৬০ হাজার কর্মীকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব মাইক্রোসফটের, নেপথ্যে কি এআই
গণমাধ্যম ডেক্স
মাইক্রোসফটের ৫০ বছরের ইতিহাসে বড় আকারের কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা নতুন কিছু নয়। ২০১৪ সালের জুলাইয়ে ১৮ হাজার, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ১০ হাজার এবং ২০২৫ সালজুড়ে প্রায় ১৫ হাজার কর্মীকে বিদায় করেছে তারা। কিন্তু এবারের চিত্রটা একটু আলাদা।
সম্প্রতি মাইক্রোসফট তাদের প্রায় ৬০ হাজার কর্মীকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছে। অর্থাৎ কোম্পানির মোট জনবলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। কোম্পানির ভাষায় এর নাম ভলান্টারি এক্সিট অফার। মাইক্রোসফটের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও চিফ পিপল অফিসার অ্যামি কোলম্যান কর্মীদের কাছে পাঠানো এক মেমোতে জানিয়েছেন, যেসব কর্মী কোম্পানির বাইরে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে চান, তাদের আর্থিক সহায়তাসহ এই পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি মাইক্রোসফট তাদের প্রায় ৬০ হাজার কর্মীকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছে। অর্থাৎ কোম্পানির মোট জনবলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। কোম্পানির ভাষায় এর নাম ভলান্টারি এক্সিট অফার।
কারা পাচ্ছেন এই প্রস্তাব
কানাডা, ভারত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের লেভেল ৭০ এবং তার নিচের কর্মীরা এই সুযোগ পাবেন। মাইক্রোসফটে একদম শুরুতে যোগদানকারী কর্মীদের লেভেল ৫৯। আর লেভেল ৭০ মানে কোম্পানির বেশ ওপরের দিকের পদ। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত কর্মীরা এই প্রস্তাব গ্রহণের সময় পাবেন। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক টেলিভিশন নিউজ চ্যানেল সিএনবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যাঁরা রাজি হবেন, তাঁরা ৩১ ডিসেম্বর কোম্পানি ছাড়বেন।
কোন বিভাগের কর্মীরা এই অফার পাচ্ছেন, তার আনুষ্ঠানিক তালিকা মাইক্রোসফট প্রকাশ করেনি। তবে রয়টার্স ও ব্লুমবার্গ-এর মতো সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এআই এক্সপেরিয়েন্স, কোপাইলট, অর্থ, মানবসম্পদ, এক্সবক্স এবং উইন্ডোজ প্লাস ডিভাইসেস বিভাগের কর্মীরা এই প্রস্তাব পেয়েছেন। অন্যদিকে নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক ব্যবসা, মার্কেটিং, সেলস এবং ডেটা সেন্টারের কর্মীদের এই প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ, যারা ডেটা সেন্টার বানায় বা চালায়, কোম্পানির পণ্য বিক্রি করে এবং গ্রাহকদের নিরাপত্তা দেয়, মাইক্রোসফট তাদের ধরে রাখতে চায়। মজার ব্যাপার হলো, কোপাইলটের মতো এআই পণ্য যারা বানাচ্ছে, তাদেরও চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
রয়টার্স ও ব্লুমবার্গ-এর মতো সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এআই এক্সপেরিয়েন্স, কোপাইলট, অর্থ, মানবসম্পদ, এক্সবক্স এবং উইন্ডোজ প্লাস ডিভাইসেস বিভাগের কর্মীরা এই প্রস্তাব পেয়েছেন।
মাইক্রোসফট কী বলছে
মাইক্রোসফট জোর দিয়ে বলছে, কোম্পানি ছোট করার কোনো উদ্দেশ্য তাদের নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ফরচুন ম্যাগাজিনকে কোম্পানির এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, এ ধরনের স্বেচ্ছায় অবসরের প্রস্তাবে সাধারণত ৩ থেকে ৫ শতাংশ কর্মী সাড়া দেন। ৬০ হাজার কর্মীকে প্রস্তাব দেওয়া হলেও তারা আশা করছেন ৫ শতাংশেরও কম কর্মী এতে রাজি হবেন। কোম্পানি চায় সঠিক জায়গায় সঠিক মেধা কাজ করুক। মাইক্রোসফটের চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার অ্যামি হুডও জানিয়েছেন, কোম্পানিতে উন্নতির অনেক সুযোগ থাকায় খুব কম মানুষই এই প্রস্তাব নেবেন বলে তারা ধারণা করছেন।
জনবল কমানো নাকি নতুন করে সাজানো
যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির ইমেরিটাস অধ্যাপক জোসেফ ফিলিপস মনে করেন, এটা কোম্পানি ছোট করার কোনো ছক নয়। মহামারির আগে ২০১৯ সালে মাইক্রোসফটের কর্মী ছিল ১ লাখ ৪৪ হাজার। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় ২ লাখ ২৮ হাজার। ২০২৪ সাল থেকে ২০ হাজার ছাঁটাইয়ের পরও গত ৩০ জুনের হিসাব অনুযায়ী তাদের বর্তমান কর্মী সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার। অর্থাৎ তারা একদিকে মানুষ ছাঁটাই করেছে, অন্যদিকে নতুন কর্মীও নিয়োগ দিয়েছে। ফিলিপস মনে করেন, কোম্পানি এখন এআইয়ের পেছনে বিপুল বিনিয়োগ করছে। তাই নিজেদের জনবলকে নতুন করে সাজাতেই এই উদ্যোগ।
২০২৪ সালে মাইক্রোসফটের কর্মী বেড়ে হয় ২ লাখ ২৮ হাজার। ২০২৪ সাল থেকে ২০ হাজার ছাঁটাইয়ের পরও গত ৩০ জুনের হিসাব অনুযায়ী তাদের বর্তমান কর্মী সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার।
ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা ও রাজনীতি
এই প্রস্তাব এমন এক সময়ে এল, যার মাত্র তিন সপ্তাহ আগে ট্রাম্প প্রশাসন মাইক্রোসফটসহ আটটি কোম্পানিকে মার্কিন শ্রম দপ্তরের ‘পার্ম’ প্রোগ্রাম থেকে স্থগিত করেছিল। পার্ম হলো এইচ-১বি ভিসায় থাকা বিদেশি কর্মীদের গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রথম ধাপ। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অভিযোগ করেছিলেন, মাইক্রোসফট গত বছর ৬ হাজার আমেরিকান কর্মীকে ছাঁটাই করে ৬ হাজার ৩০০টি এইচ-১বি ভিসার সুবিধা নিয়েছে। মাইক্রোসফটের প্রেসিডেন্ট ব্র্যাড স্মিথ অবশ্য এই দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন। অধ্যাপক ফিলিপসের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি বা ভিসা সংক্রান্ত এই সমস্যার সঙ্গে বর্তমান চাকরি ছাড়ার প্রস্তাবের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি নেহাতই কাকতালীয়।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অভিযোগ করেছিলেন, মাইক্রোসফট গত বছর ৬ হাজার আমেরিকান কর্মীকে ছাঁটাই করে ৬ হাজার ৩০০টি এইচ-১বি ভিসার সুবিধা নিয়েছে।
মানুষের চেয়ে যন্ত্রে বেশি বিনিয়োগ
পুরো পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, মাইক্রোসফট এখন মানুষের চেয়ে যন্ত্রপাতির ওপর বেশি টাকা ঢালছে। কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৩০ জুন শেষ হওয়া অর্থবছরে তারা সম্পত্তি ও যন্ত্রপাতির পেছনে ১১ হাজার ৫৯০ কোটি ডলার খরচ করেছে। এক বছর আগে এই খাতে খরচ ছিল মাত্র ৬ হাজার ৪৬০ কোটি ডলার। একই সময়ে তাদের কর্মী কমেছে প্রায় ৫ হাজার। গত ৩০ সেপ্টেম্বর তাদের মূলধন ব্যয় ৩০ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ৫২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যার বড় অংশই গেছে এআই চিপ ও নেটওয়ার্কিং যন্ত্রপাতির পেছনে। চলতি বছর এই খরচ ৫ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জে জ্যাগোরস্কি বলেন, সব ব্যবসাকেই কর্মী আর যন্ত্রপাতির মধ্যে একটা ভারসাম্য রাখতে হয়। এআই আসার পর বড় টেক কোম্পানিগুলো মানুষের চেয়ে যন্ত্রপাতির দিকেই বেশি ঝুঁকছে। মাইক্রোসফটের এই ঘোষণা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে, তারা এখন কম মানুষ আর বেশি যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করতে চায়। শিগগিরই হয়তো অন্যান্য বড় টেক কোম্পানিগুলোও একই পথে হাঁটবে।
সূত্র: ফরচুন, সিএনবিসি ও রয়টার্স ডটকম
সূত্র: প্রথম আলো