রিদওয়ানুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক। তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করেছেন। প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন সংবিধান পরিবর্তন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও সংবিধানের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক মনজুরুল ইসলাম
চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে একটি বহুল আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল সংবিধান। তখন কেউ কেউ সংবিধান বাতিল বা নতুন করে সেটা লেখার কথাও বলেছিলেন। সেই চিন্তাটা কি উচ্চাভিলাষী ছিল?
রিদওয়ানুল হক: হ্যাঁ, বাস্তবতার দিক থেকে অল্প সময়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের একটি সংবিধানকে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়ার চিন্তা উচ্চাভিলাষী ছিল। সংবিধান সংস্কার কমিশনের কেউ কেউ ব্যাপক পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন। কিন্তু ১৯৭২ সালে প্রণীত একটি সংবিধান এত বছর পরে এসে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া সহজ নয়; তার প্রয়োজনও নেই।
তবে সংস্কার অবশ্যই হতে পারত। ন্যূনতম কিছু বিষয়ে আমরা এমন একটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারতাম, যেখানে বড় ধরনের বিরোধ থাকত না। সমস্যা হচ্ছে, সংবিধান সংস্কার কমিশন এবং সে সময়ের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার নিয়ামক ব্যক্তিদের চিন্তায় একটি বড় দুর্বলতা ছিল। তাঁরা সম্ভবত মনে করেছিলেন, কোনোভাবে রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি লিখিত সনদে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করতে পারলে নির্বাচনের পরে সংবিধানও সেভাবেই পরিবর্তিত হবে।
রাজনীতি এভাবে চলে না। রাজনীতি প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা ও বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়। তখন আমরা সতর্ক করেছিলাম—ক্ষমতা থাকলেই সবকিছু করা উচিত নয়। আবার চাইলেই সবকিছু বাস্তবায়ন করা যায় না। সবচেয়ে ভালো পথ ছিল রাজনৈতিক ঐকমত্য ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতির ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারের দিকে এগোনো।
বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন নিয়ে বিশেষ কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছে। বিরোধী দলকে বাইরে রেখে সংবিধানে বড় কোনো পরিবর্তন আনলে সেগুলো কতটা গ্রহণযোগ্য ও স্থায়ী হবে?
রিদওয়ানুল হক: বিরোধী দলকে বাইরে রেখে সংবিধান সংশোধন করা হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনুসরণের কারণে সেটি আইনগতভাবে বৈধ হতে পারে। কিন্তু আইনগত বৈধতা ও ন্যায্যতা এক বিষয় নয়। কোনো সিদ্ধান্ত আইন মেনে নেওয়া হয়েছে বলেই সেটি ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সংবিধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এই পার্থক্যটি মনে রাখতে হবে।
অন্যদিকে বিরোধী দল কমিটিতে থাকবে না বললেই তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। গণতন্ত্র, দেশ ও সংবিধানের প্রতি তাদের দায় আছে। জনগণ তাদের যত আসনেই নির্বাচিত করুক, তারা সংসদীয় রাজনীতির অংশ। বিরোধী দল দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন না করলে গণতন্ত্র এগোতে পারে না। সরকার ও বিরোধী দল—সবাইকে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কিছু না কিছু ছাড় দিতে হবে।
হতাশার বিষয় যে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমরা যে পরিবর্তন চেয়েছিলাম, তা এখনো দেখতে পাচ্ছি না। ভবিষ্যতে পরিবর্তন আসবে না, এমন নিরাশাবাদী হতে চাই না। কিন্তু আপাতত বড় পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়
সংসদে বিএনপির দুই–তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এ রকম অবস্থায় দলটি ইচ্ছে করলে একতরফাভাবে তাদের মতো করে সংবিধান সংশোধন করতে পারে।
রিদওয়ানুল হক: নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আমাদের গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি। রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের অভাবসহ নানা সমস্যা আছে। তারপরও সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে এবং সরকারি দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে সমঝোতা করে চলার প্রয়োজন তৈরি হয়। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিপদ বোঝাতে কিছু বড় উদাহরণ দেওয়া যায়। ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় গণতন্ত্র থেকে আমরা একদলীয় কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় চলে যাই। গণতন্ত্রের সেই বড় বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল প্রথম সংসদে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর নিজেদের স্বার্থে সংবিধান সংশোধনের প্রবণতা আমরা বিএনপির ক্ষেত্রেও দেখেছি। চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়ানো হয়। এর পেছনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সম্ভাব্য প্রধান হিসেবে একজন নির্দিষ্ট সাবেক প্রধান বিচারপতিকে বিবেচনায় রাখার প্রশ্ন ছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠতার অপব্যবহারের প্রবণতা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজ উদ্যোগে সরে আসতে হবে। সংসদে বিপুলসংখ্যক আসন পাওয়াকে যা ইচ্ছা করার অনুমতি হিসেবে নেওয়া যাবে না। সবাইকে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে।
এর আগে প্রথম আলোকে দেওয়া আরেকটি সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন, রাষ্ট্রের গণতন্ত্রায়ণের জন্য সাংবিধানিক বা আইনি পরিবর্তনের চেয়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন বেশি প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সেই পরিবর্তন কতটা দেখছেন?
রিদওয়ানুল হক: এটি হতাশার বিষয় যে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমরা যে পরিবর্তন চেয়েছিলাম, তা এখনো দেখতে পাচ্ছি না। ভবিষ্যতে পরিবর্তন আসবে না, এমন নিরাশাবাদী হতে চাই না। কিন্তু আপাতত বড় পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে বিরোধী মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা ও অশ্রদ্ধা দেখা যায়। সরকারি দল অনেকটা নিজেদের চাওয়া অনুযায়ী আইনগুলো করেছে। সাম্প্রতিক মানবাধিকার কমিশন ও গুমসংক্রান্ত আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ার দিকে তাকালে এ সমস্যা দেখা যায়। সংসদের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক দল এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে যে বিস্তৃত পরামর্শ প্রয়োজন ছিল, তা হয়নি। একপর্যায়ে বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউটও করেছে।
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নিজেদের পছন্দমতো আইন পাস করার পুরোনো সংস্কৃতিই এখনো দেখা যাচ্ছে। সাইবার সুরক্ষাসংক্রান্ত আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা চোখে পড়ে। আইন প্রণয়নের বাইরেও কিছু ঘটনা উদ্বেগজনক। জামায়াতের একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ ওঠার পর দলটি তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিলের জন্য নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য নিজে পদত্যাগ করেননি। এই জায়গায়ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্ন রয়েছে।
কিছু ভালো পরিবর্তন অবশ্যই হয়েছে। আমরা সরকারের সমালোচনা করলেই পরদিন গ্রেপ্তার হচ্ছি না। এটি নিশ্চয়ই ইতিবাচক। কিন্তু যথেষ্ট নয়। সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও সৌহার্দ্যের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। পরিবর্তন শুরু হওয়া দরকার রাজনৈতিক দলের ভেতর থেকে। দলের গঠনতন্ত্র, সভা, আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক চর্চা বাড়াতে হবে। অনেক দলে নারীরা এখনো পিছিয়ে আছেন। দলের ভেতরে মতপ্রকাশ ও আলোচনার সুযোগও সীমিত।
সংবিধান ও আইনের কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে রাজনীতি বা রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর।
ভবিষ্যতে কোনো সরকার যাতে আবার স্বৈরাচারী হতে না পারে, এটা নিশ্চিত করতে সংবিধানে কোন কোন পরিবর্তনগুলো সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন?
রিদওয়ানুল হক: এমন কোনো সাংবিধানিক পরিবর্তনের পরামর্শ আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়, যা স্বৈরাচার ফিরে না আসার নিশ্চয়তা দিতে পারে। সংবিধানের কোনো বিশেষ বিধানে জাদু নেই। ভালো সংবিধান বা সংশোধনী যে গণতন্ত্র অক্ষুণ্ন রাখবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান গণতান্ত্রিক সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এসব দেশের বিচার বিভাগ থেকে বহু গুরুত্বপূর্ণ রায়ও এসেছে। কিন্তু সেখানেও গণতন্ত্রের পশ্চাদ্যাত্রা দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃত্ববাদের দিকে যাচ্ছে বলে অনেকে মনে করছেন। অর্থাৎ ভালো সংবিধান থাকলেও গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
গণতন্ত্র টিকবে কি না, তা মূলত নির্ভর করে রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক চর্চার ওপর। সাংবিধানিক রাজনীতিতে সদাচরণ থাকলে স্বৈরাচারের পুনরুত্থান প্রতিহত করার সম্ভাবনা বাড়ে। তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো সংশোধনের প্রয়োজন নেই। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সংবিধানেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হয়। আমি মনে করি না যে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের জন্য এর প্রয়োজন দেখি না। সংসদীয় গণতন্ত্র বজায় রেখে রাষ্ট্রপতিকে অনেক বেশি শক্তিশালী করারও পক্ষপাতী আমি নই।
তবে আমি কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে সংশোধনের কথা বলব। প্রথমত, একজন ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী থাকার মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই দফায় সীমিত করা যেতে পারে। টানা হোক কিংবা বিরতি দিয়ে হোক, দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকাই ভালো। অনেক দেশের সংবিধানে এ ধরনের সীমা আছে। জুলাই সনদেও এ বিষয়ে বড় ধরনের ঐকমত্য দেখা গেছে। বিএনপিও প্রস্তাবটি মেনে নিয়েছে। তবে এখানেও রাজনৈতিক সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ। মেয়াদের সীমা নির্ধারণের পর কেউ যদি স্ত্রী, ভাই, ছেলে বা মেয়েকে সামনে এনে নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন, তাহলে বিধানটির উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। মেয়াদসীমা কিছুটা ইতিবাচক ফল দিতে পারে, কিন্তু স্বৈরাচার ঠেকানোর নিশ্চয়তা দেবে না।
দ্বিতীয়ত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় এবং বিচারপতি নিয়োগের বিষয়ে আইন করা হয়েছিল। নতুন সংসদে সেগুলো বাতিল করা হয়েছে। বাতিল না করে আলোচনা ও সংশোধনের পথ নেওয়া যেত। এ সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রের জন্য ভালো বার্তা দেয় না। মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের ব্যবস্থার আলোকে পরিবর্তন বিবেচনা করা যেতে পারে। নিম্ন আদালতের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে আইন মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্টের কর্তৃত্বের যে দ্বৈততা নিয়ে আলোচনা হয়, সেটিও নিরসন করা প্রয়োজন। বিচারপতি নিয়োগের যোগ্যতা ও মানদণ্ড আরও বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সংবিধানে কিছু স্থায়ী কমিটির উল্লেখ রয়েছে; সংসদকে অন্য কমিটি গঠনের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। সেখানেই বিরোধী দলের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা আরও স্পষ্ট করা যেতে পারে।
চতুর্থত, সংবিধানের ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদের যৌক্তিক সংশোধন প্রয়োজন, যাতে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে মতামত দিতে পারেন। রাজনৈতিক দলগুলো হয়তো অনুচ্ছেদটি সম্পূর্ণ তুলে দিতে চাইবে না। কিন্তু সেটি সম্ভব না হলেও এর পরিধি ও প্রয়োগ স্পষ্ট করা দরকার।
সূত্র: প্রথম আলো