ঢাকার তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হওয়া বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মৃত্যুর কারণ এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাঁর বাবা বলেছেন, ছেলের মৃত্যু আত্মহত্যা নয়। সরকার তদন্ত করলে প্রকৃত অপরাধীদের বের করতে পারবে। আর পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলা যাবে।
তাহসিফ গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে বের হন। ওই দিন দিবাগত রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে মুঠোফোনে বার্তা (ভয়েস মেসেজ) পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন, বাসায় ফিরছেন; কিন্তু আর ফেরেননি। পরদিন বুধবার বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সঙ্গে নেওয়া মোটরসাইকেলটিরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে তাহসিফের মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়। পরে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। জানাজা শেষে গতকালই উত্তরায় তাঁকে দাফন করা হয়েছে।
মাকে জানিয়েছিলেন, বাসায় ফিরছেন
গতকাল দুপুরে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে গিয়ে জানা যায়, তাহসিফ সপরিবার ‘করবী’ ভবনের তৃতীয় তলায় নিজেদের ফ্ল্যাটে থাকতেন। তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিম পদ্মা অয়েল কোম্পানির সাবেক পরিচালক। তাঁদের বাড়ি খুলনা শহরের সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকায়। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তাহসিফ বড়। তিনি অবিবাহিত ছিলেন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, মঙ্গলবার দিনভর মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা করেছিলেন তাহসিফ। বাবার জন্যও কিছু জিনিস কিনেছিলেন। তাঁর বাবা এনায়েতুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, সন্ধ্যার পর তাহসিফের বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই দীপ বাসার নিচে এসে তাঁকে ডাকেন। দীপের সঙ্গে কথা বলে ফিরবেন জানিয়ে নিচে নামেন তাহসিফ।
এরপর আর বাসায় ফেরেননি। পরে বাড়ির সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটে তাহসিফ ও দীপ পৃথক মোটরসাইকেলে বেরিয়ে যান।
এনায়েতুল করিম জানান, তাহসিফ বাসায় না ফেরায় তাঁর মা একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন; কিন্তু তাঁকে পাননি। মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে মায়ের মুঠোফোনে একটি ভয়েস বার্তা পাঠান তাহসিফ। তাতে শোনা যায়, তিনি বাসায় ফিরছেন। তবে বার্তাটি শুনে ছেলেকে ব্যস্ত মনে হয়েছিল বলে জানান বাবা এনায়েতুল করিম।
এরপরও তাহসিফ বাসায় না ফেরায় তাঁর খোঁজ করতে থাকে পরিবার। বুধবার দুপুরে তুরাগ থানায় যান বাবা এনায়েতুল করিম। তখন ছেলের বিষয়ে তাঁকে কিছু জানাতে পারেনি পুলিশ। ওই দিন বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে উত্তরখান থানা থেকে ফোন পান তিনি। তাঁকে জানানো হয়, ছেলের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এনায়েতুল করিম জানান, যেখান থেকে ছেলের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, সেদিকে তাহসিফ কখনো যেতেন বলে তাঁদের ধারণা নেই।
একজন স্বজন জানান, মাসখানেক আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তাহসিফের সারা শরীর জখম হয়েছিল। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে মোটরসাইকেল চালাতে নিষেধ করা হয়েছিল। মঙ্গলবার বাসা থেকে বের হওয়ার সময় মোটরসাইকেলটি সঙ্গে নিয়েছিলেন তিনি। সেটি কোথায় আছে, তা তাঁরা জানতে পারেননি। ওই স্বজন বলেন, ‘আমরা দীপের সঙ্গেও কথা বলেছি; কিন্তু তাহসিফের বাইকটি মিসিং। পুলিশ আমাদের কাছে বাইকের ডিটেইলস, ছবি চেয়েছে। আমরা দিয়েছি।’
তাহসিফের সঙ্গে সেদিন কী ঘটেছিল, তা জানতে দীপের সঙ্গেও কথা বলেছেন পরিবারের সদস্যরা। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপ তাঁদের জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাতে তাহসিফের সঙ্গে তিনি একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেছিলেন। এরপর তাহসিফকে তাঁর বাসার এলাকার কাছে রেখে দীপ ফিরে যান।
মুঠোফোনের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত
মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে নৌ পুলিশের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পাওয়া যায়, রাজধানীর উত্তরখান থানা এলাকার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসছে। খবর পেয়ে নৌ পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে অজ্ঞাতনামা এক পুরুষের মরদেহ উদ্ধার করেন। তাঁর বয়স আনুমানিক ২৮ বছর। পরে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। তাঁর পরনে ছিল সাদা পায়জামা ও কালো জামা।
হাতে ছিল ঘড়ি। পকেটে একটি আইফোন পাওয়া যায়। ওই মুঠোফোনের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করে জানা যায়, তিনি বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি।
নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুনও প্রথম আলোকে বলেন, মুঠোফোনের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় জানা যায়।
মরদেহ উদ্ধারের পরপর পুলিশ যে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছে, তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, তাহসিফের শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলা যাবে।
ময়নাতদন্ত সম্পন্ন, পরীক্ষাগারে নমুনা
নৌ পুলিশ বুধবার মধ্যরাতে তাহসিফের মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠায়। সেখানকার ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাশাত জাবীন গতকাল দুপুরে মরদেহের ময়নাতদন্ত করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাহসিফের পাকস্থলী, লিভার, কিডনি ও রক্ত পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে প্রতিবেদন পাওয়া গেলে ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। তখন মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বলা যাবে। তাহসিফের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
তবে নাশাত জাবীনের বরাত দিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ আইনুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, তাহসিফের ডিএনএ নমুনা রাখা হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষায় তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মৃত্যুর কারণ নিয়ে কথা বলবেন।
তবে পুলিশ জানিয়েছে, তাহসিফের পরিচয় আগেই নিশ্চিত করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর তাঁর বাবা মরদেহ গ্রহণ করেছেন।
আত্মহত্যা নয় বলে দাবি বাবার
গতকাল বেলা দুইটার আগে তাহসিফের লাশ নিতে মর্গে কোনো স্বজন আসেননি। ময়নাতদন্ত শেষে বেলা ২টা ২০ মিনিটে তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিম মর্গে এসে ছেলের মরদেহ গ্রহণ করেন। এরপর ফ্রিজিং ভ্যানে মরদেহ নিয়ে পুলিশ পাহারায় উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসার উদ্দেশে রওনা হন।
মর্গে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এনায়েতুল করিম বলেন, তাঁর ছেলের মৃত্যু আত্মহত্যা নয়। সরকার তদন্ত করলে প্রকৃত অপরাধীদের বের করতে পারবে, খুনি চক্র কারা, তা জানা যাবে।
এনায়েতুল করিম বলেন, ‘ঘটনার আগের দিন তাহসিফ তার মায়ের সঙ্গে ছিল। শপিং করেছে, ভেরি হ্যাপি মুডে ছিল। সে তো অ্যাসেট, দেশের পাইলট। ওর দীপ নামের একটা বন্ধু এসেছিল। মাকে বলেছিল নিচ থেকে কথা বলে আসি। এরপর ও আর ফেরে নাই।’
এনায়েতুল করিম আরও বলেন, ‘রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ তার মাকে ভয়েস মেসেজ দিয়েছিল, আমি আসতেছি। দীপের কাছে তাহসিফের ব্যাপারে জানতে চাইলে সে বলে, আমি জানি না। তবে দীপ বলেছিল, ঘটনার আগের দিন রাত ১২টা পর্যন্ত তাহসিফ আমাদের বাসার কম্পাউন্ডে ছিল।’
ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় গেলেও সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেননি বলে জানান এনায়েতুল করিম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ছেলে মিসিং হওয়ার পর থানায় খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম, জিডি করিনি।’ মামলা করবেন কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দাফন কাফন শেষে এ ব্যাপারে চিন্তা করব।’
গতকাল আসরের নামাজের পর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে তাহসিফের জানাজা হয়। পরে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
এদিকে উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান গতকাল রাত সাড়ে আটটার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, এই ঘটনায় তখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।
চাকরি হারানোর বিষয়ে যা বলছে পরিবার
তাহসিফ সাউরি বিমানবাহিনীতে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে কর্মরত ছিলেন। ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার কথা বলা হয়।
তাঁর বাবা এনায়েতুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘শৃঙ্খলাজনিত’ কারণে ছেলের চাকরি গিয়েছিল। ছেলের স্বভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সে ছিল অত্যন্ত জেন্টেল প্রকৃতির ও সামাজিক। সিনিয়র-জুনিয়র সবার সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক ছিল।’
বিমানবাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তার মৃত্যু নিয়ে গতকাল সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ওই দিন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হেলিকপ্টারে গণভবন থেকে কুর্মিটোলায় বিমানবাহিনীর ঘাঁটি নামার সময়ের ভিডিও তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তখন কর্মরত বিমানবাহিনী কর্মকর্তা তাহসিফ ওই ভিডিও প্রথম সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেছিলেন বলে আলোচনা রয়েছে। যার কারণে তাঁর মৃত্যু ঘিরে নানা আলোচনা তৈরি হয়।
সূত্র: প্রথম আলো