জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ গত অর্থবছরে চিতাবাঘ কেনার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে দরপত্র, কার্যাদেশ, আন্তর্জাতিক অনুমতিসহ বেশির ভাগ প্রক্রিয়া শেষ হলেও সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। চলতি অর্থবছরে আবার দুটি চিতাবাঘ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি জাতীয় চিড়িয়াখানা তিনটি সিংহ, দুটি হায়েনা ও তিনটি উল্লুক কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এসব প্রাণী কেনার জন্য ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ আছে।
জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক মো. শাহিনুর আলম প্রথম আলোকে এসব তথ্য নিশ্চিত করে বলেছেন, চিড়িয়াখানায় থাকা সিংহ, হায়েনা ও উল্লুকের সঙ্গী নেই। দীর্ঘ সময় ধরে তারা নিঃসঙ্গ। তারা যেন সঙ্গী পায়, সে জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া চিড়িয়াখানায় কোনো চিতাবাঘ নেই। এই প্রাণীর প্রতি দর্শনার্থীদের আগ্রহ রয়েছে। তাই চিতাবাঘও কেনা হবে।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, চিতাবাঘ, সিংহ, হায়েনা ও উল্লুক কেনার জন্য ১২ অক্টোবর ইজিপিতে (ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা) দরপত্র দেওয়া হয়। ২৬ অক্টোবর দরপত্র উন্মুক্ত হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান এসব প্রাণী সরবরাহ করার জন্য আবেদন করেছে, এখন তাদের আবেদন মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সব প্রক্রিয়া শেষে আগামী জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে এসব প্রাণী দেশে আসতে পারে।
সঙ্গী পাচ্ছে হায়েনা, সিংহ, উল্লুক
জাতীয় চিড়িয়াখানায় একটি চিত্রা হায়েনা ও একটি ডোরাকাটা হায়েনা আছে। চিত্রা হায়েনাটি ২০১৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে সঙ্গীহীন। ডোরাকাটা হায়েনাটিরও সঙ্গী নেই। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি চিত্রা হায়েনা ও একটি ডোরাকাটা হায়েনা কেনা হবে, যাতে চিড়িয়াখানায় থাকা হায়েনা দুটি সঙ্গী পায়। সঙ্গী পেলে তারা প্রজনন করতেও পারবে।
জাতীয় চিড়িয়াখানায় ‘দীপ’ নামের আফ্রিকান সাদা সিংহটি সঙ্গীহীন আছে ২০২২ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে। এ ছাড়া দুটি আফ্রিকান স্ত্রী সিংহ রয়েছে। নাম মুক্তা ও ডেইজি। মুক্তা ২০১৯ সাল থেকে ও ডেইজি ২০২৩ সাল থেকে পুরুষ সঙ্গীহীন।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা তিনটি আফ্রিকান সিংহ কেনার জন্য দরপত্র দিয়েছে। এর মধ্যে দুটি পুরুষ ও একটি মাদি, যাতে নিঃসঙ্গ সিংহী দুটি সঙ্গী পায়।

জাতীয় চিড়িয়াখানায় বর্তমানে মোট পাঁচটি সিংহ রয়েছে। আরও কেনা হচ্ছে তিনটি। এর মধ্যে এক জোড়া সিংহ রংপুর চিড়িয়াখানায় দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। একটি উল্লুকও রয়েছে জাতীয় চিড়িয়াখানায়। এটি ২০২২ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা তিনটি উল্লুক কেনার জন্য দরপত্র দিয়েছে। এর মধ্যে দুটি পুরুষ এবং একটি মাদি। চিড়িয়াখানায় থাকা নিঃসঙ্গ উল্লুককে সঙ্গী দেওয়া হবে। এক জোড়া বাড়তি উল্লুকও আনা হবে।
জানা গেছে, জাতীয় চিড়িয়াখানায় ১০টি প্রাণী সঙ্গীহীন জীবন কাটাচ্ছে। সেগুলো হলো, গন্ডার, কেশোয়ারি পাখি, ক্যাঙারু, ইন্ডিয়ান সারস ক্রেন, হামাদ্রিয়াস বেবুন, উল্লুক, কুলু বানর, আফ্রিকান সাদা সিংহ, চিত্রা হায়েনা ও ডোরাকাটা হায়েনা। কোনোটি একা আছে প্রায় ১৭ বছর, কোনোটি এক বছরের কিছু বেশি সময় ধরে।
এ ছাড়া জাতীয় চিড়িয়াখানায় এমন কিছু প্রাণী আছে, যাদের প্রজাতির অন্য সদস্য আছে, কিন্তু বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গী নেই। যেমন দুটি আফ্রিকান স্ত্রী সিংহ, দুটি পুরুষ হনুমান লেঙ্গুর, লোনাপানির তিনটি পুরুষ কুমির ও মিঠাপানির দুটি পুরুষ কুমির। এসব সঙ্গীহীন প্রাণীর মধ্যে হায়েনা, সিংহ ও উল্লুককে সঙ্গী দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে চলতি অর্থবছরে। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সামনে সঙ্গীহীন অন্য প্রাণীদের সঙ্গী দেওয়ার জন্য নতুন প্রাণী কেনা হবে।
আবার চিতাবাঘ কেনার উদ্যোগ
২০২৫-২৬ অর্থবছরে চারটি চিতাবাঘ কেনার উদ্যোগ নিয়েছিল চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। অর্থবছর শেষ হয়েছে গত ৩০ জুন। অর্থবছর শেষ পর্যায়ে থাকায় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের বিল জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ২৩ জুন। সে কারণে কার্যাদেশে ২০ জুনের মধ্যে চিতাবাঘ সরবরাহের শর্ত রাখা হয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্রাণীগুলো সরবরাহ করতে পারেনি। চলতি অর্থবছরে আবার চিতাবাঘ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এবার দুটি চিতাবাঘ কিনতে দরপত্র দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালকের কার্যালয় জানিয়েছে, শেষ মুহূর্তে যেন জটিলতা তৈরি না হয়, সে জন্য এবার আগেভাগেই প্রাণী কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করা যায়, আগামী জানুয়ারি কিংবা ফেব্রুয়ারির মধ্যে চিতাবাঘসহ দরপত্রের সব প্রাণী আনা সম্ভব হবে।
কেমন আছে কমন ইল্যান্ড ও ওয়াইল্ড বিস্ট
গত অর্থবছরে চিতাবাঘ আনতে না পারলেও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দুটি কমন ইল্যান্ড ও দুটি ওয়াইল্ড বিস্ট আমদানি করা হয়েছিল। কমন ইল্যান্ডের একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী। আর ওয়াইল্ড বিস্ট দুটি পুরুষ। গত জুনে তাদের জাতীয় চিড়িয়াখানায় আনা হয়।
২৪ অক্টোবর সরেজমিনে দেখা যায়, কমন ইল্যান্ড দুটিকে একটি খাঁচায় রাখা হয়েছে। তারা সবুজ ঘাস খাচ্ছিল। দেখতে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মনে হয়েছে। পুরুষ ওয়াইল্ড বিস্ট দুটির খাঁচায় আরও দুটি ওয়াইল্ড বিস্ট রয়েছে। অর্থাৎ মোট চারটি ওয়াইল্ড বিস্ট একটি খাঁচায়। চারটি প্রাণীকেই একসঙ্গে সবুজ ঘাস খেতে দেখা যায়।
জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক প্রথম আলোকে বলেন, গত অর্থবছর আমদানি করা প্রাণীগুলো ভালো আছে। বেশ বড় হয়ে গেছে। দেখতেও সুন্দর হয়েছে। কমন ইল্যান্ড দুটির প্রজননের সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। ওয়াইল্ড বিস্ট দুটিও আগের দুটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশে গেছে।
সূত্র: প্রথম আলো