২০১৫ সালে উত্তর কোরিয়ার কূটনীতিক থায়ে ইয়াং হো লন্ডনে নেতা কিম জং–উনের ভাই কিম জং–চোলের এরিক ক্ল্যাপটনের কনসার্ট সফরের দেখাশোনার দায়িত্ব পান। শাসক পরিবারের সেবা করাকে বড় সম্মান মনে করে থায়ে তাঁর দুই ছেলেকে বিষয়টি জানালে তারা আনন্দিত না হয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে।
ছেলেরা থায়েকে মনে করিয়ে দেয়, যে পশ্চিমা গান শোনার অপরাধে সাধারণ উত্তর কোরীয়দের কঠোর শাস্তি পেতে হয়, সেই বিনোদনেই কিম পরিবার এক সন্ধ্যায় হাজার হাজার ডলার ওড়াচ্ছে। থায়ে পরে তাঁর স্মৃতিকথা ‘পাসওয়ার্ড টু দ্য থার্ড ফ্লোর’-এ লিখেছেন, সন্তানদের চোখের সেই দৃষ্টি তাঁকে অনুধাবন করিয়েছিল, তিনি আসলে একজন বন্দী, যাঁকে কারাগারের রক্ষীর সেবা করতে বাধ্য করা হচ্ছে। সন্তানদের প্রতিক্রিয়া তাঁকে গভীরভাবে লজ্জিত করেছিল।
পরের বছর থায়ে স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় পালিয়ে যান। তাঁর এই দলত্যাগ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে চমকে দিয়েছিল। কারণ, মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও থায়ে পূর্ণ আবেগ দিয়ে উত্তর কোরিয়ার শাসনব্যবস্থার পক্ষে সাফাই গাইছিলেন।
তবে উত্তর কোরিয়ার অভিজাত শ্রেণির ভেতরের জীবনকে যাঁরা বোঝেন, তাঁদের কাছে এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ খুবই পরিচিত—কর্মকর্তারা উত্তর কোরিয়ার রাজপরিবারের প্রতি শতভাগ আনুগত্য প্রদর্শন করতে পারেন ঠিক সেই দিন পর্যন্ত, যেদিন তাঁরা দেশ ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন।
জনসমক্ষে প্রদর্শিত আনুগত্য আর ভেতরের প্রকৃত বিশ্বাসের মধ্যকার এই পার্থক্য বাইরে থেকে বোঝা অসম্ভব বললেই চলে। পিয়ংইয়ংয়ের পার্টি, সেনাবাহিনী, দূতাবাস ও প্রযুক্তি খাতের উচ্চপদস্থ সাবেক কর্মকর্তাদের ওপর করা এক দশকের বেশি সময়ের সাক্ষাৎকার থেকে এ বাস্তবতা উঠে এসেছে।
তাঁদের কেউ একসময় এ ব্যবস্থায় বিশ্বাসী ছিলেন, আবার কেউ শুরুতেই অনুধাবন করেছিলেন, কিম জং–উনের প্রতি আনুগত্য মূলত এক আজীবন নাটক। সাক্ষাৎকার দেওয়া প্রায় সবাই নিশ্চিত করেছেন, উত্তর কোরিয়ার বর্তমান অভিজাত শ্রেণি অভূতপূর্ব মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে।
২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর কিম জং–উন প্রবীণ কর্মকর্তা ও সামরিক ব্যক্তিত্বদের ওপর ব্যাপক দমনপীড়ন, রদবদল ও মৃত্যুদণ্ড চালিয়ে অভিজাতদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছেন। ফলে সামান্য ভুলেই পরিবারসহ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আতঙ্কে দিন কাটান তাঁরা। কোভিড মহামারির পর সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের পালানোর পথও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংকীর্ণ।
কিম বিলাসবহুল জীবনযাত্রা ও পদোন্নতি দিয়ে কিছুটা ক্ষোভ কমালেও পরিবারের টিকে থাকার স্বার্থে আরোপিত কঠোর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা সম্ভব নয়। ফলে এ ব্যবস্থা যেকোনো সংগঠিত প্রতিরোধ দমনে সক্ষম হলেও অভিজাতদের ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
তবে যেসব উত্তর কোরীয় এখনো নানা উপায়ে পালাতে সক্ষম হচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে অভিজাতদের হার সবচেয়ে বেশি। ২০২৪ সালের আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস জানিয়েছে, কিম জং–উনের শাসনামলে উত্তর কোরিয়ার উচ্চবিত্ত শ্রেণি থেকে দলত্যাগের সংখ্যা কিম ইল সং (১৯৪৮-১৯৯৪) ও কিম জং ইলের (১৯৯৪-২০১১) সম্মিলিত শাসনামলের চেয়ে আড়াই গুণ বেশি।
এ প্রবণতাকে এখনই শাসকগোষ্ঠীর তাৎক্ষণিক পতনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা ভুল হবে। কারণ, ক্ষোভকে রাজনৈতিক প্রতিরোধে রূপ নিতে না দেওয়ায় উত্তর কোরিয়া অত্যন্ত পারদর্শী। রাষ্ট্র চায় না প্রত্যেক কর্মকর্তা মন থেকে শাসনব্যবস্থাকে বিশ্বাস করুন; তার মূল উদ্দেশ্য হলো সন্দেহবাদী ও হতাশ কর্মকর্তারা যেন নিজেদের সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ ও বিচ্ছিন্ন মনে করেন।
উত্তর কোরিয়াকে ‘হেরমিট কিংডম’ বলা হলেও এটি মোটেও বিচ্ছিন্ন কোনো রাষ্ট্র নয়। পারমাণবিক অস্ত্রধারী এই দেশের সঙ্গে বিশ্বের ১৬০টির বেশি দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এবং তাদের রয়েছে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম সক্রিয় সেনাবাহিনী ও অত্যন্ত দক্ষ সাইবার বাহিনী। সাধারণ জনগণ রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় আবদ্ধ থাকলেও উত্তর কোরিয়ার অভিজাত শ্রেণির বড় একটি অংশ বাইরের দুনিয়া সম্পর্কে বেশ সচেতন।
উচ্চপদস্থ উত্তর কোরীয়দের জন্য অনুগত থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। সুযোগ-সুবিধা ও ভীতি দিয়ে আনুগত্য বজায় রাখা গেলেও রাষ্ট্র অভিজাতদের কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা ও তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারছে না।
কিম বিলাসবহুল জীবনযাত্রা ও পদোন্নতি দিয়ে কিছুটা ক্ষোভ কমালেও পরিবারের টিকে থাকার স্বার্থে আরোপিত কঠোর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা সম্ভব নয়। ফলে এ ব্যবস্থা যেকোনো সংগঠিত প্রতিরোধ দমনে সক্ষম হলেও অভিজাতদের ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

সূর্যের খুব কাছাকাছি অবস্থান
দক্ষিণ কোরিয়ায় আশ্রয় নেওয়া ৩৪ হাজারের বেশি উত্তর কোরীয় দলত্যাগীর অধিকাংশই চীনের সীমান্তবর্তী দরিদ্র অঞ্চলের মানুষ, যাঁরা দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক কষ্ট থেকে বাঁচতে পালিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় বর্বরতা দেখলেও ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁদের ধারণা কম।
বিপরীতে অভিজাত দলত্যাগীদের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁরা কেবল ৩০ লাখ বাছাই করা মানুষের শহর পিয়ংইয়ংয়ের বাসিন্দা, যেখানে তাঁরা বিদ্যুৎ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পেয়ে বড় হয়েছেন এবং শাসনব্যবস্থার সেবায় বিশেষ বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষিত হয়েছেন।
উত্তর কোরিয়ায় যেকোনো স্বাধীন সংগঠন গড়ে তোলা অসম্ভব। কারণ, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও পরিবারে রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও প্রতিবেশীদের চরম নজরদারি বিদ্যমান। শৈশব থেকেই প্রতিটি নাগরিককে কোনো না কোনো রাষ্ট্রীয় সংগঠনের অধীন থাকতে হয়।
পার্টির শক্তিশালী সংস্থা ‘অর্গানাইজেশন অ্যান্ড গাইডেন্স ডিপার্টমেন্ট’ (ওজিডি) দেশজুড়ে নিয়োগ, পরিদর্শন ও শৃঙ্খলার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে, যেখান থেকে আজ পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তার দলত্যাগের খবর পাওয়া যায়নি। এমনকি বিদেশে নিযুক্ত কূটনীতিক ও কর্মীদের পাসপোর্ট জমা রাখতে হয় এবং দেশে ফেরার পর দীর্ঘ মতাদর্শগত পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
সাবেক জ্যেষ্ঠ পার্টি ক্যাডার কিম সে ইউন (ছদ্মনাম) জানান, বিদেশ থেকে পিয়ংইয়ংয়ে ফেরার পর কর্মকর্তাদের এক মাসব্যাপী কঠোর কেন্দ্রীয় পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। মদ খাওয়ার মতো ছোটখাটো বিষয়ও সেখানে রিপোর্ট করতে হতো, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বৈশ্বিক প্রভাব নির্মূল করা।
অভিজাত পদমর্যাদা সুযোগ-সুবিধা আনলেও নেতাদের ভুলের কারণে যেকোনো মুহূর্তে পরিবারসহ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। পিয়ংইয়ংয়ের প্রচলিত প্রবাদটিই তাঁদের জীবনের এই নির্মম সত্যকে ফুটিয়ে তোলে, ‘সূর্যের যত কাছাকাছি যাবেন, পুড়ে ছাই হওয়ার আশঙ্কা তত বেশি।’

ধুলোর একটি কণা
২০১৩ সালে জং সং থায়েকের পতন উত্তর কোরিয়ার অভিজাত শ্রেণিকে এ শিক্ষা সবচেয়ে নির্মমভাবে দিয়েছিল। তাঁর আকস্মিক গ্রেপ্তার ও নৃশংস মৃত্যুদণ্ড পিয়ংইয়ংজুড়ে এক দীর্ঘস্থায়ী ভয়ের জন্ম দেয়। প্রত্যেক অভিজাত ব্যক্তি তাঁর এই হত্যাকাণ্ডের অন্তর্নিহিত বার্তা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন।
জং এর আগে তিনবার ‘বিপ্লবীকরণ’-এর মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। এটি উত্তর কোরিয়ার একটি বিশেষ শাস্তি, যা সাধারণত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের শায়েস্তা করতে ব্যবহৃত হয়। এতে কর্মকর্তার পদবি কেড়ে নিয়ে গ্রামাঞ্চলে শারীরিক পরিশ্রম ও রাজনৈতিক পুনঃশিক্ষার জন্য পাঠানো হয়। জং তিনবারই ফিরে এসেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে নেতার সেবা করেছিলেন, তাঁর হাতেই প্রাণ দিতে হয়।
২০১১ সালের ডিসেম্বরে কিম জং–উন যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তাঁর বয়স ছিল ২০-এর কোঠায়। তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের আমলে দায়িত্ব পালন করা প্রবীণ ক্যাডার ও সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর ব্যাপক দমনপীড়ন চালিয়ে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
কিম কিছু অর্থনৈতিক পরিবর্তন মেনে নিয়েছেন; বাজারগুলো এখন রাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও করযুক্ত। অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট এবং স্থানীয় স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আইন মেনে চলা কর্মকর্তাও যেকোনো সময় ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বা স্বজনপ্রীতির বলি হয়ে ধ্বংস হয়ে যেতে পারেন।
উত্তর কোরিয়ায় শৈশব থেকেই ‘সংবুন’ বা বংশানুক্রমিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নাগরিকদের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়। এই শ্রেণিবিভাগ এবং রাজনৈতিক আচরণের ওপর নির্ভর করে শিক্ষা, চাকরি ও পদোন্নতি। প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়মিত আত্মসমালোচনা সেশনে অংশ নিতে হয়।
বাড়িতে কিমদের প্রতিকৃতি দেয়ালের সবচেয়ে উঁচু স্থানে একদম পরিষ্কার রাখতে হয়। একজন নারী আমাকে বলেছেন, শ্বেতশুভ্র গ্লাভস পরা পরিদর্শকেরা তাঁদের বাড়িতে নিয়মিত আসতেন ছবিতে ধুলো আছে কি না তা দেখতে।
জনসমক্ষে নিখুঁত আনুগত্য প্রদর্শনের এসব অনুষ্ঠান প্রায়ই ছিল একেকটি পরিকল্পিত অভিনয়।
আত্মসমালোচনা সেশনের আগে সহকর্মীরা নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে নিতেন কে কার সামান্য কী ভুল ধরবেন, যাতে নিয়ম রক্ষা হলেও কারও বড় ক্ষতি না হয়।
২০১১ সালে কিম জং ইলের মৃত্যুর পর জনসমক্ষে শোক প্রকাশের ক্ষেত্রেও এই অভিনয়ের রূপ দেখা যায়। এক অভিজাত নারী জানান, নেতার মৃত্যুতে তিনি স্বস্তি পেলেও বিপদের আশঙ্কায় নিজের ব্যক্তিগত বেদনাদায়ক স্মৃতি মনে করে কান্নার চেষ্টা করেন। আর চোখে জল না এলে মাথা নিচু ও কাঁধ ঝাঁকিয়ে কান্নার অভিনয় করতেন—যাঁর মতে, ভিড়ের অনেকেই তখন একই অভিনয় করছিলেন।
সমাজবিজ্ঞানীরা এ ব্যবস্থার নাম দিয়েছেন ‘প্রেফারেন্স ফলসিফিকেশন’ বা সত্য পছন্দের অপলাপ—বিপদের ভয়ে মানুষ নিজের আসল মতামত গোপন রেখে মিথ্যা আনুগত্য প্রদর্শন করে। পিয়ংইয়ংয়ে এটি প্রতিদিনের বেঁচে থাকার কৌশল।

অভিজাতরা যা চান
উত্তর কোরিয়ার সমাজের শীর্ষ অবস্থান কেউ সহজে ছাড়তে চান না, তাই কিম জং–উনও বিলাসবহুল আবাসন ও উপহার প্রদান করে অভিজাতদের পদমর্যাদা ও প্রভাব টিকিয়ে রেখেছেন। একজন আমলার ক্ষমতার সম্মান ও প্রভাব রাষ্ট্রীয় অসন্তোষ সত্ত্বেও তাঁদের দেশে আটকে রাখতে সাহায্য করে।
তরুণ ও মধ্যবয়সী অভিজাতরা আগের মতো ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি নন। অভিভাবকেরা আর চান না যে তাঁদের ছেলেরা সেনাবাহিনীতে ১০ বছর পার করুক বা কেবল পার্টিতে ক্যারিয়ার গড়ুক। তাঁরা চান ব্যবসা, প্রযুক্তি শিক্ষা, বিদেশে পড়াশোনা এবং ব্যক্তিগত সম্পদ তৈরি।
অর্থের আগমন উত্তর কোরিয়ার এই তথাকথিত ‘সমাজতান্ত্রিক স্বর্গে’ নতুন নিয়ম তৈরি করেছে। এক দলত্যাগকারী আমাকে রসিকতা করে বলেছিলেন, কিম জং–উনের পর উত্তর কোরিয়ার চতুর্থ শাসক হবে ‘টাকা’।
কিম কিছু অর্থনৈতিক পরিবর্তন মেনে নিয়েছেন; বাজারগুলো এখন রাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও করযুক্ত। অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট এবং স্থানীয় স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আইন মেনে চলা কর্মকর্তাও যেকোনো সময় ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বা স্বজনপ্রীতির বলি হয়ে ধ্বংস হয়ে যেতে পারেন।
একলা, কিন্তু একসঙ্গে
অভিজাতদের অসন্তোষ বাড়লেই যে অভ্যুত্থান ঘটবে, এমন নয়। অসন্তোষ নিরসনে তাঁদের সামনে পাঁচটি পথ খোলা থাকে—চুপ থাকা, পালানো, সমান্তরাল অর্থের নেটওয়ার্ক তৈরি করা, প্রতিবাদ করা বা সংস্কারের দাবি তোলা। শেষের তিনটি উত্তর কোরিয়ায় মারাত্মক বিপজ্জনক।
অধিকাংশ মানুষ থেকে যাওয়ার পথটিই বেছে নেন। পরিবারভিত্তিক যৌথ শাস্তির ভয়ে কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারেন না। প্রতিবেশী, সহকর্মী, এমনকি স্বজনদের ওপর নজর রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।
সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা লি চুল ইউন, যিনি ছয় কিলোমিটার সাঁতরে দক্ষিণ কোরিয়ায় পালিয়েছিলেন, উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তাব্যবস্থাকে এক জটিল ‘মাকড়সার জাল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোকে তিনি চরম উন্মাদনা বলে মনে করেন।
রাষ্ট্র টিকে থাকার জন্য চীনের সাথে বাণিজ্য, অস্ত্র বিক্রি, সাইবার অপরাধ এবং বিদেশে শ্রমিক পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে পারমাণবিক কর্মসূচি ও অভিজাতদের বিলাসিতা বজায় রাখছে। দুর্ভিক্ষ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা—সবকিছুর পরও রাষ্ট্র টিকে গেছে।
তবে সবচেয়ে বড় হুমকি কোনো সাধারণ গণ–অভ্যুত্থান থেকে নয়, বরং পিয়ংইয়ংয়ের ভেতরের অভিজাতদের থেকেই আসার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে তাঁরা একত্র হতে পারছেন না।

কিমের শেষ দিনগুলো
কিম জং–উন হয়তো নজরদারি, রদবদল, শাস্তি ও পুরস্কারের মাধ্যমে অভিজাতদের অসন্তোষ সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। কিন্তু এই স্বৈরতন্ত্রের মূল দূর করা সম্ভব নয়। অভিজাতদের মন থেকে ভয় দূর করতে হলে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড, পরিবারভিত্তিক যৌথ শাস্তি, রাজনৈতিক বন্দিশালা এবং তথ্য নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করতে হবে।
কিন্তু এই ছাড়গুলো দিলে অভিজাতদের ভয় কমবে এবং তাঁরা কিমের বিরুদ্ধে যেতে উৎসাহিত হবেন, যা কিম কখনোই হতে দেবেন না।
ফলে কিম নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করবেন, যা ভেতর থেকে শাসনব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করে তুলবে। অভিজাতদের সাক্ষাৎকার থেকে এটি স্পষ্ট নয় যে শাসনব্যবস্থা আগামীকালই ভেঙে পড়বে; বরং এটি কিম পরিবারের জন্য এক গভীর দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
জিউন বায়েক উত্তর কোরিয়া বিশেষজ্ঞ।
ফরেন অ্যাফেয়ার্স থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।
সূত্র: প্রথম আলো