মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার হয়ে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন হাকিম জেফ্রিস
গণমাধ্যম ডেক্স
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ২০১৩ সালে যোগ দেন হাকিম জেফ্রিস। এর কিছুদিন পর তাঁর শুরুর দিকের রাজনৈতিক মুরব্বি কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ ডেমোক্র্যাটের সঙ্গে কথা বলেন।
‘আমার মনে হয়, ও-ই সেই মানুষ,’ বলেছিলেন সাবেক কংগ্রেস সদস্য এডি বার্নিস জনসন। সেখানে ছিলেন কংগ্রেস সদস্য ইমানুয়েল ক্লিভার। তাঁর মনে আছে, প্রতিনিধি পরিষদের অধিবেশনকক্ষে নিজের চিরচেনা আসনে বসেই জনসন এ কথা বলেছিলেন।
কয়েক মাসের মধ্যে ওই কৃষ্ণাঙ্গ ডেমোক্র্যাটরা নিয়মিত নৈশভোজে বসতে শুরু করেন। আলোচনার বিষয় ছিল জেফ্রিসের ভবিষ্যৎ। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল, ন্যান্সি পেলোসি অবসর নিলে জেফ্রিস তাঁর জায়গায় স্পিকার হবেন। তাঁরা চেয়েছিলেন, জেফ্রিস যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হোন। আলোচনায় অংশ নেওয়া একাধিক ব্যক্তি এ কথা জানিয়েছেন।
প্রায় দেড় দশক পর, বড় কোনো অঘটন না ঘটলে আগামী জানুয়ারিতে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন জেফ্রিস। প্রেসিডেন্টের উত্তরাধিকারের ক্রমে ভাইস প্রেসিডেন্টের পরেই স্পিকারের অবস্থান। স্পিকার হলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছর নতুন শক্তি পাওয়া ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্ব কার্যত জেফ্রিসের হাতে থাকবে।
ক্লিভার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘এই প্রশাসনের অনেকেরই রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমানো উচিত নয়।’ তাঁর ধারণা, জেফ্রিস ও ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনকে কঠিন চাপে ফেলবেন।
আদর্শ ও প্রজন্মের ব্যবধান
স্পিকার পদ এখনো নিশ্চিত হয়নি। ডেমোক্রেটিক সমাজতন্ত্রীদের একদল নতুন সদস্য প্রতিনিধি পরিষদে আসছেন। তাঁদের অভিযোগ, বর্তমান নেতৃত্ব সময়ের দাবি মেটাতে পারেনি। একসময় জেফ্রিসকেও দলের প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের বিরুদ্ধে উঠে আসা নেতা হিসেবে দেখা হতো। এখন ইসরায়েল ও সবার জন্য মেডিকেয়ারের মতো বিষয়ে তাঁর অবস্থান দলের প্রচলিত ধারার কাছাকাছি। এ কারণে দলের আন্দোলনপন্থী অংশ তাঁকে নিয়ে সন্দিহান।
জেফ্রিস আগে করপোরেট আইনজীবী ছিলেন। তিনি ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেন। দলের কেউ কেউ ব্যক্তিগত আলাপে বলেছেন, তিনি সিদ্ধান্ত নিতে বেশি দ্বিধা করেন। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠদের মতে, স্পিকার হলে তিনি দৃঢ়ভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। ট্রাম্প প্রশাসন ও বড় মার্কিন কোম্পানি, দুই পক্ষের সঙ্গেই বড় ধরনের সংঘাতে যেতে তিনি প্রস্তুত।
ঘনিষ্ঠরা বলছেন, জেফ্রিস সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দাবিকে দলের কর্মসূচির কেন্দ্রে আনতে চান। ধনীদের ওপর কর বাড়াতে চান। বড় কোম্পানির প্রধান নির্বাহীদের তলব করতে চান। বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিরোধ এড়িয়ে চলার যে নীতি ডেমোক্র্যাটরা কয়েক দশক ধরে অনুসরণ করেছে, এতে তা বদলে যাবে।
২০১৯ সালে ডেমোক্র্যাটরা ন্যূনতম মজুরি যতটা বৃদ্ধি করতে চেয়েছিল, জেফ্রিস তার চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি করতে চান। সুপ্রিম কোর্টের জন্য কঠোর নৈতিক আচরণবিধি চালু করতে চান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারেও লাগাম টানতে চান। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরে প্রশাসনের ওপর কংগ্রেসের কড়া নজরদারিতেও তিনি দলের নেতৃত্ব দেবেন।
সম্প্রতি সিএনএনের মানু রাজুকে ডেমোক্র্যাট নেতা জেফ্রিস বলেন, মার্কিন জনগণের হতাশার যথেষ্ট কারণ আছে। তারা চায় চলতি ব্যবস্থা ভাঙুক। তারা বড় পরিবর্তন চায়।
ঘনিষ্ঠদের মতে, নির্বাচিত হলে জেফ্রিসের সামনে দুটি কাজ থাকবে। ভোটাররা চান, ডেমোক্র্যাটরা সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে বাস্তব পরিবর্তন আনুক। সেই প্রত্যাশা তাঁকে পূরণ করতে হবে। একই সঙ্গে তাঁকে খেয়াল রাখতে হবে, কোনো পদক্ষেপের কারণে যেন দুই বছর পর দল আসন না হারায়।
এ জন্য দলের বামপন্থী অংশের কিছু দাবিতে জেফ্রিসকে রাশ টানতে হবে। যেমন অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা আইসিই বিলুপ্ত করার পক্ষে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা কম। সবার জন্য মেডিকেয়ার চালুর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাঁর মিত্ররা বলছেন, ইসরায়েল-সংক্রান্ত নীতিতে ভোটাভুটি তিনি যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলবেন।
একজন মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাট সিএনএনকে বলেন, ‘তিনি সাহসী ও বিচক্ষণ পদক্ষেপ নেবেন। বেপরোয়া হবেন না। যেসব ভোটে বড় বিভাজন তৈরি হতে পারে, সেগুলো এড়ানোর চেষ্টা করবেন। জীবনযাত্রার খরচ কমানোতেই তাঁর মনোযোগ থাকবে। সংস্কৃতি নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাতে তিনি জড়াবেন না।’
কলোরাডোর কংগ্রেস সদস্য জেসন ক্রো বলেন, জেফ্রিস স্পষ্ট করেছেন, ডেমোক্র্যাটরা পরিবারের দৈনন্দিন সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দিয়েই জিতবে। ক্ষমতায় গিয়েও তারা সেসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দেবে। ক্রোর মতে, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বৃদ্ধি করলে মানুষের খরচ কমতে পারে।
ক্রো বলেন, ‘আমার মনে হয়, মার্কিনরা সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার দিকে এগোতে প্রস্তুত। সেখানে পৌঁছানোর একাধিক পথ আছে।’ ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মার্কিনদের মেডিকেয়ারের আওতায় আনতে একটি বিলের যৌথ প্রস্তাবক তিনি।
জেফ্রিসের সামনে প্রজন্মগত চ্যালেঞ্জও আছে। আলোচনার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের মতে, প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা কমিটির সভাপতিদের মেয়াদে নতুন সীমা বসানোর পরিকল্পনা করছেন। জ্যেষ্ঠতাকে এত দিন গুরুত্ব দিয়ে আসা দলটির জন্য এটি বড় পরিবর্তন। এই নির্বাচনে প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যে মনোভাব দেখা গেছে, পরিকল্পনাটিতে তার প্রতিফলন আছে। বর্তমান সভাপতিরা অবশ্য অল্প সময়ের জন্য ছাড় পেতে পারেন।

ভোটারদের আরেকটি অগ্রাধিকার হলো, কংগ্রেস সদস্যদের শেয়ার কেনাবেচা নিষিদ্ধ করা। জানুয়ারিতে প্রতিনিধি পরিষদের আচরণবিধিতে এই নিষেধাজ্ঞা যোগ করা যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কিছু সদস্য আগামী বছর আলাদা একটি বিল পাস করতে চান। তাতে আইনপ্রণেতাদের পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের শেয়ার কেনাবেচার ওপরও কড়া বিধিনিষেধ থাকবে। তবে আলোচনার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের মতে, বিলটির আইনে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
শেয়ার কেনাবেচা নিয়ে এই মতভেদ আগামী বছরের একটি বড় চ্যালেঞ্জের আভাস দেয়। দীর্ঘদিনের অনেক সদস্য ধীরগতির পরিবর্তনে অভ্যস্ত। তাঁদের প্রতিরোধ সামলাতে হবে জেফ্রিসকে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করাও কঠিন হবে। ট্রাম্প সম্প্রতি নিজেকে ‘মিস্টার ভেটো’ বলেছেন। তাঁর কাছ থেকে খুব সামান্য সহযোগিতা মিলবে বলে মনে করেন ডেমোক্র্যাটরা। একেবারেই সহযোগিতা না-ও মিলতে পারে।
অন্য পক্ষের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টাতেও জেফ্রিসকে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। গ্রীষ্মে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে ব্যক্তিগত বৈঠক করেন তিনি। এ নিয়ে উদারপন্থী ডেমোক্র্যাটরা তীব্র সমালোচনা করেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা-সংক্রান্ত একটি আইন নিয়ে জেফ্রিস ও কুশনার ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন।
পরে জেফ্রিস সিএনএনকে বলেন, ‘সমস্যা সমাধান করা আমাদের দায়িত্ব। সে জন্য কখনো কখনো অন্য পক্ষের লোকজনের সঙ্গেও বসতে হয়।’
স্পিকার হওয়ার পথে
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষ নেতা হওয়ার আগে জেফ্রিসের সমর্থকেরা তাঁকে বিভিন্ন পদে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। সে সময়ের কয়েকটি উদ্যোগের কথা একাধিক ব্যক্তি স্মরণ করেছেন।
কৃষ্ণাঙ্গ গির্জার কয়েকজন নেতা জেফ্রিসকে নিউইয়র্ক নগরের সাবেক মেয়র বিল ডি ব্লাজিওর বিরুদ্ধে প্রার্থী হতে বলেছিলেন। ২০১৯ সালে কংগ্রেস সদস্য এলাইজাহ কামিংসের মৃত্যুর পর প্রতিনিধি পরিষদের তদারকি কমিটিতে ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষ পদে তাঁকে দেখতে চেয়েছিলেন কয়েকজন সহকর্মী। ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নির্বাচনী দৌড় থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। তখন কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে জেফ্রিসকে প্রেসিডেন্ট পদেও লড়তে বলেছিলেন।
জেফ্রিস সব প্রস্তাবই ফিরিয়ে দেন। তাঁর দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ছিল বলে মনে হয় প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার হওয়া।
ওহাইওর কংগ্রেস সদস্য জয়েস বিটি বলেন, ‘তিনি কংগ্রেশনাল ব্ল্যাক ককাসের সভাপতি হতে পারতেন। শুরুতেই দলের ভোট সংগঠনের দায়িত্বে থাকা ডেমোক্র্যাট হুইপও হতে পারতেন। তবে তিনি খুব হিসাব করে এগোন।’
প্রায় দেড় দশক পর, আগামী জানুয়ারিতে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পথে জেফ্রিস। প্রেসিডেন্টের উত্তরাধিকারের ক্রমে ভাইস প্রেসিডেন্টের পরেই স্পিকারের অবস্থান। স্পিকার হলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরে নতুন শক্তি পাওয়া ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্ব কার্যত জেফ্রিসের হাতে থাকবে।
প্রতিনিধি পরিষদের বিচারবিষয়ক কমিটিতে দক্ষতা দেখিয়ে জেফ্রিস দলের ভেতর ওপরে উঠেছেন। ট্রাম্পের প্রথম অভিশংসনের সময় সেখানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর আগে মাদক-সংক্রান্ত আইন ও দণ্ডাদেশ সংস্কার নিয়ে রিপাবলিকানদের সঙ্গে সমঝোতা করেছিলেন।
বিটি ও জেফ্রিস ২০১৩ সালে একসঙ্গেই কংগ্রেসে যোগ দেন। বিটি বলেন, ‘তিনি ঘরে ঢুকলেই মনে হয় এই মানুষটার কোনো ভয় নেই।’
ব্রুকলিনের জেফ্রিস ট্রাম্পের আমলেই ব্যাপক পরিচিতি পান। ২০২০ সালে সিনেটে ট্রাম্পের অভিশংসন বিচারে তিনি অভিযোগ তুলে ধরেন। পেলোসি নিজে তাঁকে এ দায়িত্বের জন্য বেছে নিয়েছিলেন। সিনেটের অধিবেশনকক্ষে তিনি প্রয়াত র্যাপার দ্য নটোরিয়াস বি আই জির কথা উদ্ধৃত করেন। ঘটনাটি বেশ আলোচিত হয়।
গানের প্রতি জেফ্রিসের ভালোবাসার কথা দলে অনেকেই জানেন। আশির দশকে ব্রুকলিনে কিশোর বয়সে তিনি ‘কিড ফ্রেশ’ নামে একবার র্যাপের লড়াইয়ে অংশ নেন। ক্লিভার তাঁকে বলেন ‘হিপহপের প্রধানমন্ত্রী’।
প্রথম অভিশংসনের পর থেকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জেফ্রিসের আক্রমণ আরও তীক্ষ্ণ হয়েছে। ট্রাম্প তাঁর বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কটাক্ষ করলে জেফ্রিস জবাবে তাঁকে বলেন, ‘১৬০০ পেনসিলভানিয়া অ্যাভিনিউয়ে বসা সবচেয়ে নির্বোধ ব্যক্তি।’ এই ঠিকানাতেই হোয়াইট হাউস। গ্রীষ্মে তিনি ট্রাম্পকে বলেন, ‘একজন দুর্বল, বেসামাল, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়ানো ৮০ বছর বয়সী ব্যর্থ প্রেসিডেন্ট।’
জেফ্রিস ও পেলোসি দুজনের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন ডেমোক্র্যাটদের এক জ্যেষ্ঠ সহকারী। তিনি সিএনএনকে বলেন, ‘তিনি লড়তে ভালোবাসেন। মুখোমুখি হতেও ভালোবাসেন। তাঁর মধ্যে দুঃসাহস আর আত্মবিশ্বাস আছে।’
দলীয় নেতা হিসেবে জেফ্রিসের মেয়াদে কিছু বিরোধও হয়েছে। কয়েকজন ডেমোক্র্যাট চার্লি কার্ককে নিয়ে তীব্র মতবিরোধের কথা স্মরণ করেন। গত বছর কার্ক হত্যার পর তাঁর ‘জীবন ও উত্তরাধিকার’কে সম্মান জানাতে একটি প্রস্তাব আনে রিপাবলিকানরা। দুই দলের মানুষকেই লক্ষ্য করে যে রাজনৈতিক সহিংসতা হয়েছে, তার নিন্দায় ঐক্য দেখাতে জেফ্রিস ও তাঁর নেতৃত্বের দল প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিতে রাজি হন।
এ সিদ্ধান্তে কংগ্রেশনাল ব্ল্যাক ককাসের সদস্যরা ক্ষুব্ধ হন। তাঁদের অভিযোগ, প্রস্তাবে কার্কের প্রশংসা করা হয়েছে। অথচ কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিনদের বিরুদ্ধে তাঁর যেসব বক্তব্যকে তাঁরা বিদ্বেষপূর্ণ মনে করেন, সেগুলো উপেক্ষা করা হয়েছে।
কার্ক নাগরিক অধিকার আইনকে ‘বিরাট ভুল’ বলেছিলেন। তিনি আরও দাবি করেছিলেন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসন ও মিশেল ওবামার মতো কৃষ্ণাঙ্গ নেতাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা এত কম যে রাজনীতিতে তাঁদের গুরুত্ব দেওয়ার কারণ নেই।
প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন কংগ্রেস সদস্য ট্রয় কার্টার। তিনি সে সময় লিখেছিলেন, ‘এসব কথার ক্ষতি আছে। এর মধ্যে সেই বিভাজনের মনোভাবই আছে, যা একসময় জিম ক্রো ব্যবস্থাকে শক্তি জুগিয়েছিল। তখন বর্ণবাদ ও বিদ্বেষকে আইনে ঢুকিয়ে মানুষের অধিকার ও মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।’

ভোটের পর এক বৈঠকে ব্ল্যাক ককাসের কয়েকজন সদস্য জেফ্রিসকে সরাসরি প্রশ্ন করেন। রিপাবলিকানদের প্রস্তাবটি তিনি যেভাবে সামলেছেন, তা নিয়ে তাঁরা আপত্তি জানান। নিজের সিদ্ধান্ত জানাতে তিনি এত দেরি করেছিলেন কেন, সেটিও তাঁরা জানতে চান। বৈঠক সম্পর্কে জানেন এমন একাধিক ব্যক্তি এ কথা বলেছেন।
একজন বলেন, ‘ব্ল্যাক ককাসকে আগে কখনো এত প্রকাশ্যে জেফ্রিসের সমালোচনা করতে দেখিনি।’
২০২৭ সাল সামনে রেখে দেখা যাচ্ছে, সেই দূরত্ব অনেক আগেই কেটে গেছে। সে সময় দুই পক্ষের আলোচনায় যুক্ত একজনের মতে, ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত জেফ্রিসের প্রতি সদস্যদের আস্থা বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, ‘তাঁরা তাঁদের উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। জেফ্রিস সেগুলোর জবাব দিয়েছিলেন।’
আগামী বছর এই প্রভাবশালী গোষ্ঠীতে কৃষ্ণাঙ্গ আইনপ্রণেতার সংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি হতে পারে। আর তাঁদের মধ্য থেকেই আসতে পারেন দেশের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার।
ডেমোক্র্যাটদের নতুন নেতৃত্ব
জেফ্রিস দলীয় নেতা নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন পর তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী হেনরি কুয়েলার তাঁকে অবিলম্বে মার্কিন সীমান্তে যেতে বলেন। কুয়েলার টেক্সাসের কংগ্রেস সদস্য।
সময়টা ২০২২ সাল। কুয়েলারের মতো ডেমোক্র্যাটরা মনে করতেন, বাইডেনের সীমান্তনীতি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে। তাঁদের মতে, ক্ষমতায় ফিরতে হলে সীমান্ত এলাকার মানুষের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, তা বুঝতে হবে।
জেফ্রিস কুয়েলারের নিজ শহর লারেডোতে যান। রাতে সীমান্ত ঘুরে দেখেন। তাঁদের চোখের সামনেই চোরাচালানের চেষ্টা হয়। তিনি স্থানীয় অলাভজনক সংস্থাগুলোর সঙ্গেও দেখা করেন। সেসব সফরে মানবিক বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
কুয়েলার বলেন, ‘ডেমোক্র্যাটদের দিয়ে সীমান্ত নিরাপত্তা কথাটা বলাতেই পারতাম না।’ লারেডো সফরের পর জেফ্রিসের ভাষায় পরিবর্তন শুনি। তাঁকে “সীমান্ত নিরাপত্তা” বলতে শুনেছি। তাঁকে এটাও বলতে শুনেছি, অভিবাসীদের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করতে হবে।’
জেফ্রিসের ঘনিষ্ঠরা বলছেন, ডেমোক্রেটিক পার্টির দুর্বল হয়ে পড়া ভাবমূর্তি কীভাবে ফেরানো যায়, তা নিয়ে তিনি কয়েক বছর ধরে কাজ করছেন। ট্রাম্পকে হারানোর পাশাপাশি ভোটারদের আস্থা ফেরানোও তাঁর লক্ষ্য।
সাম্প্রতিক নির্বাচনে দল কোথায় ভুল করেছে, তা তিনি দেখেছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালে। পরে যাঁরা ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁদের ক্ষোভের আভাস তখন প্রায় সবাই উপেক্ষা করেছিলেন।
এর পর থেকে জেফ্রিস ও তাঁর নেতৃত্বের দল ভোটারদের আস্থা ফেরাতে কাজ করছে। তারা ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া সমালোচনা করেছে। সুযোগ পেলেই রিপাবলিকানদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে। নিজেদের বক্তব্য ভোটারদের কাছে পৌঁছানোও তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
জেফ্রিস প্রায়ই সহকর্মীদের বলেন, একজন সাধারণ মার্কিন নাগরিক সপ্তাহে প্রায় চার মিনিট রাজনীতির দিকে মন দেন। এর সাড়ে তিন মিনিটই যায় ট্রাম্পকে নিয়ে। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে পরিচিতদের মতে, তিনি বলেছেন, ‘সপ্তাহে ওই ৩০ সেকেন্ডের জন্যই আমাদের লড়াই।’
সেই লড়াইয়ে রিপাবলিকানদের করছাড়ের বিলের বিরুদ্ধে জেফ্রিস প্রতিনিধি পরিষদে প্রায় ৯ ঘণ্টা বক্তৃতা দেন। স্বাস্থ্যসেবার ভর্তুকি নিয়ে বিরোধে সরকার ঐতিহাসিক ৪৩ দিন অচল ছিল। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়েও তিনি সর্বাত্মক লড়াইয়ে নামেন।
কয়েকজন সহকর্মী তাঁর আরেকটি গুণের কথা বলেছেন। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ম্যাডেলিন ডিনের ভাষায়, তাঁর মধ্যে আছে ‘মার্কিন আশাবাদ’। এমন এক সময়ে তিনি এই আশাবাদ ধরে রেখেছেন, যখন দুই দলেরই বহু রাজনীতিক দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে হতাশ।
ডিন ক্যাপিটলে ৬ জানুয়ারির হামলার রাতের কথা স্মরণ করেন। দাঙ্গাবাজদের ভবন থেকে সরানো হচ্ছিল। তখন তিনি ও অন্য সদস্যরা একটি সুরক্ষিত কক্ষে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কক্ষে উপস্থিত ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে জেফ্রিসই ছিলেন সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ। ডিন তাঁর কাছে যান। আইনপ্রণেতাদের অধিবেশনকক্ষে ফিরে ইলেক্টোরাল ভোট গণনা আবার শুরু করার সুযোগ দিতে বলেন।
ডিনের মনে আছে, তিনি বলেছিলেন, ‘হাকিম, ওরা আমাদের এখান থেকে তাড়িয়ে দিতে পারে না।’
জেফ্রিস রাজি হন। পরে তৎকালীন কংগ্রেস সদস্য লিজ চেনির সঙ্গে সুর মিলিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ফিরে যাব। আমাদের কাজ শেষ করব।’
সূত্র: প্রথম আলো