গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:৩৯ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:০০ এএম

৪০ কোটি টাকার ভবন পড়ে আছে, দুই বছরেও চালু হয়নি মেহেরপুর নার্সিং কলেজ

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
৪০ কোটি টাকার ভবন পড়ে আছে, দুই বছরেও চালু হয়নি মেহেরপুর নার্সিং কলেজ

মেহেরপুর পৌর শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নার্স হিসেবে কর্মরত সুইটি আক্তার। নার্সিংয়ে পড়াশোনা করতে তাঁকে যেতে হয়েছিল ঢাকায়। সেখানে বাসা ভাড়া করে থেকে পড়াশোনার খরচ জোগাতে হিমশিম খেয়েছে তাঁর পরিবার।

সুইটি আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেহেরপুরে নার্সিং কলেজ না থাকায় আমাদের মতো দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের ঢাকায় বাসা ভাড়া করে থেকে পড়াশোনা করতে হয়েছে। এতে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। পড়াশোনার খরচ জোগাতে বাবার বন্ধক রাখা কৃষিজমি দুই বছর ধরে চাকরি করেও ছাড়াতে পারিনি।’

সুইটির মতো শিক্ষার্থীদের নিজ জেলায় নার্সিং শিক্ষার সুযোগ করে দিতে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে মেহেরপুর নার্সিং কলেজ। চারতলা একাডেমিক ভবন, চারতলা ছাত্রাবাসসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের ২৭ জুন। কিন্তু দুই বছরের বেশি সময় পার হলেও কলেজটিতে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি। শিক্ষক–শিক্ষার্থী নেই, নিয়োগ হয়নি প্রয়োজনীয় জনবল। আসেনি আসবাব ও প্রশিক্ষণের যন্ত্রপাতি। যে কারণে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পৌর শহরের টিঅ্যান্ডটি মোড় এলাকায় মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের পাশেই ৩ একর ৬৩ শতক জমির ওপর নার্সিং কলেজটির অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ৩৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। নার্সিং শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং দক্ষ নার্স তৈরির উদ্দেশ্যে কলেজটি নির্মাণ করা হলেও প্রশাসনিক জটিলতায় এর সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয় শিক্ষার্থীরা।

তিন মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে প্রক্রিয়া

কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম চালুর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, প্রশাসনিক অনুমোদন, পদ সৃজন ও জনবল পদায়নের প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। এসব কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের পরিচালক নাহিদ-উল-মোস্তাক (শিক্ষা, অর্থ ও বাজেট) মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, মেহেরপুর নার্সিং কলেজ পরিচালনার জন্য তিনটি পর্যায়ে প্রশাসনিক কাজ চলছে। অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ে, প্রশাসনিক অনুমোদন ও পদায়নের বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এবং প্রয়োজনীয় পদ সৃজনের বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন। তিনি আশা করছেন, আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে প্রক্রিয়াগুলো শেষ হবে।

তবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর শিক্ষক ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ, আসবাব ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। এর ফলে জানুয়ারির মধ্যে প্রশাসনিক কাজ শেষ হলেও কবে নাগাদ পাঠদান শুরু হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

মেহেরপুর নার্সিং কলেজের একাডেমিক ভবন। সম্প্রতি তোলা

আদালতে মামলাও বাধা

প্রশাসনিক জটিলতার পাশাপাশি নার্সদের পদায়ন–সংক্রান্ত মামলাও কলেজটি চালুর পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। নতুন জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নার্সদের পদায়ন করে অন্তত প্রাথমিকভাবে কার্যক্রম শুরুর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু উচ্চ আদালত ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে পদায়ন–সংক্রান্ত মামলা থাকায় সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।

নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের পরিচালক নাহিদ-উল-মোস্তাক বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম, অন্তত নার্সদের দিয়ে কলেজটির কার্যক্রম শুরু করতে। কিন্তু উচ্চ আদালত ও ট্রাইব্যুনালে পদায়নসংক্রান্ত মামলা থাকায় অন্য কোনো স্থানের নার্সদের এখানে পদায়ন করাও সম্ভব হচ্ছে না।’

শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা বাড়ছে

মেহেরপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিয়া আক্তার ভবিষ্যতে নার্সিংয়ে পড়তে চায়। কিন্তু নিজ জেলায় সেই সুযোগ না থাকায় তাকে অন্য জেলায় গিয়ে পড়াশোনা করতে হতে পারে। এতে পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সামিয়া আক্তার প্রথম আলোকে বলে, ‘আমি নার্সিং পড়তে চাই। শুনেছি, নার্সিংয়ে পড়াশোনা শেষ করলে চাকরির সুযোগ আছে। দেশে নার্সদের অনেক চাহিদা। আমাদের শহরেই যদি নার্সিং পড়ার সুযোগ থাকত, তাহলে বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতে পারতাম।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নার্সিং কলেজ চালু হলে শুধু শিক্ষার্থীরাই উপকৃত হবেন না, স্থানীয় হাসপাতালের সেবার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে প্রতিষ্ঠানটি। নার্সিং শিক্ষার্থীরা হাসপাতালে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন।

মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স মিনতি বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসকের সংকট তো কয়েক যুগ ধরেই রয়েছে। অনেক সময় চিকিৎসকের কিছু কাজও আমাদের সামলাতে হয়। শিক্ষানবিশ নার্স পাওয়া গেলে রোগীদের আরও দ্রুত সেবা দেওয়া সম্ভব হতো।’

ভবন প্রস্তুত, শিক্ষা কার্যক্রম চালুর অপেক্ষা। সম্প্রতি মেহেরপুর নার্সিং কলেজে
নাহিদ-উল-মোস্তাক, পরিচালক, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরআমরা চেয়েছিলাম, অন্তত নার্সদের দিয়ে কলেজটির কার্যক্রম শুরু করতে। কিন্তু উচ্চ আদালত ও ট্রাইব্যুনালে পদায়নসংক্রান্ত মামলা থাকায় অন্য কোনো স্থানের নার্সদের এখানে পদায়ন করাও সম্ভব হচ্ছে না।

গত বুধবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, নার্সিং কলেজের প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। আশপাশের লোকজন জানান, ভেতরে একজন নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন। ডাকাডাকি শুনে বেরিয়ে এসে তিনি ফটকের তালা খুলে দেন।

ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সারি সারি ফাঁকা কক্ষ। কলেজ ভবনের সামনের ফাঁকা জায়গায় ফুটে আছে কাশফুল। চারদিকে সুনসান নীরবতা। আবাসিক ভবনে যাওয়ার কংক্রিটের সড়কের ফাঁকে ফাঁকে জন্মেছে ঘাস। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকা ভবনের কক্ষগুলোতে জমেছে ধুলার স্তর।

নিরাপত্তাকর্মী রবিউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে কেউ আসে না। কবে কলেজ চালু হবে, তা-ও জানি না। সব কক্ষে ধুলার স্তর পড়েছে।’

মেহেরপুরের সিভিল সার্জন এ কে এম আবু সাঈদ প্রথম আলোকে বলেন, নার্সিং কলেজ চালু করতে তাঁরা নিয়মিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। চিঠি আদান-প্রদান করেছেন। ঠিকাদার নির্মাণকাজ শেষ করে ভবন স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করেছে। কিন্তু নার্সিং কলেজ তো শুধু ভবন দিয়ে চলবে না। কলেজটি চালাতে যন্ত্রপাতি, জনবল ও চিকিৎসা–সংক্রান্ত সরঞ্জাম প্রয়োজন।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।