ্যে। হেলমেট বদলাতে গিয়ে ম্যাথুস নিয়মে বেঁধে দেওয়া এ সময়ের মধ্যে ব্যাটিংয়ে প্রস্তুত থাকতে পারেননি। ফলে বাংলাদেশের আপিল ও ক্রিকেটের আইন মেনে ম্যাথুসকে টাইমড আউট দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না আম্পায়ারদের।
টিভি পর্দায় দেখা যায়, আউটের সিদ্ধান্তের পর মাঠেই ম্যাথুস আম্পায়ারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেন ম্যাথুস। একপর্যায়ে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক সাকিবের সঙ্গেও কথা বলেন। সাকিব তাঁকে আম্পায়ারদের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। সিদ্ধান্ত পাল্টাননি আম্পায়াররা। তাতে প্রথমবারের মতো টাইমড আউট দেখে ফেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আর সে আউটেরই তিন বছর পূর্তি আজ।
#OnThisDay in 2023 ODI World Cup Angelo Mathews became the 1st batter to be timed-out in International Cricket. It was against BAN at Delhi in the 2023 ODIWC. https://t.co/lbnsm0tKu9
— SportsGully Cricket (@sportsgullycric) November 6, 2026
বুদ্ধির ঝিলিকটি কার
ম্যাথুসকে টাইমড আউট করতে আম্পায়ারদের কাছে আবেদন করেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক সাকিব। আম্পায়াররা তাঁকে আবেদনটা বিবেচনা করার কথা বললেও সাকিব শোনেননি। পরে সংবাদ সম্মেলনে সাকিব জানিয়েছিলেন, দলের এক ক্রিকেটারই প্রথম তাঁকে জানান, আবেদন করলে আউট হয়ে যাবেন ম্যাথুস। সাকিব নিজে সেই ক্রিকেটারের নামটা কখনোই বলেননি।
তবে বুদ্ধিটা যিনি দিয়েছিলেন, সেই ক্রিকেটার নিজেই মুখ খুলেছেন ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। বর্তমান টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন। সে ম্যাচে সাকিবের সহকারী অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলেন নাজমুল।
সাক্ষাৎকারে নাজমুল বলেছিলেন, ‘আমি কাভারে দাঁড়ানো ছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম, ও (অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস) তো আসতে দেরি করছে! আম্পায়ার মারেকে (মারাই এরাসমাস) গিয়ে বললাম, এখন তো আমরা আপিল করলে ও আউট! ম্যাথুস ততক্ষণে দেরি করে ফেলেছে। হেলমেটের ফিতা ছিঁড়েছে, সেটা কিন্তু পরে। আমি বুঝতে পারছিলাম, ও তার আগেই দেরি করে ফেলেছে। আম্পায়ারও তা–ই বলেছেন। বলেছেন, “নিয়ম অনুযায়ী তোমরা আপিল করলে ও আউট। কিন্তু তোমরা তো আপিল করবে না।” আমি তখন সাকিব ভাইয়ের কাছে গিয়ে বললাম, “ভাই, এখন কিন্তু আপিল করলে ম্যাথুস আউট।” সাকিব ভাই চমকে উঠে বলেন, “তাই নাকি!” তখন উনি আপিল করেন। আমরা দলের প্রত্যেক খেলোয়াড় অধিনায়কের এই সিদ্ধান্তে সমর্থন জানিয়েছি।’
সেই আউটের পর ক্রিকেট–বিশ্বের সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় বাংলাদেশ দল। বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের পক্ষে দু-একজন বলেছিলেন, কিন্তু বিশ্বের বেশির ভাগ ক্রিকেট ব্যক্তিত্বই বলেছেন, ম্যাথুসকে টাইমড আউট করে বাংলাদেশ ক্রিকেটের চেতনাবিরোধী কাজ করেছে। তবে নাজমুল তা একদমই মনে করেন না। সেই সাক্ষাৎকারেই বলেছিলেন, ‘ওই ম্যাচটা আমাদের জিততে হতো। নয়তো আমরা চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলতে পারতাম না। এটা তো ছোটখাটো জিনিস নয়! আর ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এটা যদি খেলার চেতনার বিরুদ্ধে যায়, তাহলে এই আইনটাই খেলায় থাকবে না। কেন রেখেছে এটা?’

ম্যাথুসের প্রতিক্রিয়া
আউট হওয়ার মুহূর্তে ক্ষোভ জমাই স্বাভাবিক। গত বছর সেটা স্বীকারও করেছিলেন শ্রীলঙ্কার সাবেক এই অলরাউন্ডার। গলে বাংলাদেশের বিপক্ষে ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট খেলতে নামার আগে সংবাদ সম্মেলনে ম্যাথুস বলেছিলেন, ‘আমার তখন রাগ ও হতাশা ছিল। ভুল কিছু করিনি। ম্যাচের পর যখন ম্যাচ রেফারি ও আম্পায়ারদের ভিডিওটা দেখাই, তখন তাঁরা ভুল বুঝতে পেরে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।’
তবে সেই ঘটনা নিয়ে কোনো ক্ষোভ যে মনে পুষে রাখেননি, সেটাও বলেছিলেন ম্যাথুস, ‘ঘটনাটা খুব দুর্ভাগ্যজনক। তারা আমার বন্ধু, তাদের বিপক্ষে (ব্যক্তিগতভাবে) আমার কিছু নেই। আমাদের সঙ্গে সব সময় ভালো (আচরণ) করেছে ওরা। ওই সময় আমাদের কিছু বাক্যবিনিময় হয়েছিল, কিন্তু আমি ক্ষোভ ধরে রাখি না। ক্ষোভ ক্রিকেটের জন্য খারাপ শব্দ।’
ক্রিকেটে টাইমড আউট কতবার
টেস্ট ক্রিকেটে টাইমড আউট এখনো দেখা যায়নি। ওয়ানডেতে একবার—সেটা ম্যাথুসের ওই ঘটনা। ছেলে ও মেয়েদের আন্তর্জাতিক টি–টুয়েন্টি মিলিয়ে এই আউট দেখা গেছে দুবার। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এমন ঘটনা আছে সাতবার।
সূত্র: প্রথম আলো