বনি ইসরাইলের এক সমাবেশে নবী মুসাকে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার চেয়ে বেশি জ্ঞানী কারও সম্পর্কে কি আপনি জানেন?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘না।’
আল্লাহ তখন তাঁর কাছে ওহি পাঠিয়ে জানালেন, তাঁর এক বান্দা খিজির আছেন, যাঁকে তিনি বিশেষ জ্ঞান দান করেছেন।
বিষয়টি জানার পর তিনি খিজিরের সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করলেন এবং তাঁর কাছে পৌঁছানোর উপায় জানতে চাইলেন। আল্লাহ তাঁকে একটি মাছকে সফরের নিদর্শন হিসেবে গ্রহণ করতে বললেন।
যেখানে মাছটি হারিয়ে যাবে, সেখানেই খিজিরের সন্ধান পাওয়া যাবে। এ উদ্দেশ্যে মুসা (আ.) তাঁর সঙ্গীকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪০০)
কোরআনে এ যাত্রার সংকল্পের কথা এভাবে এসেছে, ‘স্মরণ করো, যখন মুসা তাঁর সঙ্গীকে বলেছিলেন, দুই সাগরের মিলনস্থলে না পৌঁছানো পর্যন্ত আমি থামব না, প্রয়োজনে দীর্ঘকাল চলতে থাকব।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত: ৬০)
চলতে চলতে তাঁরা একটি পাথরের কাছে এসে বিশ্রাম নেন। মুসা (আ.) তখন ঘুমিয়েছিলেন। এ সময় মাছটি সাগরে চলে যায়। কিন্তু তাঁর সঙ্গী ঘটনাটি তাঁকে জানাতে ভুলে যান। পরে বিষয়টি মনে পড়লে তাঁরা আগের পথ ধরে ফিরে আসেন এবং খিজিরের সাক্ষাৎ লাভ করেন। (সুরা কাহাফ, আয়াত: ৬১–৬৫)
এখান থেকেই শুরু হয় ইতিহাসের একটি বিস্ময়কর শিক্ষামূলক সফর, যার প্রতিটি ঘটনা আল্লাহর অসীম হিকমতকে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে শেখায়।
১. নবী হয়েও শিক্ষার্থী হিসেবে বিনয় প্রকাশ
মুসা (আ.) অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে খিজিরের কাছে শেখার আবেদন করেন। তিনি বলেন, ‘আমি কি এ লক্ষ্যে আপনার অনুসরণ করতে পারি, যাতে আপনাকে যে সঠিক জ্ঞান শেখানো হয়েছে, তা থেকে আমাকে কিছু শেখাবেন?’ (সুরা কাহাফ, আয়াত: ৬৬)
এখানে লক্ষণীয়, মুসা (আ.) ছিলেন আল্লাহর সম্মানিত রাসুল। তবু বিশেষ একটি বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের জন্য তিনি আরেকজন আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের অধিকারী বান্দার কাছে শিক্ষার্থী হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন। এতে জ্ঞানের মর্যাদা এবং তা অর্জনে বিনয়ের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
খিজির তাঁকে সতর্ক করে বলেন, যেসব বিষয় সম্পর্কে তাঁর পূর্ণ জ্ঞান নেই, সেগুলো দেখে তিনি ধৈর্য ধরে থাকতে পারবেন না। মুসা (আ.) আশ্বাস দেন, আল্লাহ চাইলে তাঁকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং তিনি খিজিরের নির্দেশ অমান্য করবেন না।
খিজির বললেন, তাহলে যতক্ষণ আমি আপনাকে কোনো বিষয় খোলাসা না করি, ততক্ষণ আমার কোনো কাজে আপত্তি কিংবা প্রশ্ন করতে পারবেন না। (সুরা কাহাফ, আয়াত: ৬৭–৭০)
২. নৌকায় ছিদ্র: বাহ্যিক ক্ষতির আড়ালে কল্যাণ
সফরের প্রথম পরীক্ষাটি আসে সমুদ্রপথে। মুসা (আ.) ও খিজির একটি নৌকায় উঠলেন। কিন্তু খিজির নৌকাটি ছিদ্র করে দিলেন। এতে মুসা (আ.) বিস্মিত হয়ে আপত্তি জানান। তাঁর প্রশ্ন ছিল, ‘আপনি কি নৌকার আরোহীদের ডুবিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এতে ছিদ্র করলেন? এটি তো গুরুতর অন্যায়।’
খিজির তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেন, তিনি আগেই বলেছিলেন, যে বিষয়ের অন্তর্নিহিত রহস্য মুসা (আ.) জানেন না, তা দেখে তিনি ধৈর্য ধরে থাকতে পারবেন না। (সুরা কাহাফ, আয়াত: ৭১–৭২)
সফর শেষে খিজির এ কাজের কারণ ব্যাখ্যা করেন। নৌকাটি ছিল কয়েকজন দরিদ্র মানুষের, যারা সমুদ্রে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সামনে এমন এক রাজা ছিল, যে ভালো নৌকা জোরপূর্বক দখল করে নিত। নৌকাটিতে ত্রুটি সৃষ্টি করায় সেটি ওই রাজার দখল থেকে রক্ষা পায়। (সুরা কাহাফ, আয়াত: ৭৯)
খিজির একটি বালককে হত্যা করেন। মুসা (আ.) এ দৃশ্য দেখে কঠোর আপত্তি জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, কোনো প্রাণহানির অপরাধ ছাড়াই একজন নিষ্পাপ মানুষকে হত্যা করা অত্যন্ত গুরুতর কাজ।
বোঝা যায়, দৃশ্যমান ক্ষতিই সব সময় চূড়ান্ত ক্ষতি নয়। কোনো কোনো ছোট বিপদ বড় বিপদ থেকে রক্ষার কারণও হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষ নিজের অনুমানে কোনো ক্ষতিকে কল্যাণকর ঘোষণা করবে।
খিজির এ কাজ করেছিলেন আল্লাহর বিশেষ নির্দেশনায়। সাধারণ মানুষের জন্য অন্যের সম্পদ নষ্ট করা কোনোভাবেই বৈধ নয়।
৩. বালক হত্যা: মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা
এরপর ঘটে আরও গুরুতর ঘটনা। খিজির একটি বালককে হত্যা করেন। মুসা (আ.) এ দৃশ্য দেখে কঠোর আপত্তি জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, কোনো প্রাণহানির অপরাধ ছাড়াই একজন নিষ্পাপ মানুষকে হত্যা করা অত্যন্ত গুরুতর কাজ। (সুরা কাহাফ, আয়াত: ৭৪)
খিজির এবারও মুসাকে তাঁদের পূর্বশর্তের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, বালকটির পিতা-মাতা ছিলেন মুমিন।
আল্লাহ জানতেন, বালকটি বড় হলে তাদের অবাধ্যতা ও কুফরির দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই আল্লাহ চেয়েছিলেন, তার পরিবর্তে আরও পবিত্র ও স্নেহপরায়ণ সন্তান দান করবেন। (সুরা কাহাফ, আয়াত: ৮০–৮১)
আমাদের শিক্ষা: মানুষ শুধু বর্তমান দেখে সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু আল্লাহ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবকিছুই জানেন। তাই মানুষের জ্ঞান সীমিত, আর আল্লাহর জ্ঞান পূর্ণাঙ্গ।
তবে এ ঘটনাকে সঠিকভাবে বোঝা জরুরি। খিজির নিজেই শেষে বলেছেন, তিনি নিজের ইচ্ছায় এসব কাজ করেননি। (সুরা কাহাফ, আয়াত: ৮২)
অতএব এটি আল্লাহর বিশেষ নির্দেশনাসংশ্লিষ্ট ব্যতিক্রমী ঘটনা। কোনো ব্যক্তির অনুমান, স্বপ্ন বা অন্তর্দৃষ্টির ভিত্তিতে কাউকে হত্যা কিংবা অন্যায় করার বৈধতা এ থেকে প্রমাণিত হয় না। ইসলামে মানুষের জীবন ও অধিকার রক্ষার বিধান স্বতন্ত্রভাবে সুস্পষ্ট।
৪. বিনা পারিশ্রমিকে দেয়াল মেরামত
সফরের শেষ ঘটনাটি ছিল একটি জনপদে। মুসা (আ.) ও খিজির সেখানে পৌঁছে বাসিন্দাদের কাছে খাবার চেয়েছিলেন। কিন্তু তারা তাঁদের আতিথেয়তা করতে অস্বীকৃতি জানায়। ওই জনপদেই তাঁরা একটি ধসে পড়ার উপক্রম দেয়াল দেখতে পান।
খিজির সেটি মেরামত করে সোজা করে দেন। মুসা (আ.) বললেন, চাইলে এর বিনিময়ে জনপদের লোকদের থেকে পারিশ্রমিক নেওয়া যেত। (সুরা কাহাফ, আয়াত: ৭৭)
খিজির পরে জানালেন, দেয়ালটির নিচে ছিল দুই এতিম বালকের গুপ্তধন। তাদের পিতা ছিলেন সৎকর্মশীল। আল্লাহ চেয়েছিলেন, বালক দুটি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে নিজেদের সম্পদ উদ্ধার করুক। তাই দেয়ালটি রক্ষা করা হয়েছিল। (সুরা কাহাফ, আয়াত: ৮২)
জনপদের মানুষ তাঁদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করলেও খিজির প্রতিশোধপরায়ণ হননি। বরং আল্লাহর নির্দেশনায় এমন একটি কাজ করেছেন, যার সুফল ছিল দুই অসহায় এতিমের জন্য।
বোঝা যায়, এতিমের সম্পদ সংরক্ষণে ইসলামের গুরুত্ব এ ঘটনায় ফুটে ওঠে। একই সঙ্গে বোঝা যায়, কোনো কাজের উপযুক্ত প্রতিদান পাওয়া না গেলেও তা কল্যাণকর হতে পারে।
জনপদের মানুষ তাঁদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করলেও খিজির প্রতিশোধপরায়ণ হননি। বরং আল্লাহর নির্দেশনায় এমন একটি কাজ করেছেন, যার সুফল ছিল দুই অসহায় এতিমের জন্য।
এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, আল্লাহ ওই দুই বালকের পিতার নেক আমলের কথা উল্লেখ করেছেন। এটি সৎকর্মের মর্যাদা ও পারিবারিক কল্যাণের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
এই দুই নবীর যৌথ সফরের তিনটি ঘটনা বাহ্যিকভাবে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবে একটা বিষয় ছিল অভিন্ন। তা হলো মানুষ যা দেখে, বাস্তবতা সব সময় তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
জীবনের প্রতিটি ঘটনার তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা আমাদের জানা সম্ভব নয়। কিন্তু আল্লাহর বিধানের প্রতি আস্থা রেখে ন্যায় ও কল্যাণের পথে অবিচল থাকা প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব।
নাহিদা সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক
nahidasultana753375@gmail.com
সূত্র: প্রথম আলো