|
| |
শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

নূর আলম ও আদম: দুই পথের দুই মানুষ

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৯:৪৮ এএম
৩১৪ পঠিত
নূর আলম ও আদম: দুই পথের দুই মানুষ
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
আরেকটি কারণ আছে। জোড়হাটে জলমহালের মালিক সাধারণত একজন। অন্য জায়গায় মালিক থাকেন চার-পাঁচজন।

চিলমারী নদীবন্দরের বাজারে নূর আলমের সঙ্গে দেখা হয়। তাঁর বাড়ি কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার রমনা ইউনিয়নের ব্যাপারীপাড়ায়। ৪০ বছর বয়সী মানুষটার মতো শুধু মাছ ধরতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশান্তরি হন এই এলাকার আরও অনেকে। 

২৭-২৮ বছর আগে প্রথম চাচার সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে আসামে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন নূর আলম। তখন পাসপোর্ট-ভিসার এত কড়াকড়ি ছিল না। তাঁর গ্রামের অনেকেই আসামে মাছ ধরতে যেতেন। তাঁদের সঙ্গে যেত ছোট ছেলেরাও। নৌকা আর বাসে
প্রায় দুই দিনের পথ পেরিয়ে তাঁরা পৌঁছাতেন আসামের জোড়হাটে। 

কেন জোড়হাট? নূর আলম বলেন, একেকজন একেক জায়গায় মাছ ধরতে যান। তাঁদের বাপ-দাদারা জোড়হাটে মাছ ধরতেন। সেখানকার মানুষ ভালো।

আরেকটি কারণ আছে। জোড়হাটে জলমহালের মালিক সাধারণত একজন। অন্য জায়গায় মালিক থাকেন চার-পাঁচজন। একজন মালিক হলে জেলেদের ভাগে বেশি মাছ পড়ে। নূর আলম জানালেন, মাছ বিক্রির টাকার ৪০ শতাংশ পান জলমহালের মালিক, বাকি ৬০ শতাংশ জেলেদের।

চিলমারীতেও ব্রহ্মপুত্র, আসামেও ব্রহ্মপুত্র। তবু কেন আসামে যাওয়া? নূর আলমের ব্যাখ্যা, মাছ উজানের দিকে যায়। তা ছাড়া আসামে নদীর মাছ রক্ষায় বছরের কয়েক মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকে। নদীর ধারে বন ও জলাভূমি আছে। সেখানে মাছ বড় হওয়ার সুযোগ পায়। ফলে মাছও বেশি। চাল-সবজির দামও তুলনামূলক কম। নৌকা ভাড়া নিতে হয়, তবে জাল নিজেদের।

যখন মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে, তখন তাঁরা বাড়ি ফিরে আসেন। ফেরার সময় নিজেদের জাল পরিচিত লোকজনের বাড়িতে রেখে আসেন, পরের মৌসুমে আবার ব্যবহার করবেন বলে।

২৭-২৮ বছর আগে প্রথম চাচার সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে আসামে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন নূর আলম। তখন পাসপোর্ট-ভিসার এত কড়াকড়ি ছিল না। তাঁর গ্রামের অনেকেই আসামে মাছ ধরতে যেতেন। তাঁদের সঙ্গে যেত ছোট ছেলেরাও। নৌকা আর বাসে প্রায় দুই দিনের পথ পেরিয়ে তাঁরা পৌঁছাতেন আসামের জোড়হাটে। 

মাছ ধরে ফিরে কখনো এক লাখ, কখনো দুই লাখ, এমনকি পাঁচ লাখ টাকাও আয় করেছেন নূর আলমরা দল বেঁধে। কিন্তু এত বছর মাছ ধরে আয় করেও নূর আলমের জীবনে স্বস্তি আসেনি। তাঁর ছেলে জন্ম থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। স্ত্রী–ও অসুস্থ। স্ত্রী ও সন্তানের চিকিৎসায় তাঁর ১৪-১৫ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে।

নিজের কোনো জমিজমা ছিল না, ঘরও ছিল না। বড় ভাইয়ের দেওয়া সাড়ে তিন শতক জমিতে একটি ঘর তুলেছেন। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ের বয়স এক বছর।

এখন তিনি বেকার। মাঝেমধ্যে বালুর ট্রলারে কাজ করতে যান।

যখন মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে, তখন তাঁরা বাড়ি ফিরে আসেন। ফেরার সময় নিজেদের জাল পরিচিত লোকজনের বাড়িতে রেখে আসেন, পরের মৌসুমে আবার ব্যবহার করবেন বলে।
নূর আলম এখন বেকার

আদমের জমার খাতা

আদমের বয়স ৩৬ বছর। বাবা রফিকুল ইসলাম। বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ফরিদাবাদ, ডাক্তারপাড়ায়। বর্তমানে কুড়িগ্রাম শহরের ঐশী রেস্তোরাঁয় কাজ করছেন। বাবুর্চি হিসেবে এমন দক্ষতা অর্জন করেছেন যে কুড়িগ্রামের মতো শহরেও দৈনিক দেড় হাজার টাকা মজুরি পান। মাসে আয় ৪৫ হাজার টাকা। সামনের মাস থেকে দৈনিক মজুরি বেড়ে ২ হাজার ১০০ টাকা হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

এর বাইরে প্রতি মাসে বিয়ের রান্নার কাজও পান। গড়ে চার-পাঁচটি বিয়ের অনুষ্ঠানে কাজ করেন। প্রতিবার মজুরি পান পাঁচ হাজার টাকা। বিয়ের রান্না থেকে মাসে আরও ২০-২৫ হাজার টাকা আসে। এই বাড়তি আয় তিনি জমিয়ে রাখেন। 

আদমের ভাষায়, ‘সরকারি চাকরিতে যেমন পেনশন থাকে, আমারও তেমন। আমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে কী করব? বাড়িতে যেগুলো দিয়েছি, সেগুলো তো কাজের মধ্যেই বন্ধ। কিছু একটা করতে চাইলে মা বলবে, এটা করা ঠিক হবে? আব্বা বলবে, আচ্ছা থাক। ছোট ভাই মন খারাপ করবে। আর নিজের পুঁজি দিয়ে যখন কিছু করতে চাইব, তখন কেউ কিছু বলবে না। আল্লাহপাক সুস্থ রাখলে দুই বছর পর বাড়িতে যাব।’

গড়ে চার-পাঁচটি বিয়ের অনুষ্ঠানে কাজ করেন। প্রতিবার মজুরি পান পাঁচ হাজার টাকা। বিয়ের রান্না থেকে মাসে আরও ২০-২৫ হাজার টাকা আসে। এই বাড়তি আয় তিনি জমিয়ে রাখেন। 

আদমের বাড়ি ছাড়ার গল্পটা শুনি। ২০০২ সাল; তখন তাঁর বয়স ১১ বছর। বাড়িতে তাঁকে একটি কাজ করতে বলা হয়েছিল। তিনি কাজটি করেননি। অভাবের সংসার, সারা দিন ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া হতো না। বাড়ি থেকে বেরিয়ে তারাগঞ্জ বাজারে দুই দিন কাটান। তৃতীয় দিন রওনা দেন রংপুরের উদ্দেশে। তারপর দিনাজপুর, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট ও গাইবান্ধা ঘুরে এখন কুড়িগ্রামে।

ছোটবেলায় রংপুর-দিনাজপুর চিনতেন না। রংপুরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন দিনাজপুরে। সেখানে একটি হোটেলে ১০-১২ দিন কাজ করেন। বাসস্ট্যান্ডের পাশে ‘মায়ের দোয়া’ নামের একটি ছোট রেস্তোরাঁয়ও কাজ করেছেন। মালিক তাঁকে নিজের ছেলের মতো দেখতেন। কিন্তু সেখান থেকে আবার বাসে চড়ে রংপুরে ফিরে যান।

তখন অনেক জায়গা ঘুরে দেখার ইচ্ছা ছিল। ঘুরতে ঘুরতে নিজের টাকা শেষ হয়ে যায়। হোটেলে কাজ শুরু করেন। রাতে দায়িত্ব পালন করতেন, বিকেলে অবসর পেলে ঘুরে বেড়াতেন।

বাসস্ট্যান্ডের পাশে ‘মায়ের দোয়া’ নামের একটি ছোট রেস্তোরাঁয়ও কাজ করেছেন। মালিক তাঁকে নিজের ছেলের মতো দেখতেন। কিন্তু সেখান থেকে আবার বাসে চড়ে রংপুরে ফিরে যান।

তাঁদের জমিজমা ছিল না। একটি হালের গরু ছিল, সেটিও দাদার। চাচার সংসার ছিল আলাদা, তাঁদের সংসারও আলাদা। তাঁদের থাকার ছোট্ট ঘরটি ছিল খড়ের। একদিকে হাঁস-মুরগি থাকত, অন্যদিকে বাবা-মায়ের সঙ্গে তিন ভাইবোন থাকতেন।

আদমের ভাষায়, ‘বৃষ্টির দিনে বৃষ্টি সরাসরি আমাদের গায়ে পড়ত। ঝড়-তুফান হলে খাটের নিচে ঢুকতাম, এই বুঝি ঘর ভেঙে পড়ে!’

সেই দিন এখন অতীত। আল্লাহর রহমতে এখন তাঁরা পাকা বাড়িতে থাকেন। পাঁচ-ছয় বছর পর তাঁর বাবাও বাড়ি ফিরে এসেছেন। এখন সংসারের মূল চালিকা শক্তি তাঁর মা। টিনের ঘর করার পর বোনের বিয়ে দিয়েছেন। দুই ভাই কর্মক্ষম হয়েছেন। এখন চার ঘরের ছাদঢালাই বাড়ি করেছেন। এখন তাঁদের প্রায় ৬০ শতক জমি আছে। প্রায় ৫১ শতক ধানের জমি, বাকিটা বাড়িভিটা।

কষ্টের জীবন পেরিয়ে আদমের এই জায়গায় পৌঁছানোর পেছনে দুটি বিষয় কাজ করেছে—ক্ষুধা আর মায়ের কষ্ট। তাঁর কথায়, ‘মা একমুঠো ভাত যেভাবে জোগাড় করে এনে দিতেন, তা ভোলার নয়। অনেক সময় আমাদের খাইয়েছেন, নিজে খাননি। এমন দিনও গেছে, ভাত ছিল না। মা আঁটিকলা সেদ্ধ করে খাইয়েছেন। মায়ের এই স্মৃতিগুলো ভোলার মতো নয়।’

আদম মনে করেন, তাঁর সাফল্যের পেছনে তাঁর ওস্তাদ আশরাফেরও বড় অবদান আছে। তিনি বলেন, ‘অনেক ওস্তাদের কাছে কাজ শিখেছি। কিন্তু শেষ দিকে এমন একজন ওস্তাদ পেয়েছিলাম, যিনি আমাকে ছেলের মতো দেখেছেন। নিজের হাতে যত্ন করে শিখিয়েছেন। এক প্লেটে ভাত খাইয়েছেন।’

বাবুর্চির কাজ করেন আদম

আশরাফ ওস্তাদ তাঁকে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে একটি হোটেল উদ্বোধনের জন্য পাঠিয়েছিলেন। হোটেলটি খুব ভালো চলছিল। প্রতিদিন দুই বস্তা করে চাল শেষ হতো। পরে ওস্তাদের দোয়ায় চারটি দোকান উদ্বোধন করেছেন আদম। কুড়িগ্রামে দুটি, নারায়ণগঞ্জে একটি এবং সুন্দরগঞ্জে একটি। সবগুলোই ভালো চলছে।

সঞ্চয়ের খাতা শূন্য

নূর আলম ও আদম—দুজনই নিজ নিজ পেশায় দক্ষ। দুজনই ভালো আয় করেছেন। কিন্তু একজনের সঞ্চয়ের খাতা শূন্য, আরেকজনের সঞ্চয়ের খাতা ভরা।

কথা বলতে গিয়ে বুঝলাম, আয়ের পরিমাণের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সেই আয় ধরে রাখা যাচ্ছে কি না। কারও ভান্ড কেন ফুটো, কারও ঝুড়ির তলা কেন নেই—এই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজলে মাথাপিছু আয় কিংবা জিডিপির সব তত্ত্বই ফাঁকা কলসির মতো বাজতে থাকবে।

এই দুই সাক্ষাৎকার আমাদের রাষ্ট্রের ভেতরের সেই ফুটোটা উন্মোচন করে।

  • নাহিদ হাসান: লেখক ও সংগঠক

সূত্র: প্রথম আলো