গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:৩৩ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ০৮:৪৮ এএম

কারখানা নদীর ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, ঝুঁকিতে তিন স্কুল

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
কারখানা নদীর ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, ঝুঁকিতে তিন স্কুল

পটুয়াখালীর বাউফলে কারখানা নদীর ভাঙনে বিলীন হচ্ছে একের পর এক বসতবাড়ি, ফসলি জমি, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা। ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন কয়েকশ পরিবার। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন সড়কের পাশে, কেউবা অন্যের জমিতে ঘর তুলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি দাখিল মাদ্রাসা। 

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া না হলে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে কাছিপাড়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা।

উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে কারখানা নদীর তীরে অবস্থিত ১ নম্বর কাছিপাড়া ইউনিয়ন। আয়তন, জনসংখ্যা, শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ এই ইউনিয়নের বাহের চর, পশ্চিম কাছিপাড়া, হাজীপুর ও গোপালিয়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন চলছে। বিশেষ করে বাহের চর থেকে গোপালিয়াবাঘা পর্যন্ত নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একসময়কার সমৃদ্ধ সিকদার ও আকন বাড়িসহ বহু পরিবারের বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে।

পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বাহের চর এলাকায় চররঘুনাথদ্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে ১০৫ মিটার অংশে জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ৫৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। তবে গোপালিয়াবাঘা অংশে এখন পর্যন্ত কোনো কাজ বাস্তবায়ন করা হয়নি।

সিকদার বাড়ির বাসিন্দা নাসরিন বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ‘মাত্র দুই বছর আগেও সিকদার বাড়ি ছিল। এখন সেই বাড়ির কোনো অস্তিত্ব নেই। কারখানা নদী আমার শ্বশুরবাড়ি গিলে খেয়েছে। একসময় এই বাড়িতে শতাধিক মানুষের বসবাস ছিল। এখন বসতবাড়ি হারিয়ে সবাই অন্যত্র চলে গেছে।’

বাহের চর এলাকার বাসিন্দা নিত্য গোপাল (৭৮)। নদীভাঙনে বসতভিটাসহ সব জমি হারিয়ে এখন সড়কের পাশে টিনের ছাউনির ছোট একটি ঘরে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন। ছোট্ট চায়ের দোকান চালিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। 

নিত্য গোপাল বলেন, ‘বাবার ছয় একর জমি ছিল। নদীতে সব হারিয়েছি। এখন থাকার জায়গাটুকুও নেই। মারা গেলে শেষকৃত্য করার মতো শ্মশানের জমিও নেই। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীভাঙনে শুধু বসতবাড়ি নয়, বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, পুকুর, বাজার ও পাকা সড়কও। ভাঙনের মুখে রয়েছে বাহের চর বাজার। দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ বা নদীর তীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নির্মাণ না হলে গুরুত্বপূর্ণ এই বাজারটিও একসময় নদীতে চলে যেতে পারে।

ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে চররঘুনদ্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হিস্যাজাত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও গোপালিয়াবাঘা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষক জাকির সিকদার, এফ এম মামুন ও সুনীল দাস বলেন, নদীভাঙনের কারণে দিন দিন শিক্ষার্থী কমছে। কোনো কোনো বিদ্যালয়ের মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ মিটার দূরে নদী এসে পৌঁছেছে। দ্রুত তীর রক্ষার ব্যবস্থা না নিলে বিদ্যালয়গুলোও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হিস্যাজাত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী জালাল সিকদার (৫৪) বলেন, ‘এ বিদ্যালয় থেকেই আমি পড়াশোনা করেছি। ছোটবেলার স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠানটি আজ নদীতে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিদ্যালয়টি রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’

কাছিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ইয়াকুব বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ফেললেও ভাটার সময় সেগুলোর অনেকগুলো আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এভাবে নদীভাঙন ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিনিয়ত মানুষের বসতবাড়ি ও ফসলি জমি নদীতে বিলীন হচ্ছে। স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’

বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সালেহ বলেন, ‘নদীভাঙনের তীব্রতায় কাছিপাড়া ও কনকদিয়া ইউনিয়নের মানচিত্র ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। মাসিক উন্নয়ন সভায় কাছিপাড়া ও কনকদিয়ার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্যসহ জনপ্রতিনিধিরা ভাঙনের ভয়াবহতা তুলে ধরে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। সরেজমিনে পরিদর্শন করে পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে জরুরি তীর রক্ষার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য জানানো হবে।’

পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এমরান হোসেন বলেন, কারখানা নদীসহ পায়রা নদীর ভাঙনরোধে একটি সমীক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সমীক্ষা প্রতিবেদন পাওয়ার পর স্থায়ী তীর প্রতিরক্ষা কাজ বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাঠানো হবে।

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।