লাখো ভক্তের পদচারণায় মুখর খেতুরীধাম
গণমাধ্যম ডেক্স
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলীর ঐতিহাসিক খেতুরীধামে শুরু হয়েছে সনাতন বৈষ্ণব ধর্মের মহান সাধক ঠাকুর নরোত্তম দাসের তিরোভাব তিথি মহোৎসব। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) অধিবাস ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী এ মহোৎসবকে কেন্দ্র করে পদ্মাপাড়ের খেতুরীধাম পরিণত হয়েছে দেশ-বিদেশের ভক্ত সাধুদের মিলনমেলায়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্তদের পদচারণা, হরিনাম সংকীর্তন ভজন, আরতি ও প্রার্থনায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। একইসঙ্গে জমে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী খেতুরীধামের মেলা।
শত বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এ মহোৎসব উপলক্ষে কয়েক দিন আগে থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে ভক্তরা আসতে শুরু করেন। অনেকে মন্দির প্রাঙ্গণ ও আশপাশে নিজেদের থাকার ব্যবস্থা করেছেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বাস মাইক্রোবাস ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনে প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে ভক্তদের আগমন বাড়তে থাকে। মন্দির প্রাঙ্গণের পাশাপাশি সড়কের দুই পাশে বসেছে নানা ধরনের দোকানপাট। ধর্মীয় উপকরণ, পোশাক, খাবার, গৃহস্থালি সামগ্রী, কারুশিল্প এবং কামার কুমারের তৈরি মৃৎ ও লৌহজাত পণ্যের পসরা নিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা।
আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, বাংলা কার্তিক মাসের প্রথম তিন দিন নানা ধর্মীয় আচার নাম প্রার্থনা ও সংকীর্তনের মধ্য দিয়ে ঠাকুর নরোত্তম দাসের তিরোভাব তিথি মহোৎসব উদযাপিত হয়। বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা থেকে নরোত্তম দাস ঠাকুর রচিত ভজন কীর্তন সন্ধ্যা আরতি দামোদর আরতি, নরোত্তম চরিতকথা ও অধিবাস কীর্তনের মধ্য দিয়ে এবারের উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) উৎসবের দ্বিতীয় দিনে ভোর থেকে মঙ্গল আরতি, হরিনাম সংকীর্তনসহ খেতুরীধাম পরিক্রমা দর্শন আরতি ও শ্রীল প্রভুপাদ গুরুপূজা অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি চলছে অষ্টপ্রহরব্যাপী তারকব্রহ্মনাম সংকীর্তন। ভক্তরা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান প্রার্থনা ও প্রসাদ গ্রহণে অংশ নিচ্ছেন।
তিন দিনব্যাপী এ মহোৎসবের শেষ দিনে শনিবার (৩১ অক্টোবর) ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, প্রার্থনা ও গঙ্গাস্নানের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে বলে আয়োজক সূত্রে জানা গেছে।
মহোৎসবকে কেন্দ্র করে বসা ঐতিহ্যবাহী মেলায় ধর্মীয় উপকরণের পাশাপাশি মিলছে বাহারি খাবার পোশাক গৃহস্থালি সামগ্রী ও বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প। মেলাকে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে কর্মচাঞ্চল্য। দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থী ও ভক্তদের উপস্থিতিতে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের এলাকাতেও।
আয়োজকদের মতে, খেতুরীধামের এ মহোৎসব কেবল সনাতন বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আয়োজন নয় এটি বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনক্ষেত্র। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের অংশগ্রহণ পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে উৎসবটি দীর্ঘদিন ধরে তার স্বতন্ত্র ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
খেতুরীধাম গৌরাঙ্গদেব ট্রাস্টি বোর্ডের সম্পাদক শ্যামাপদ সান্যাল বলেন, শত শত বছর ধরে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে এ মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলিমসহ অন্যান্য ধর্মের মানুষও সম্প্রীতির টানে এখানে আসেন। ট্রাস্টি বোর্ডের ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় এবারও উৎসব সুন্দরভাবে সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
গৌরাঙ্গবাড়ি মন্দিরের ব্যবস্থাপক গোবিন্দ চন্দ্র পাল জানান, উৎসবে আগত বিপুল ভক্তের জন্য প্রসাদ বিশুদ্ধ পানীয় জল ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভক্তদের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রেমতলী বাজার থেকে খেতুরীধাম পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার সংযোগ সড়কে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি আগত ভক্তদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে মেডিকেল টিম ও অভিজ্ঞ স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সুজন মিয়া বলেন, গৌরাঙ্গবাড়ী ও খেতুর ধাম উপলক্ষে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং আগত ভক্ত দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৬০২ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন। পুরো আয়োজন নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকবে।
গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান জানান, ঐতিহ্যবাহী এ উৎসব ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও সুন্দর পরিবেশে সম্পন্ন করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী ঠাকুর নরোত্তম দাস ১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন গড়েরহাট পরগণার অন্তর্গত বর্তমান রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পদ্মাতীরবর্তী গোপালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন জমিদার কৃষ্ণনন্দ দাস মজুমদার এবং মাতা নারায়ণী রাণী। সচ্ছল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও তিনি পার্থিব ভোগবিলাসের পরিবর্তে ধর্মসাধনা ও মানবকল্যাণের পথে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি বৃন্দাবনে গিয়ে বৈষ্ণব সাধক লোকনাথ গোস্বামীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। দীক্ষা লাভের পর খেতুরীতে ফিরে এসে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন এবং বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। তার প্রেমভক্তি মানবপ্রেম ও অহিংসার আদর্শে আকৃষ্ট হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষ তার কাছে দীক্ষা নিতে আসতেন।
প্রচলিত বৈষ্ণব ঐতিহ্য অনুযায়ী ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে তিনি নিত্যলীলায় প্রবেশ করেন। তার তিরোভাবকে স্মরণ করেই যুগ যুগ ধরে খেতুরীধামে এ মহোৎসবের আয়োজন হয়ে আসছে।
ধর্মীয় বিশ্বাস প্রেমভক্তি মানবপ্রেম ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে প্রতিবছর খেতুরীধামে সমবেত হন অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থী। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান এ আয়োজন আজও রাজশাহীর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে স্বমহিমায় টিকে আছে।
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স