একই দিনে দুইবার উদ্বোধন করা হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী একটি সড়ক। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের বাখের আলী বিওপি ক্যাম্প থেকে ফরিদপুর বিওপি ক্যাম্প পর্যন্ত সড়কটির নির্মাণকাজ সকালে উদ্বোধন করেন জামায়াতের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল। একই দিন বিকেলে সড়কটি আবার উদ্বোধন করেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা পরিষদের প্রশাসক হারুনুর রশীদ। তবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বলছে, কোনোটিই আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন নয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরেই এমন পাল্টাপাল্টি উদ্বোধনের ঘটনা ঘটেছে।
জানা গেছে, সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের বাখের আলী বিওপি ক্যাম্প থেকে ফরিদপুর বিওপি ক্যাম্প পর্যন্ত তিন কিলোমিটার ৫৫০ মিটার সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করেছে এলজিইডি। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৪০ হাজার ৫৩১ টাকা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ছয় দিন আগে সড়কটির নির্মাণকাজ শুরু হলেও রোববার (১ নভেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। সড়কটি নির্মিত হলে সীমান্তবর্তী এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) টহল ও নজরদারি সহজ হবে। পাশাপাশি পদ্মা নদীর তীরবর্তী সীমান্ত এলাকার মানুষের যাতায়াতও সহজ হবে।
স্থানীয়রা জানান, রোববার সকালে সড়কটির নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও ঢাকা দক্ষিণ মহানগর জামায়াতের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল। একই দিন বিকেলে সড়কটি পুনরায় উদ্বোধন করেন এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও জেলা পরিষদের প্রশাসক হারুনুর রশীদ।
স্থানীয়রা আরও জানান, সকাল ও বিকেলের দুই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেই বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্যকে একে অপরের সমালোচনা করতে দেখা যায়। সকালে এমপি বুলবুলের উদ্বোধনের সময় এলজিইডির নামসংবলিত ব্যানার থাকলেও বিকেলে হারুনুর রশীদের উদ্বোধনের সময় তা ছিল না। সাবেক এমপি ফিতা কেটে সড়কটির উদ্বোধন করেন। তবে দুই অনুষ্ঠানেই এলজিইডির কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা উপস্থিত ছিলেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুলের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে উদ্বোধন শেষে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, ‘আপনি (হারুনুর রশীদ) যদি চান চাঁপাইনবাবগঞ্জে যত ভালো কাজ হবে, এর উদ্বোধনে আমার সাথে থাকতে চান, ওয়েলকাম, আপনি থাকবেন আমার সাথে। কারণ আমি সহযোগিতা ও সহমর্মিতার সঙ্গে জেলাকে সবাই মিলে এগিয়ে নিতে চাই। সুতরাং, আমি যেই কাজ উদ্বোধন করব, আপনি আমার সাথে থাকেন কোনো অসুবিধা নাই।’
হারুনুর রশীদের উদ্দেশে নুরুল ইসলাম বুলবুল আরও বলেন, ‘আপনি জেলা পরিষদের প্রশাসক, সেই বরাদ্দ নিয়ে থাকেন। আপনার যে বরাদ্দ আসবে, কী বাজেট আসছে আপনি কোন খাতে খরচ করছেন এবং করবেন, সেটি জেলা পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে খোঁজ-খবর নেয়ার দায়িত্ব এমপির আছে। এটি শুধু আমার একার নয়, সারা বাংলাদেশের সকল এমপির আছে। সুতরাং আপনার তদারকি করা আমার দায়িত্ব। কিন্তু আমার কোনো কাজের দিকে তাঁকানো আপনার দায়িত্ব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগামী ৫ বছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসনে যা কাজ হবে, তার সব কাজের দায়িত্ব হচ্ছে এমপির। যেটা এমপির কাজ, এমপিকে করতে দিবেন। ৬২ হাজার ৬১৯ ভোট বেশি পেয়ে আমি নির্বাচিত হয়েছি, এতগুলো মানুষ আমাকে আপনার থেকে বেশি সমর্থন দিয়েছে। আপনার ভোট আপনি কিভাবে পেয়েছেন, সেটি জনগণ জানে। জনগণের কোনো অধিকার নিয়ে আপনি (হারুনুর রশীদ) হন আর যেই হন, ছিনিমিনি খেললে জনগণকে সাথে নিয়ে তা প্রতিহত করব। এখানে এলজিইডির কাজ হবে, আর আপনি উদ্বোধন করবেন। আমার কাজ, আর আপনি উদ্বোধন করবেন। এই এখতিয়ার আপনাকে কে দিয়েছে, জনগণ দেয়নি।’
একই সড়ক বারবার উদ্বোধনের কারণ জানতে চাইলে সাবেক এমপি, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও জেলা পরিষদের প্রশাসক হারুনুর রশীদ বলেন, ‘এ নিয়ে এমপি বুলবুলকে প্রশ্ন করুন। তিনিই বলতে পারবেন। আমি নিজে এসব রাস্তা-ঘাটের বরাদ্দ নিয়ে আসছি, আর তিনি (এমপি বুলবুল) গিয়ে উদ্বোধন করছে। বরাদ্দ-প্রকল্প আমি নিয়ে আসছি, আর ব্যানার টাঙিয়ে গিয়ে উদ্বোধন বললেই হলো?’
তিনি আরও বলেন, ‘এত ছ্যাচড়ামি করার কোন দরকার নাই। একজন এমপির প্রটোকল তাকে বুঝতে হবে। বরাদ্দ নিয়ে আসার সুবাদে আমি সাবেক এমপি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে পরিদর্শন বা উদ্বোধন করতেই পারি।’
এর আগে, উদ্বোধন-পরবর্তী আলোচনা সভায় হারুনুর রশীদ বলেন, ‘আমাদের নতুন এমপিকে (নুরুল ইসলাম বুলবুল) বলব, বহু কাঁচা রাস্তা আছে ভাই, তুমি টাকা বরাদ্দ নিয়ে এসে কাজ করো, তোমার বরাদ্দ আনার ক্ষমতা আমরা দেখতে চাই। মানুষ চাই, এখানে আরও কাজ হোক, উন্নয়ন হোক, কোন অসুবিধা নাই। কথাবার্তা বলার সময় খুব সাবধানে বলবা, উল্টাপাল্টা কথা বললে, জনগণ কিন্তু সে ব্যাপারেও ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এরকম ছ্যাচড়া এমপি আমি দেখিনি। এত ছ্যাচড়া এমপি বাংলাদেশে আর কোথাও আছে কি না আমার জানা নেই। সড়কটি আমার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ ছিল, বাস্তবায়নেও আমার অনেক সহযোগিতা ছিল।’
সড়ক নির্মাণের ঠিকাদার মো. সেলিম রেজা বলেন, ‘বর্তমান ও সাবেক এমপি উদ্বোধনের দুই সময়ই তিনি উপস্থিত ছিলেন।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. আজহারুল ইসলাম জানান, এলজিইডির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়নি। এটি হলে ফলক বসানো হতো। কিন্তু তা করা হয়নি। বর্তমান ও সাবেক এমপি দুজনই তদারকির কাজে গিয়েছিলেন। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা পরিদর্শন বা তদারকিতে গেলে তারা সেখানে উপস্থিত থাকেন। চলতি বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে।
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স