ট্রাম্পের সমালোচনায় ওবামার পাশে কেন প্রগতিশীলেরা
গণমাধ্যম ডেক্স
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে নেমেছেন। ওহাইও ও মিশিগানে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করেছেন। অথচ প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ওবামা নিজেও প্রায় একই ধরনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন।
গত সপ্তাহে প্রকাশিত হার্ভার্ড ইয়ুথ পোলের জরিপে দেখা গেছে, নিবন্ধিত তরুণ ভোটারদের দুই-তৃতীয়াংশ কংগ্রেসে ডেমোক্রেটিক পার্টির কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট। তরুণ ডেমোক্র্যাটদেরও প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ চান, ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা দেওয়া বন্ধ হোক। তা সত্ত্বেও ডেমোক্র্যাট ও প্রগতিশীল রাজনীতিকেরা নির্বাচনী প্রচারে ওবামাকে ব্যবহার করছেন। অথচ তাঁর নিজের শাসনামলের রেকর্ডও যথেষ্ট বিতর্কিত।
ওবামাকে বলা হতো ‘ডিপোর্টার-ইন-চিফ’, অর্থাৎ অভিবাসীদের সর্বাধিক বহিষ্কারকারী প্রেসিডেন্ট। তাঁর আমলে ৩০ লাখের বেশি অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
ক্ষমতা গ্রহণের আগে ওবামা বলেছিলেন, অতীতের দিকে না তাকিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকানো উচিত। এই যুক্তিতে তিনি বুশ প্রশাসনের নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিচারের উদ্যোগ নেননি। এখন ডেমোক্র্যাটরা তরুণ ভোটারদের চাওয়া পরিবর্তনের বদলে সাবেক নেতাদের সামনে এনে পুরোনো নীতিই টিকিয়ে রাখতে চাইছেন।
হাজার হাজার আশ্রয়প্রার্থী মা ও শিশুকেও বন্দী করা হয়। ২০১৪ সালে পরিবারসহ অভিবাসীদের আটক রাখার ব্যবস্থা আবার চালু হয়। পরের বছর এ ধরনের বন্দী রাখার সক্ষমতা ১০০টির কম শয্যা থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ করা হয়েছিল। অন্য অভিবাসীদের নিরুৎসাহিত করার যুক্তিতে এই নীতি নেওয়া হলেও পরে একটি ফেডারেল আদালত তা আটকে দেন।
এখন সেই ওবামাই ট্রাম্পকে ‘বিশৃঙ্খলা, নিষ্ঠুরতা, দুর্নীতি ও অযোগ্যতার’ প্রতীক বলে সমালোচনা করছেন। প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প নিষ্ঠুর কি না, তা নয়; ওবামার নিষ্ঠুরতার ইতিহাসও মনে রাখা প্রয়োজন।
ওবামা এখন ইরানে ট্রাম্পের যুদ্ধের সমালোচনা করছেন। ওই যুদ্ধে ২১ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। অথচ তাঁর দুই মেয়াদে আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধে এক লাখের বেশি আফগান ও ইরাকি এবং আড়াই হাজার মার্কিন নাগরিক নিহত হন। প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ওবামার কাছে সাপ্তাহিক হত্যার লক্ষ্যবস্তুর তালিকা থাকত।
২০১১ সালে ইয়েমেনে তাঁর নির্দেশিত ড্রোন হামলায় ১৬ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক আবদুর রহমান আল-আওলাকি নিহত হন।
ইয়েমেন ও আফগানিস্তানে বিয়ের অনুষ্ঠান, পাকিস্তানে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এবং আফগানিস্তানের কুন্দুজে হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনায় মার্কিন হামলায় শত শত মানুষ নিহত হন। ২০১৫ সালে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন যুদ্ধেও তাঁর প্রশাসন গোয়েন্দা তথ্য, রসদ ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহের সহায়তা দিয়েছিল।
২০০৯ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ওবামা। অথচ পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরাকে যুদ্ধ, হন্ডুরাসে গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাতে সমর্থন, আরব ও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্বৈরশাসকের প্রতি সহযোগিতা এবং ইরানে সম্ভাব্য হামলার হুমকির মতো কর্মকাণ্ড তাঁর শাসনামলকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। ইসরায়েলের প্রতিও ছিল তাঁর অকুণ্ঠ সমর্থন।
ইসরায়েলি হামলায় নিহত হাজার হাজার আরব বেসামরিক মানুষের প্রতিও তিনি সমবেদনা জানাননি; বরং ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দেওয়ার সমালোচনা করেন। ইউরোপীয় খ্রিষ্টানদের হাতে ইহুদিদের ওপর সংঘটিত হলোকাস্টের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আরবদের তা উপলব্ধি করতে বলেন। অথচ ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি উপনিবেশবাদী শাসন ও বাস্তুচ্যুতির চলমান ইতিহাস; অর্থাৎ নাকবার কথা এড়িয়ে যান।
অথচ মিশিগানে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী আবদুল রহমান ‘আবদুল’ এল-সাইয়েদ ইসরায়েলের গণহত্যার বিরোধিতা করেন বলে দাবি করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘করপোরেট সমাজতন্ত্রের’ও সমালোচনা করেন তিনি। কিন্তু সেই ওবামার সঙ্গেই তাঁকে নির্বাচনী প্রচারে দেখা যাচ্ছে।
২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটন এবং ২০২০ সালে জো বাইডেনের নির্বাচনী প্রচারেও একই চিত্র দেখা গেছে। তাঁদের ‘কম ক্ষতিকর বিকল্প’ হিসেবে তুলে ধরে সমর্থন আদায় করা হয়েছিল।
ক্ষমতা গ্রহণের আগে ওবামা বলেছিলেন, অতীতের দিকে না তাকিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকানো উচিত। এই যুক্তিতে তিনি বুশ প্রশাসনের নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিচারের উদ্যোগ নেননি। এখন ডেমোক্র্যাটরা তরুণ ভোটারদের চাওয়া পরিবর্তনের বদলে সাবেক নেতাদের সামনে এনে পুরোনো নীতিই টিকিয়ে রাখতে চাইছেন।
জোসেফ মাসাদ নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক আরব রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের অধ্যাপক
মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত
সূত্র: প্রথম আলো