গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:১৩ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:২৮ পিএম

ক্লাস্টার ওয়ারহেডের ক্ষেপণাস্ত্র কীভাবে এলো উত্তর কোরিয়ার অস্ত্রভান্ডারে

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
ক্লাস্টার ওয়ারহেডের ক্ষেপণাস্ত্র কীভাবে এলো উত্তর কোরিয়ার অস্ত্রভান্ডারে

বিস্তৃত এলাকায় একসঙ্গে আঘাত হানতে সক্ষম ক্লাস্টার বোমা নতুন কোনো অস্ত্র নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এর প্রাথমিক ধারণার বিকাশ ঘটে। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি এ ধরনের বোমা ব্যবহার করে। প্রায় আট দশক পরও নিষিদ্ধ হওয়া অস্ত্রটির ব্যবহার ও বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এবার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহারের উপযোগী ক্লাস্টার ওয়ারহেডের পরীক্ষা চালিয়ে আলোচনায় এসেছে উত্তর কোরিয়া।

গত ৩১ অক্টোবর কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে সংযুক্ত করার উপযোগী ক্লাস্টার ওয়ারহেডের পরীক্ষা চালায় পিয়ংইয়ং। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেসিএনএর বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ‘স্ট্যান্ডার্ড টাইপ-২’ ওয়ারহেডটি সর্বোচ্চ ঘনত্বে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ১২ থেকে ১৩ হেক্টর এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম বলে দাবি করেছে উত্তর কোরিয়া। দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র প্রশাসন জানিয়েছে, ওয়ারহেডগুলো চার ধরনের এবং ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সামরিক ইউনিটগুলোকে সেগুলো ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

এরপর ২ নভেম্বর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রে সংযুক্ত মাঝারি আকারের ক্লাস্টারযুক্ত ওয়ারহেডের পরীক্ষা চালায় দেশটি। ৩ নভেম্বর কেসিএনএর বরাতে রয়টার্স জানায়, এই ওয়ারহেড ৫ থেকে ৬ হেক্টর এলাকাজুড়ে আঘাত হানতে সক্ষম বলে দাবি করেছে উত্তর কোরিয়া। ক্ষেপণাস্ত্রটির শেষ পর্যায়ের গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা বাড়িয়ে লক্ষ্যবস্তুতে ওপর-নিচ বরাবর আঘাত হানার ব্যবস্থাও যাচাই করা হয়েছে।

ক্লাস্টার বোমা কীভাবে কাজ করে? 

ক্লাস্টার বোমার মূল বৈশিষ্ট্য হলো, একটি বড় বোমা বা ওয়ারহেডের ভেতরে অনেকগুলো ছোট বিস্ফোরক থাকে। এগুলোকে সাবমিউনিশন বা বোমলেট বলা হয়। বিমান থেকে নিক্ষেপ কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে বহন করা মূল অস্ত্রটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় গিয়ে খুলে যায়। এরপর ছোট বোমাগুলো বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং একসঙ্গে বা আলাদাভাবে বিস্ফোরিত হয়। ফলে একটি নির্দিষ্ট স্থাপনার পাশাপাশি আশপাশের সেনা, যানবাহন ও সামরিক সরঞ্জামও আঘাতের আওতায় আসে।

তবে এর বড় মানবিক ঝুঁকি হলো, সব ছোট বোমা সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হয় না। অবিস্ফোরিত বোমলেট পরে মাইন বা বিস্ফোরকের মতো বিপজ্জনক হয়ে থাকে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু বছর পরও এসব বিস্ফোরকে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও অঙ্গহানির ঘটনা ঘটতে পারে।

উদ্ভব কোথায়, প্রথম ব্যবহার কারা করে? 

আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির (আইসিআরসি) একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ প্রকৌশলীরা একটি বড় বোমার ভেতরে ছোট ছোট অগ্নিসংযোগকারী বিস্ফোরক রাখার ধারণা নিয়ে কাজ করেন। এই ধারণাই আধুনিক ক্লাস্টার বোমার ভিত্তি তৈরি করে। পরে জার্মানি এসডি-১ ও এসডি-২ ধরনের গুচ্ছবোমা তৈরি করে। ১৯৪০ সাল থেকে ব্রিটিশ ও সোভিয়েত লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে এগুলো ব্যবহার করা হয়। ১৯৪৩ সালের জুনে ইংল্যান্ডের গ্রিমসবি বন্দরে জার্মান বিমানবাহিনীর প্রায় এক হাজার বোমলেট নিক্ষেপ ছিল এর প্রথম বড় পরিসরের ব্যবহারগুলোর একটি।

পরবর্তী সময়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধসহ বিভিন্ন সংঘাতে ব্যাপকভাবে ক্লাস্টার অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। অস্ত্রটির বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও অবিস্ফোরিত বোমার দীর্ঘমেয়াদি বিপদ বিবেচনায় ২০০৮ সালে ক্লাস্টার মিউনিশনবিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশন গৃহীত হয়, যার মাধ্যমে এই বোমা ব্যবহার, উৎপাদন, মজুদ ও হস্তান্তর নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই বোমা মূলত বিমানে করে নিয়ে ফেলতে হয়।

ক্লাস্টার বোমা এখন ক্ষেপণাস্ত্রে

ক্লাস্টার বোমা  বিমানে করে ফেলার অসুবিধা এড়াতে গত কয়েক বছরে এটি ক্ষেপণাস্ত্রে যোগ করে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুলে ইরান। গত বছরের যুদ্ধে ইসরায়েলে ক্লাস্টার ওয়ারহেডবাহী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র খোররামশাহ-৪ নিক্ষেপ করে ইরান। ক্লাস্টার বোমাবাহী এই ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে আঘাত হেনে ক্ষয়ক্ষতি করে। ইসরায়েল এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে হামলায় ‘ক্লাস্টার বোমা’-র ব্যবহার সেবারই প্রথম করে ইরান। সামরিক সংঘাতের ইতিহাসেও এটি প্রথম ক্লাস্টার বোমাবাহী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা। যদিও ইরান সেই দাবিকে খারিজ করেছে।

উত্তর কোরিয়া কীভাবে পেল এই প্রযুক্তি? 

উত্তর কোরিয়ার ক্লাস্টার ওয়ারহেড তৈরির প্রযুক্তি কোন দেশ থেকে এসেছে, তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য তথ্য নেই। সাম্প্রতিক পরীক্ষাগুলোর বিবরণে দেশটির নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র প্রশাসন, ওয়ারহেড গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। তবে এগুলো থেকে প্রযুক্তিটির বিদেশি উৎস বা কোনো দেশের সরাসরি সহায়তার প্রমাণ মেলে না।

অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার সামগ্রিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিকাশে বিদেশি প্রযুক্তির ভূমিকা রয়েছে। সেন্টার ফর আর্মস কন্ট্রোল অ্যান্ড নন-প্রলিফারেশন এবং রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) গবেষণা অনুযায়ী, ষাট ও সত্তরের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ পায় পিয়ংইয়ং। পরে মিসরের মধ্যস্থতায় সোভিয়েত নকশার স্কাড-বি ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ করে সেটির প্রযুক্তি বিশ্লেষণ ও অনুকরণে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলে। ইরানের সঙ্গেও উত্তর কোরিয়ার গোপন সামরিক সম্পর্ক আছে বলে ধারণা করা হয়।

স্কাডসহ উত্তর কোরিয়ার পুরোনো ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে বিদেশি প্রযুক্তির প্রভাব থাকার অর্থ এই নয় যে, দেশটির বর্তমান ক্লাস্টার ওয়ারহেডও সরাসরি বিদেশ থেকে পাওয়া। এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

সূত্র : রয়টার্স, ইয়োনহাপ, আইসিআরসি, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, সিএফএসিএনপি

সূত্র: কালবেলা

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।