পাকিস্তানের কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের জীবন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তার ছেলে সুলাইমান খান। গত আগস্টের পর থেকে পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীরা সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি বলে দাবি করেন তিনি।
সুলাইমানের দাবি, তার বাবাকে হত্যার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ জন্য পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরকে দায়ী করেছেন তিনি। সুলেমানের আশঙ্কা, মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির মতো পরিণতি হতে পারে তার বাবারও।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্নীতি ও ঘুষের মামলায় দণ্ডিত হয়ে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দি রয়েছেন ৭৪ বছর বয়সী ইমরান খান। কারাগারে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হচ্ছে এবং স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে তার পরিবার।
শতাধিক মামলার মুখোমুখি হওয়া ইমরানকে কারাগারে একাকী বন্দি করে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে সেগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন তিনি।
ইমরান খানের প্রথম স্ত্রী ব্রিটিশ ধনকুবের পরিবারের সদস্য জেমাইমা গোল্ডস্মিথের ছেলে সুলেমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, আগস্টে তার বাবা নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর কেউ যোগাযোগ করতে পারেননি।
সুলেমান লেখেন, ‘আগস্টের পর থেকে কেউ আমার বাবাকে দেখেনি, তার কণ্ঠও শোনেনি। ওই সময় তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, তাকে নির্যাতন করা হচ্ছে এবং মিসরের সরকার যেভাবে মুরসিকে হত্যা করেছিল, এখানকার শাসকরাও তাকে সেভাবে হত্যা করার চেষ্টা করছে।’
তিনি ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, ইমরান খানের চিকিৎসা, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিশ্চিত করতে গত আগস্টে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ইমরানকে বেসরকারি শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে পরীক্ষা ও চিকিৎসা করানোর কথা ছিল। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত সাক্ষাৎ এবং আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার নির্দেশও ছিল। কিন্তু সেনাপ্রধান আসিম মুনির সেই নির্দেশ উপেক্ষা করে চলেছেন বলে অভিযোগ সুলেমানের।
তিনি আরও বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে তারা তাকে হত্যা করার চেষ্টা করছে। কারণ, তিনি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং তাকে ভয় পায় তারা। খারাপ কিছু ঘটলে এর জন্য কে দায়ী, তা নিয়ে কারও কোনো ভুল করা উচিত হবে না।’
তবে পাকিস্তান সরকার ইমরান খানের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও তাকে একাকী বন্দি করে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। গত আগস্টে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) লিখিত বক্তব্যে দেশটির তথ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ইমরান খানকে কোনো সরকারি আদেশে আটক রাখা হয়নি। বরং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতের দেওয়া সাজা ভোগ করছেন তিনি।
ইমরানের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন, আটক পরিবারের সদস্যরাও
ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে অংশ নিতে তার দুই ছেলে সুলেমান খান ও কাসিম খান পাকিস্তানে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন বলে জানা গেছে। তবে পরিবারের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারের পর তাদের পাকিস্তান সফর না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বর মাসে ইমরানের তিন বোন আলিমা খান, উজমা খান ও নুরিন নিয়াজিকে বিক্ষোভের পরিকল্পনার আগে পাঞ্জাব প্রদেশের জনশৃঙ্খলা রক্ষা অধ্যাদেশের আওতায় আটক করা হয়। সোমবার (২ নভেম্বর) পাঞ্জাব সরকারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের আটকের মেয়াদ আরও ৩০ দিন বাড়ানো হয়েছে।
কারাগারে বন্দি থাকলেও পাকিস্তানে ইমরান খানের জনপ্রিয়তা এখনো ব্যাপক। চলতি মাসের শুরুতে তার মুক্তির দাবিতে আয়োজিত এক সমাবেশে হাজার হাজার সমর্থক অংশ নেন। পরে বিক্ষোভকারীরা ইসলামাবাদের দিকে দীর্ঘ পদযাত্রা করেন। তাদের দাবির মধ্যে ছিল ইমরানের মুক্তি, কারাগারে তার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ বাড়ানো এবং তার পছন্দের চিকিৎসকদের মাধ্যমে চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
গত ১১ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকার স্থগিত করা হয়।
আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী ওই প্রদেশে সন্ত্রাসী তৎপরতার কথা উল্লেখ করে জরুরি অবস্থা জারির পক্ষে যুক্তি দিয়েছে পাকিস্তান সরকার। তবে পিটিআই এ পদক্ষেপকে ‘জরুরি অবস্থার আড়ালে অভ্যুত্থানের মতো ঘটনা’ বলে বর্ণনা করেছে। দলটির অভিযোগ, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে চলমান আন্দোলন দুর্বল করতেই কর্তৃপক্ষ এ উদ্যোগ নিয়েছে।
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স