গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:৪৬ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ০৩:০০ এএম

ব্যাংক ‘লুট করে’ আটলান্টিকের ওপারে আবদুল হাই, বললেন ‘আমি বলির পাঁঠা’

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
ব্যাংক ‘লুট করে’ আটলান্টিকের ওপারে আবদুল হাই, বললেন ‘আমি বলির পাঁঠা’

‘আমি বলির পাঁঠা’—বলছিলেন বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই ওরফে বাচ্চু।

নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রমালিকানাধীন সবচেয়ে ভালো ব্যাংকটিকে সবচেয়ে খারাপ ব্যাংকে পরিণত করার অভিযোগ রয়েছে। আছে বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাতের অভিযোগও।

অভিযোগগুলো নিয়ে আত্মগোপনে আবদুল হাই। খোঁজ নেই কয়েক বছর। অবশেষে তাঁর মুঠোফোন নম্বর পেলাম। গত জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর সঙ্গে কয়েক দফা কথা হলো। কণ্ঠ পরিচিত। চিনতে অসুবিধা হলো না।

নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগের জবাব দিলেন আবদুল হাই। অভিযোগ অস্বীকার করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। পিছলে যাওয়ার সুযোগ কম। একপর্যায়ে বললেন, বেসিক ব্যাংক থেকে অনিয়ম করে ঋণ তিনি একা দেননি, তখনকার আওয়ামী লীগ সরকারের নেতারাও দায়ী। আরও বললেন, ‘আমাকে ফাঁসাইও না।’

আবদুল হাইয়ের গল্পের পুরোটা শোনার আগে তিন যুগের পাতা ওলটাতে হবে।

১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক পিএলসি, সংক্ষেপে বেসিক ব্যাংক। এই ব্যাংক ছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কাছে এক নির্ভরতার নাম। পদাধিকারবলে এ ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকতেন শিল্পসচিব। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আবদুল হাই চেয়ারম্যান হওয়ার আগপর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ কখনোই ৩-৪ শতাংশের বেশি হয়নি। ২০০৮ সাল পর্যন্ত সেটি সেরা ব্যাংকগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত ছিল।

সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। দায়িত্ব নেয় ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। ওই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর শেখ আবদুল হাইকে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান করা হয়।

আবদুল হাই ২০১৪ সালের জুলাই পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। এই প্রায় পাঁচ বছরে ব্যাংকটিতে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে পরে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয় ব্যাংকটিকে। এ টাকা জনগণের করের টাকা। কিন্তু ব্যাংকটি যে মুখ থুবড়ে পড়ল, আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারল না।

কেন এবং কীভাবে দেশের ব্যাংক খাতের অন্যতম কেলেঙ্কারির এ ঘটনা ঘটল, তার পেছনে বহুমাত্রিক কাহিনি রয়েছে। বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন কয়েকজন পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে স্পষ্ট, আবদুল হাইকে নিয়োগ ও প্রশ্রয় দিতেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর আবদুল হাইয়ের দুর্নীতি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া ঠেকাতে চাপ দিতেন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) তৎকালীন কর্মকর্তারা।

তবে প্রথম আলো একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আবদুল হাই বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অন্তত ৬৬টি মামলায় অভিযুক্ত। কিন্তু তিনি এখন কোথায়? দুদক বলছে, আবদুল হাই দেশেই আছেন। তবে আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, আবদুল হাই আছেন কানাডায়, সপরিবার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এর আগে ২০২৩ সালেই দেশ ছাড়েন তিনি। কোন মাসে ছেড়েছেন, তা তিনি বলেননি।

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি নিয়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন। ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

কীভাবে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান

আটলান্টিক মহাসাগরের ওপার থেকে একাধিক দফায় মুঠোফোনে কয়েক ঘণ্টার আলাপে আবদুল হাই বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার পেছনের গল্প বললেন তাঁর মতো করে। তিনি ছিলেন জাতীয় পার্টির নেতা। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বাগেরহাট-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর তিনি জাতীয় রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান।

রাষ্ট্রমালিকানাধীন বলে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে সাধারণত দায়িত্বে থাকতেন শিল্পসচিব। আওয়ামী লীগ সরকার আবদুল হাইকে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান বানায় প্রচলিত রীতির বড় ব্যতিক্রম ঘটিয়ে।

আবদুল হাই প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৭-০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ঢাকার বনানীতে তিনি একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। পদাধিকারবলে সেখানকার ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সভাপতি ছিলেন তখনকার সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ। তিনি ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। তিনি (আবদুল হাই) বলেন, ‘সেই সময় সেনাপ্রধানের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। বিভিন্ন বিষয়েই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হতো। এই যোগাযোগকে তখন কাজে লাগিয়েছি। কী কাজে লাগিয়েছি, তা আর বলতে চাই না।’

সাবেক সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ বহু বছর ধরে বিদেশে। আবদুল হাইয়ের দাবির বিষয়ে বক্তব্য পেতে তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়েছিল। পাঠানো হয়েছিল প্রশ্ন। তবে সাড়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে আবদুল হাই বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না, এখনো নেই। শেখ হাসিনা আমাকে দেখতে পারতেন না। কারণ, আমি ছিলাম জাতীয় পার্টির লোক।’

আবদুল হাইকে যখন বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা হয়, তখন অর্থমন্ত্রী ছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত (প্রয়াত)। আবদুল হাইয়ের প্রতি তাঁর ক্ষোভ বিভিন্ন সময় প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু মুহিত ছিলেন অসহায়। তিনি বেসিক ব্যাংকে আবদুল হাইয়ের কর্মকাণ্ডকে ‘প্রায় ডাকাতের মতো’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন। জাতীয় সংসদে তিনি বলেই ফেলেছিলেন, জালিয়াতদের ধরতে বাধা নিজের দলের লোক (২০১৬ সালের ৩০ জুন)।

আবুল মাল আবদুল মুহিতের মৃত্যু হয় ২০২২ সালের ৩০ এপ্রিল। সাবেক সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ বিদেশে। ফলে কেন আবদুল হাইকে আওয়ামী লীগ বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান করেছিল, তা স্পষ্ট করা সম্ভব হয়নি। তবে এটা স্পষ্ট যে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর আবদুল হাইয়ের প্রভাব ছিল। কারাগারে যাওয়ার বদলে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার সুযোগ তাঁকে আওয়ামী লীগ সরকারই করে দিয়েছে।

বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বেসিক ব্যাংকে যা হচ্ছিল, তা জানতে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত একদিন আমাকে ডেকেছিলেন। সব শোনার পর আমাকে তিনি বলেন, আবদুল হাই বাচ্চুকে সরিয়ে দেওয়া দরকার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিও তা পারেননি।’

আবদুল হাইকে নিয়োগের পাশাপাশি ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রমালিকানাধীন চার ব্যাংক, তথা সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে আওয়ামী লীগ সরকার। নিয়োগ দেওয়া হয় দলীয় বিবেচনায়। ২০১০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর প্রথম পাতায় এ বিষয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘দলীয় নেতা ও সমর্থকদের পুরস্কৃত করে চার ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন’।

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি নিয়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন। ১১ সেপ্টেম্বর ২০০৯

ভবন কেনার মাধ্যমে ‘দুর্নীতির শুরু’

আবদুল হাই চেয়ারম্যান হওয়ার তিন মাসের মাথায় ২০০৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা হয়। ব্যাংকের নথিপত্র অনুযায়ী, ওই সভায় আবদুল হাই বেসিক ব্যাংকের নিজস্ব ভবন করার কথা বলেন। এর চার মাস পর ২০১০ সালের ১ এপ্রিল মতিঝিলে নির্মাণাধীন একটি ভবন কেনার জন্য ৮১ কোটি টাকার চুক্তি করে ব্যাংকটি।

কিন্তু চুক্তিটি ছিল অনিবন্ধিত। এ ধরনের চুক্তি আদালতে গ্রহণযোগ্য হয় না। চুক্তিতে বলা হয়, ভবনের নাম হবে ‘জামান-বেসিক ব্যাংক টাওয়ার’। জমির মালিক ছিলেন সিঙ্কু আকরামুজ্জামান। সিঙ্কু আকরামুজ্জামানের মালিকানাধীন একটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নাম বিজনেস রিসোর্সেস লিমিটেড। চুক্তিতে বলা হয়েছিল, ভবন নির্মাণের কাজ করবে বিজনেস রিসোর্সেস। অর্থাৎ জমি বিক্রি ও ভবন নির্মাণ—দুটিই একই ব্যক্তির কবলে।

২০১২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে বেরিয়ে আসে চুক্তির দিনই ব্যাংক থেকে ৪০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়। ভবন নির্মাণের আগেই তড়িঘড়ি করে বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন উপমহাব্যবস্থাপক নিরঞ্জন দেবনাথের মাধ্যমে (বর্তমানে আইসিবির এমডি) ৪০ কোটি টাকা পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়। এর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পান।

নিরঞ্জন দেবনাথ গত শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ভবনের বিষয়ে পর্ষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে একটি উপকমিটি করা হয়েছিল। উপকমিটি সুপারিশ করেছিল জরুরি ভিত্তিতে ৪০ কোটি টাকা পরিশোধ করার। তিনি বলেন, পরিস্থিতি তখন এতটাই খারাপ ছিল যে চেয়ারম্যানের গানপয়েন্টে এমডিসহ কারও পক্ষেই কথা বলার সুযোগ ছিল না।

ভবনের দাম হিসেবে পরে দুই বছরে আরও কয়েক দফায় পরিশোধ করা হয় ৩৬ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ৭৬ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু জমির মালিকানা তখনো ছিল বিরোধপূর্ণ। এটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল। চলছিল মামলা। এখনো ভবনটির পূর্ণ দখল পায়নি ব্যাংক।

অনিবন্ধিত চুক্তি কেন করেছিলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুল হাই এখন প্রথম আলোকে বলছেন, ‘এটা তখনকার আইনজীবী ভালো বলতে পারবেন। আমার পুরোপুরি মনে নেই।’

অবশ্য ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নথিপত্র ঘেঁটে বলছে, বিরোধপূর্ণ জমি, অনিবন্ধিত চুক্তি, এত টাকা দিয়ে দেওয়া, এসব ব্যাপারে শেখ আবদুল হাইয়ের ভূমিকাই ছিল প্রধান। তিনি নিজে এর মাধ্যমে লাভবান হয়েছিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাংক।

বেসিক ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান হেলাল আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ভবনটিতে ওঠার অপেক্ষায় আছি। এতে ভাড়ার খরচটা বাঁচবে।’

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি নিয়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন। ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ইচ্ছেমতো ঋণ বিতরণ

আবদুল হাই বেসিক ব্যাংকে চেয়ারম্যান থাকাকালে ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ অস্বাভাবিক হারে বাড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে ব্যাংকটির ঋণ ছিল প্রায় ৪ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা। ২০১২ সালে তা বেড়ে দ্বিগুণের কাছাকাছি হয়ে যায়; কিন্তু মুনাফা কমে।

২০১০ ও ২০১১ সালে বেসিক ব্যাংকের মুনাফা ছিল যথাক্রমে প্রায় ৬৬ ও ৯৭ কোটি টাকা। ২০১২ সালে তা নেমে আসে প্রায় ৩ কোটি টাকায়। তারপর ২০১৩ সালে ব্যাংকটি যে লোকসানে পড়ল, আর লাভের মুখ দেখেনি। ২০২০ সালের ১২ জানুয়ারি প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, ‘আবদুল হাই বাচ্চুর মতো একটা লোকই বেসিক ব্যাংক ধ্বংস করে দিল।’

আবদুল হাই বাচ্চু যখন চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পান, তখন বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন এ কে এম সাজেদুর রহমান। ২০০৮ সালের ২৩ জুলাই থেকে ২০১০ সালের ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটিতে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

সাজেদুর রহমান গত ২৭ অক্টোবর ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে বসে সেই সময়কার ঘটনাবলি নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে ঘণ্টাখানেক কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘শেখ আবদুল হাই ব্যাংকে যোগ দেওয়ার কয়েক মাসের মাথায় বুঝতে পারলাম তিনি কোন প্রকৃতির মানুষ। তিনি ব্যাংকের নিয়মকানুন মানতেন না। এসব দেখে ব্যাংক থেকে যে চলে আসব, সে উপায়ও ছিল না। কারণ, ব্যাংক ছাড়া যাবে না বলে প্রতিনিয়ত হুমকি দিতেন তিনি।’

সাজেদুর রহমান বলেন, ‘একদিন গোপনে তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমানের শরণাপন্ন হই। তাঁকে সব জানাই এবং বলি যে এখানে কোনো ব্যাংকিং হচ্ছে না; বরং মানুষের আমানতের টাকা লুটের পাঁয়তারা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘সব শুনেও আতিউর রহমান সহায়তার কোনো আশ্বাস দিলেন না। তিনি নিজের অসহায়ত্বের কথা জানালেন। ফিরে আসার পর শেখ আবদুল হাই মিটি মিটি হাসতে হাসতে আমাকে প্রশ্ন করলেন, “গভর্নরের কাছে গেছিলা নাকি?” মনে মনে ভাবলাম গভর্নরের সঙ্গে দেখা করার তথ্যটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কেউ নিশ্চয়ই বাচ্চুকে জানিয়ে দিয়েছে। আমিও আর অস্বীকার করিনি।’

সাজেদুর রহমান ২০১০ সালের শেষ দিকে চিকিৎসার জন্য অস্ট্রেলিয়া যান। ওই বছরের ২ নভেম্বর থেকে তাঁর ছুটি শুরু হয়। ফেরেন ২৫ ডিসেম্বর। তিনি বলেন, ফেরার পর তাঁকে ব্যাংকে যোগ দিতে বলা হয়। তবে তিনি আর যোগ দেননি। ২৭ ডিসেম্বর লোক মারফত পদত্যাগপত্র জমা দেন।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আবদুল হাইয়ের সম্পর্ক কেমন ছিল, তা বোঝাতে একটি ঘটনার কথা বলেন সাজেদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে অগ্নিকাণ্ডের পর ব্যাংকের পর্ষদ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ৫০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যাংকের চেয়ারম্যান আমাকে নিয়ে অনুদানের চেক দিতে গণভবনে গেলেন শেখ হাসিনার কাছে। দূর থেকে দেখেই শেখ হাসিনা বলছিলেন, “কি রে বাচ্চু? তুই কেন?” আবদুল হাই বাচ্চু বললেন, “আপা, নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অনুদান দিতে এসেছি।” “শেখ হাসিনা বললেন, ‘তাইলে তো ভালো। খুবই ভালো।”’

সাজেদুর রহমান বলেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে আবদুল হাইয়ের সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিল যে তিনি তাঁকে (আবদুল হাই) ‘তুই তুই’ করে সম্বোধন করতেন।

সাজেদুর রহমান পদত্যাগ করার পর কাজী ফখরুল ইসলাম বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন। দুদকের একটি সূত্র বলছে, ২০১৪ সালের ২৬ মে অপসারিত হওয়ার পর তিনি মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যান।

একের পর এক অনিয়ম

প্রথম আলোর পুরোনো প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়, অনিয়মের অভিযোগ উঠতে থাকায় ২০১২ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক বেসিক ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় বিশেষ পরিদর্শন শুরু করে। গুলশান, দিলকুশা, শান্তিনগরসহ কয়েকটি শাখায় অনিয়ম ধরা পড়ে। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সময়কালে ব্যাংক থেকে ঋণের নামে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার চিত্র উঠে আসে। অধিকাংশ ঋণ যথাযথ যাচাই ছাড়াই দেওয়া হয়েছিল।

এ কে এম সাজেদুর রহমান, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বেসিক ব্যাংকফিরে আসার পর শেখ আবদুল হাই মিটি মিটি হাসতে হাসতে আমাকে প্রশ্ন করলেন, “গভর্নরের কাছে গেছিলা নাকি?” মনে মনে ভাবলাম গভর্নরের সঙ্গে দেখা করার তথ্যটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কেউ নিশ্চয়ই বাচ্চুকে জানিয়ে দিয়েছে। আমিও আর অস্বীকার করিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সতর্ক করেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চিঠি পাঠায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে। পরে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়; কিন্তু তাতেও ঋণ অনিয়ম বন্ধ হয়নি।

তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৩ সালের ১৮ আগস্ট রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিয়ে বৈঠক করেন। আবদুল হাইকে বৈঠকে উপস্থিত থাকতে বলা হলেও তিনি যোগ দেননি। এরপর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আরও কঠোর ভাষায় চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। চিঠিতে ব্যাংকের ঋণশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার কথা বলা হয়।

২০১৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করে সরকারকে এবং একই মাসে ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করে। দুই মাস পর ২০১৪ সালের জুলাইয়ে শেখ আবদুল হাই চেয়ারম্যান পদ ছাড়েন। ওই বছরের ৪ জুলাই তিনি তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বাসায় গিয়ে পদত্যাগপত্র দেন, যার পরদিন ৫ জুলাই ছিল স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মেয়াদের শেষ দিন।

আবদুল হাইকে যখন বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা হয়, তখন অর্থমন্ত্রী ছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত (প্রয়াত)। আবদুল হাইয়ের প্রতি তাঁর ক্ষোভ বিভিন্ন সময় প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বেসিক ব্যাংকে আবদুল হাইয়ের কর্মকাণ্ডকে ‘প্রায় ডাকাতের মতো’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন

ব্যাংকের বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে কানাডা থেকে আবদুল হাই প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি একাই কি প্রতিটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছি? সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়া তো অন্য পর্ষদ সদস্য ও কর্মকর্তাদের মাধ্যমে হয়েছে। শুধু চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর থাকলেই তাঁকে পুরো প্রক্রিয়ার জন্য একমাত্র দায়ী ব্যক্তি বানানো যায় না।’

আবদুল হাই আরও বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলালউদ্দীনের অবৈধ হস্তক্ষেপ ছিল ব্যাংকে। শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠজন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক নীলুফার আহমেদের এ ব্যাংকে অপরিসীম প্রভাব ছিল। যুবলীগের তৎকালীন প্রেসিডিয়াম সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম এবং ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামও ছিলেন প্রভাবশালী।

নীলুফার আহমেদ ও আনোয়ারুল ইসলাম এখন কোথায় আছেন, তা জানা সম্ভব হয়নি।

বেসিক ব্যাংকে এসব কী হচ্ছে!

কানাডা থেকে আবদুল হাই বলছেন, পুরো ঋণপ্রক্রিয়ার তদন্ত করে দায়ীদের না খুঁজে চেয়ারম্যান হিসেবে একমাত্র তাঁকে দোষ দেওয়া হচ্ছে, বানানো হচ্ছে ‘বলির পাঁঠা’।

অবশ্য দুই পরিচালকের তখনকার চিঠিতে আবদুল হাইয়ের দায় উঠে আসে। ২০১৩ সালের ১১ জুলাই পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব এ কে এম রেজাউর রহমান তৎকালীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলমকে একটি চিঠি দেন। এর কয়েক দিন আগে আরেক পরিচালক হিসাববিদ এ কে এম কামরুল ইসলামকে নিয়ে তিনি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের সঙ্গে বৈঠকও করে আসেন।

চিঠিতে ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিলের ব্যাংকের একটি পর্ষদ সভার কথা আছে। রেজাউর রহমান লিখেছেন, ১৩টি অনিয়মিত ঋণের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশ্ন তোলা প্রসঙ্গে আবদুল হাই বলেছিলেন, ‘এটা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন নেই।’ চেয়ারম্যান পরের আলোচ্যসূচিতে চলে যেতে চাইলে আপত্তি জানান রেজাউর রহমান। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, বৈঠকে তিনি বলেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন একটি পত্র নিয়ে আলোচনা না করে এগিয়ে যাওয়া যায় না।

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি নিয়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন। ১২ নভেম্বর ২০২৩

রেজাউর রহমান আরও লিখেছিলেন, অনেক সময় পর্ষদ বৈঠকের আগের রাতে শত শত কোটি টাকার ঋণ ও বিনিয়োগসংক্রান্ত নথি দেওয়া হতো, যা পড়ার সময় পাওয়া যেত না। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও লবিতে প্রধানমন্ত্রীর (শেখ হাসিনা) সঙ্গে চেয়ারম্যানের তোলা ছবি টাঙানো থাকে। চেয়ারম্যান প্রায়ই পর্ষদে বলতেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার আপা। আমি তাঁকে ছাড়া কাউকে পরোয়া করি না।’

চিঠিতে রেজাউর রহমান বলেন, পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে বেসিক ব্যাংকের অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়েছে। পরিস্থিতি দেখে একদিকে পর্ষদ থেকে তাঁর সরে দাঁড়াতে ইচ্ছা করছে, অন্যদিকে বিবেক বলছে যে ব্যাংকটির স্বার্থে অন্তত পাহারাদারের দায়িত্ব পালন করা উচিত।

প্রতিবাদী দুই পরিচালক রেজাউর রহমান ও কামরুল ইসলাম পরে বেসিক ব্যাংকের পর্ষদে আর থাকতে পারেননি। সরকার পরে প্রথম জনকে সোনালী ব্যাংকে এবং দ্বিতীয় জনকে জনতা ব্যাংকের পরিচালক করে।

পরিচালক পুরস্কৃত, ব্যাংকার জেলে, ব্যবসায়ী পলাতক

বেসিক ব্যাংকের তদারকি কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংকটির পর্ষদের সভায় সরকারি সংস্থার অস্ত্রধারী ব্যক্তিও উপস্থিত থাকতেন। ফলে চেয়ারম্যান যা বলতেন, তা-ই অনুমোদিত হয়ে যেত। এই পরিস্থিতিতে কারও কিছু করার সুযোগ ছিল না।

প্রতিবাদী পরিচালক রেজাউর রহমান কয়েক বছর আগে থাইল্যান্ডের একটি হাসপাতালে মারা যান। কামরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঢাকার মিরপুরে তাঁর চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট ফার্মে যেতে বলেন। গত ৫ জুলাই সেখানে গিয়ে দীর্ঘ সময় কথা বলি তাঁর সঙ্গে।

কামরুল ইসলাম বেসিক ব্যাংকের পরিচালক থাকার সময়কালীন ঘটনা মনে করে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তিনি বলেন, ‘আবদুল হাইয়ের নেতৃত্বে ব্যাংকটি কীভাবে নষ্ট হলো, তার পুরো বিবরণই চিঠিতে উঠে এসেছে। আমার মনে হয়, দেশে একটি সরকার থাকা সত্ত্বেও এবং এত সব সংস্থা থাকা সত্ত্বেও এত লম্বা সময় ধরে একটা ভালো ব্যাংককে ধ্বংসের কাতারে নিয়ে যাওয়ার এই উদাহরণ গোটা বিশ্বেই বিরল।’

সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বরত আমলারা বেসিক ব্যাংকের পর্ষদে ছিলেন। ব্যাংকের পর্ষদে থাকলে প্রতি সভায় আট হাজার টাকা করে ভাতা পাওয়া যেত। তবে ব্যাংকটি যখন ডুবছিল, তখন পর্ষদের বেশ কয়েকজন সদস্যের পেশাজীবন তরতর করে এগিয়ে যায়।

আবদুল হাইয়ের সঙ্গে বেসিক ব্যাংকে পরিচালক নিয়োগ পান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তৎকালীন দুই মহাপরিচালক (ডিজি) শুভাশীষ বসু ও নীলুফার আহমেদ। শুভাশীষ বসু পরে বাণিজ্যসচিবও হয়েছিলেন। নীলুফার আহমেদ ২০২৪ সালের ২৮ জানুয়ারি সচিব পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ পান। তাঁরা দুজনই এখন মামলার অভিযুক্ত।

আবদুল হাইয়ের সঙ্গে বেসিক ব্যাংকের পরিচালক হয়েছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্ম সচিব বিজয় ভট্টাচার্য। তিনি পরে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। কেলেঙ্কারির পুরো সময়টাতেই কামরুন্নাহার আহমেদ বেসিক ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন। পরে তিনি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হন। বিজয় ভট্টাচার্য ও কামরুন্নাহার আহমেদ এখন অবসরজীবন কাটাচ্ছেন। তাঁরাও অভিযুক্ত।

সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বরত আমলারা বেসিক ব্যাংকের পর্ষদে ছিলেন। ব্যাংকের পর্ষদে থাকলে প্রতি সভায় আট হাজার টাকা করে ভাতা পাওয়া যেত। তবে ব্যাংকটি যখন ডুবছিল, তখন পর্ষদের বেশ কয়েকজন সদস্যের পেশাজীবন তরতর করে এগিয়ে যায়।

আবদুল হাইয়ের সঙ্গে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বর্তমানে বিলুপ্ত) সাবেক চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলাম এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সাবেক সচিব শ্যাম সুন্দর শিকদার। অবসরের পর শ্যাম সুন্দর শিকদারকে বিটিআরসির চেয়ারম্যানও করা হয়। এই দুজনও অভিযুক্ত এখন।

বেসরকারি খাত থেকে পরিচালক হওয়াদের মধ্যে রয়েছেন চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্সের তৎকালীন সভাপতি জাহাঙ্গীর আখন্দ সেলিম, সাবেক শুল্ক কমিশনার শাখাওয়াত হোসেন, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান কাজী আখতার হোসেন এবং এআরএস ল্যুভ বাংলাদেশ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম।

কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান কাজী আখতার হোসেন গত ৫ জুলাই প্রথম আলোকে বলেন, শেখ আবদুল হাইয়ের এতটাই দাপট ছিল যে তিনিসহ কোনো পরিচালকই পর্ষদে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারতেন না। তাহলে পদত্যাগ করেননি কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে কাজী আখতার হোসেন বলেন, ‘তা করা যেত।’

ঋণখেলাপি, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তবু পদোন্নতি পেয়ে সচিব

হঠাৎ ধনী আবদুল হাই

বেসিক ব্যাংকের কেলেঙ্কারির সঙ্গে আবদুল হাইয়ের ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির সম্পর্ক নিয়ে ২০১৩ সালে তদন্ত করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ক্যান্টনমেন্টে ৩০ কাঠা জমি, একটি ফ্ল্যাট, বসুন্ধরায় ১৩৮ কাঠা জমির পাশাপাশি শতকোটি টাকায় তিনি গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার জাহাজ কিনেছিলেন ৮টি। এসব সম্পদের মালিকানায় ছিলেন আবদুল হাই, তাঁর স্ত্রী শেখ শিরীন আখতার, ছেলে শেখ সাবিদ হাই অনিক, মেয়ে শেখ রাফা হাই এবং ভাই শেখ শাহরিয়ার ওরফে পান্না।

চেয়ারম্যান হওয়ার এক বছরের মধ্যেই কেনা হয় জাহাজগুলো। ছয়টি ইডেন ফিশারিজের নামে এবং দুটি ক্রাউন ফিশারিজের নামে। এগুলোর বাজারমূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। বিএফআইইউ ২০১৪ সালে এ বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন পাঠিয়েছিল দুদকে।

তদন্তে উঠে আসে বেসিক ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকা শেখ শাহরিয়ারের দুই ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরিত হয়। জাহাজগুলো কেনা হয়েছিল জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য মাহজাবীন মোরশেদ ও তাঁর স্বামী চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের কাছ থেকে, যাঁদের কাছে ওই সময় বেসিক ব্যাংকের ঋণ ছিল ৪৫০ কোটি টাকা।

এদিকে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে কেনা হয় ৩০ কাঠার বেশি জমি। ২০১২ সালের আগস্টে শেখ আবদুল হাই বেস্ট হোল্ডিংস গ্রুপের চেয়ারম্যান আমিন আহমেদের সঙ্গে ১১০ কোটি টাকার বায়না চুক্তি করেন। জমি কেনা হয় তিনিসহ তাঁর স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, ভাইসহ পাঁচজনের নামে। পুরো সম্পত্তির দলিলমূল্য দেখানো হয় ১৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা। জমির মূল্য পরিশোধে যেসব পে-অর্ডার ব্যবহৃত হয়েছিল, সেগুলোর কয়েকটি এসেছিল বেসিক ব্যাংকের গ্রাহকদের কাছ থেকে। এ তথ্য উদ্‌ঘাটন করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

পে-অর্ডার দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি যমুনা অ্যাগ্রো কেমিক্যালসের অন্যতম মালিক এবং জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য শওকত চৌধুরী ২০২০ সালে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, সহজে ঋণ পাওয়া যায় না বলেই আবদুল হাইকে ঘুষ দিতে হয়েছিল।

এদিকে ২০১২ সালেই বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আই ব্লকে ১৩৮ কাঠা জমি কেনেন শেখ আবদুল হাই। বাজারদর অনুযায়ী এই জমির মূল্য ৩০০ কোটি টাকার কাছাকাছি।

কানাডা থেকে আবদুল হাই এখন বলছেন, ক্যান্টনমেন্টের জমির দাম তিনি আস্তে আস্তে শোধ করেছেন। আর তাঁর সব সম্পদই সাদা টাকায় কেনা। তিনি বলেন, ‘আমি যে ধানমন্ডির বাড়ি বিক্রি করেছি, তার তো প্রমাণ আছে। আমি তো আর গরিব ছিলাম না। আবাসন খাতের ব্যবসা ছিল আমার।’

অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুদকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, উভয় সংস্থার কাছেই শেখ আবদুল হাই ও তাঁর ভাইয়ের ঋণের বিপরীতে ঘুষ হিসেবে কমিশন নেওয়ার তথ্য–প্রমাণ রয়েছে।

বেসিক ব্যাংকে বড় জালিয়াতি
শেখ আবদুল হাই ২০০৯ সালে চেয়ারম্যান হয়ে বেসিক ব্যাংকের জন্য ভবন কেনেন। সেই ভবন এখনো বুঝে পায়নি ব্যাংকটি। গত ২২ অক্টোবর রাজধানীর মতিঝিলে

৬৬ মামলা

শেখ আবদুল হাই চেয়ারম্যান থাকার সময়ই তাঁর নেতৃত্বাধীন পর্ষদের বিরুদ্ধে ঘুষ-অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল। তাঁর মেয়াদ শেষ হলে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমে ৫৬টি এবং পরে আরও ৩টি মামলা করে দুদক। তবে তখন মামলাগুলোর একটিতেও আবদুল হাই অথবা কোনো পর্ষদ সদস্যকে আসামি করা হয়নি।

২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ছিলেন দুদকের কমিশনার। আলোচনা আছে যে ওই সময় আবদুল হাই দুদকের ছাড় পেয়েছিলেন। পরে আদালতের নির্দেশে বাধ্য হয়ে দুদক শেখ আবদুল হাইসহ পর্ষদ সদস্যদের তলব করে। তবে তাঁদের মামলায় আসামি করা হয়নি।

২০১৬-২১ সময়ে টানা পাঁচ বছর দুদক চেয়ারম্যান ছিলেন ইকবাল মাহমুদ। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে শেখ আবদুল হাইয়ের বিষয়ে নীরব থাকার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তাঁর পুরোনো বক্তব্যে। ২০১৮ সালের ১২ এপ্রিল প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইকবাল মাহমুদ বলেছিলেন, ‘আবেগ এবং ধারণা করে কাউকে আসামি করার সুযোগ নেই। তাঁর ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি আদালতে প্রমাণ করতে পারব না।’

ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে ৩০ কাঠার বেশি জমি কেনেন শেখ আবদুল হাই। বেস্ট হোল্ডিংস গ্রুপের চেয়ারম্যান আমিন আহমেদের সঙ্গে ১১০ কোটি টাকার বায়না চুক্তি করেন। জমির মূল্য পরিশোধে যেসব পে-অর্ডার ব্যবহৃত হয়েছিল, সেগুলোর কয়েকটি এসেছিল বেসিক ব্যাংকের গ্রাহকদের কাছ থেকে।

সমালোচনার মুখে অবশেষে ২০২৩ সালের ১২ জুন বেসিক ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ-সংক্রান্ত ৫৯টি মামলার অভিযোগপত্র চূড়ান্ত করে দুদক। এগুলোর ৫৮টিতেই আবদুল হাইকে অভিযুক্ত করা হয়।

তখন দুদকের চেয়ারম্যান ছিলেন মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ। অভিযোগপত্রে নাম আসার পর আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। তবে তিনি কখনো গ্রেপ্তার হননি। আদালতে তিনি আত্মসমর্পণও করেননি। অভিযোগপত্রে নাম ওঠার আগেই তিনি দেশ ছাড়েন।

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি: ঘুষের টাকায় বাড়ি কেনেন বাচ্চু ও তাঁর ভাই

২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুদক আবদুল হাই ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে একসঙ্গে তিনটি মামলা করে। প্রথম মামলা আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে। অভিযোগ হচ্ছে জালিয়াতি ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ঋণের অর্থ আত্মসাৎ করে শেখ আবদুল হাই ১২৫ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ গড়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৫৬ কোটি টাকা কানাডায় পাচার করেছেন তিনি।

দ্বিতীয় মামলা করা হয় তাঁর স্ত্রী শেখ শিরীন আখতারের বিরুদ্ধে। সেখানে অভিযোগ, তিনি ৩৭ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের মালিক হয়েছেন। এই মামলায় শেখ আবদুল হাইও অভিযুক্ত। তৃতীয় মামলার আসামি ছেলে শেখ সাবিদ হাই অনিক। দুদকের অভিযোগ, তাঁর নামে ৪৫ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ রয়েছে। এই মামলাতেও শেখ আবদুল হাই সহ–আসামি।

২০২৫ সালের মার্চে আবদুল হাই ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে আরও তিনটি মামলা হয়। পরে আরও একটি মামলা হয়েছে। দুদক বলছে, এখন মামলার সংখ্যা ৬৬।

অর্থ পাচারের অভিযোগ বিষয়ে শেখ আবদুল হাই বলছেন, এর প্রমাণ সামনে আসা দরকার। প্রমাণ ছাড়া দায়ী করা ঠিক নয়। তাঁর ভাষ্য, ২০২৪ সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার লক্ষ্যে ২০২৩ সালে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

নজিরবিহীন সব অনিয়ম

কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকার আবদুল হাইকে বিনা বাধায় দেশ ছাড়ার সুযোগ দিয়েছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিন সপ্তাহের মাথায় গত ৯ মার্চ আদালত আবদুল হাইসহ তাঁর সময়ের পর্ষদ সদস্য, এমডি, ডিএমডি মিলিয়ে ১৬ জনের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূইয়া গত শনিবার প্রথম আলোকে জানান, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি বিষয়ে ৬৬টি মামলার মধ্যে ৬০টির অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয়েছিল। তবে কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়ে আদালত সব অভিযোগপত্রই ফেরত দিয়েছেন। বাকি ৬টিরও অভিযোগপত্র তৈরি হওয়ার পথে। তিনি বলেন, ‘সংশোধন করে আমরা খুব শিগগির সব মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করব।’

আদালত কেন অভিযোগপত্রগুলো ফেরত দিলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে সাজ্জাদ হোসেন ভূইয়া বলেন, ‘মামলাগুলোতে আসামি করা হয়েছিল খেয়ালখুশিমতো। একই সময়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিদের মধ্যে কাউকে আসামি করা হয়েছে, আবার কাউকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এটি ছিল পিক অ্যান্ড চুজ পদ্ধতি।’

বসুন্ধরায় ১৩৮ কাঠা জমি আবদুল হাই বাচ্চুর, বিক্রির চেষ্টা করছেন
বেসিক ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলাম ২০১৪ সালে দেশ ছেড়েছেন। বর্তমানে তিনি মালয়েশিয়ায় রয়েছেন বলে জানা গেছে

আরও যাঁদের ব্যর্থতা ছিল

বেসিক ব্যাংকে অনিয়মের উদাহরণ অনেক। যেমন আবদুল হাই চেয়ারম্যান থাকার সময় বেসিক ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে এশিয়ান ফুড ট্রেডিংকে ৭৯ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। ঋণ পেয়েই গ্রাহক টাকার একটা অংশ জমা করেন আবদুল হাইয়ের ব্যাংক হিসাবে, আরেকটা অংশ জমা করেন তাঁর ভাই শেখ শাহরিয়ারের হিসাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক পরে বের করেছে, দুই ভাই এভাবে ৩০ কোটি টাকা নিয়েছেন এক গ্রাহক থেকেই।

শুধু ঋণ অনিয়ম নয়, নিয়োগেও জালিয়াতি করা হয়েছিল। শিক্ষাগত যোগ্যতা, বয়স, লিখিত-মৌখিক পরীক্ষা, নিয়োগসংক্রান্ত বিধিবিধান—কোনো কিছুই না মেনে বেসিক ব্যাংকে ২০১২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ১ হাজার ১৭৩ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের ২০১৪ সালের এক প্রতিবেদনে এ নিয়োগকে ‘নজিরবিহীন’ বলে মন্তব্য করা হয়েছিল।

হেলাল আহমেদ চৌধুরী, চেয়ারম্যান, বেসিক ব্যাংক‘আগের কাহিনি আইন অনুযায়ী চলুক। ব্যাংকটি ভালো করার জন্য সরকারের কাছে স্বল্প সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার আমানত চেয়েছি। এটা পেলে ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকে আমানত বেড়েছে। কমেছে খেলাপি ঋণ।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে উঠে এসেছে, প্রধান কার্যালয়ের লিখিত অনুমোদন ছাড়াই ব্যাংকের আইটি বিভাগ ঋণের দরজা খুলে দিত, আর ব্যাংকের শাখা কার্যালয় ইচ্ছেমতো ঋণ সৃষ্টি করত। শাখাকে অনবরত টাকা সরবরাহ করত ট্রেজারি বিভাগ। অথচ এসব বিভাগের কেউ শাস্তির মুখে পড়েনি।

বেসিক ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করতেন তখনকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলাম এবং দুই ডিএমডি এ মোনায়েম খান ও রুহুল আলম। অন্য দুই ডিএমডি ফজলুস সোবাহান ও অনুপ কুমার পুরকায়স্থ চট্টগ্রামের সব শাখা নিয়ন্ত্রণ করতেন।

৭৬ কোটি টাকা দিয়েও ভবন পায়নি

বেসিক ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, রুহুল আলম ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। ব্যাংকিং কাজে কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সরাসরি উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন আবদুল হাই। সেটা ২০১২ সালের এপ্রিলে। চাকরি স্থায়ী হওয়ার আগে সাত মাসের মাথায় মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় তাঁকে। এর এক বছরের মাথায় তাঁকে করা হয় ডিএমডি। পদোন্নতির কারণ হিসেবে পর্ষদের নথিতে তখন ‘অতি চমৎকার কর্মনৈপুণ্যের জন্য পদোন্নতি দেওয়া হলো’ উল্লেখ করা হয়। অথচ জিএম পদে পদোন্নতি পেতে গেলে ডিজিএম পদে কমপক্ষে তিন বছরের কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং ব্যাংকিং কাজে কমপক্ষে ১৮ বছরের অভিজ্ঞতার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

শেখ আবদুল হাই যুগ শেষ হওয়ার পর চেয়ারম্যান হিসেবে আসেন এই ব্যাংকেরই সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলাউদ্দিন এ মজিদ। তাঁর সময়ে দেওয়া ঋণও এখন খেলাপির তালিকায়। জানতে চাইলে আলাউদ্দিন এ মজিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ব্যাংকটিকে ভালো করার চেষ্টা করেছি। এত খাদে পড়ে গিয়েছিল যে পুরোপুরি পারিনি।’

এক বছর আট মাসেই ডিএমডি!
রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই ব্লকের ৭১৯ ও ৭২০ নম্বর প্লটে শেখ আবদুল হাইয়ের ১৩৮ কাঠা জমি রয়েছে। ২০২৩ সালে সেই জমি তিনি বিক্রির চেষ্টা করেছিলেন। তবে প্রথম আলো তা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। পরে আদালত জমি বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন

ব্যাংক বাঁচাতে করের টাকা

দুর্দশায় থাকা বেসিক ব্যাংককে ২০২৪ সালের এপ্রিলে বেসরকারি সিটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার চেষ্টা হয়েছিল; তবে তা এগোয়নি। বেসিক ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা, যার ৬০ শতাংশই (৬ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা) খেলাপি। ব্যাংকটি সম্প্রতি সরকারের কাছে ৫ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে।

ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান হেলাল আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগের কাহিনি আইন অনুযায়ী চলুক। ব্যাংকটি ভালো করার জন্য সরকারের কাছে স্বল্প সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার আমানত চেয়েছি। এটা পেলে ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকে আমানত বেড়েছে। কমেছে খেলাপি ঋণ।’

আওয়ামী লীগ আমলে লুটপাটের শিকার হওয়া ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে এখন জনগণের করের টাকা ঢালতে হচ্ছে বিএনপি সরকারকে। গত ১১ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, আওয়ামী লীগ আমলে লুটপাটের কারণে ব্যাংক খাতের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে পরবর্তী পাঁচ থেকে আট বছরে জাতীয় বাজেট থেকে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ-সংক্রান্ত খসড়া প্রস্তাব সরকারের কাছে দেওয়া হয়েছে।

মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘যে টাকা লুট হয়েছে, সেটা জনগণের টাকা। আবার এই জনগণকেই এখন সেই টাকা ফেরত দিতে হবে।’

আবদুল হাই যা–ই বলুন না কেন, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির দায় তাঁকে নিতে হবে—বললেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মইনুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংকটিকে এমন পরিণতিতে নিয়ে আসার পেছনে যাঁরা দায়ী, তাঁদের বিচারটা দৃষ্টান্তমূলক না হলে ব্যাংক খাতে ভালো বার্তা যাবে না।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।