রাবণের চরিত্রে যশের দাপট এবং রাম হয়ে রণবীরের অভিনয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া—এভাবেই নীতেশ তিওয়ারি পরিচালিত ‘রামায়ণ: পার্ট ১’ সিনেমাটির মূল্যায়ন করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস। সিনেমাটিকে ৫-এর মধ্যে ৪ তারকা দিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। একই সঙ্গে দুর্দান্ত ভিএফএক্স, সাই পল্লবীর অভিনয় ও জটায়ুর দৃশ্য দর্শকের মন জয় করেছে বলে জানানো হয়েছে।
ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের কাছে রামায়ণের গল্প নতুন নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই মহাকাব্যের কাহিনি শুনে আসছেন মানুষ। ৩৯ বছর আগে রামানন্দ সাগরের টেলিভিশন সিরিজ ‘রামায়ণ’ ভারতজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। রোববার সিরিজটি প্রচারের সময় রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা হয়ে যেত বলে সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করেছেন অনেকে। এমন একটি জনপ্রিয় কাহিনি নতুন করে পর্দায় তুলে ধরা নির্মাতাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
হিন্দুস্তান টাইমসের রিভিউতে বলা হয়েছে, নির্মাতা নমিত মালহোত্রার ‘রামায়ণ: পার্ট ১’ সেই চ্যালেঞ্জ বেশ ভালোভাবেই সামলেছে। পরিচিত মহাকাব্যের গল্প নতুনভাবে উপস্থাপন করেও মূল আবেগ ও কাহিনির প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন নির্মাতারা।
বাল্মীকি রামায়ণের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত সিনেমাটির শুরু হয়েছে রাবণের অতীত দিয়ে। এরপর ধীরে ধীরে সামনে আসে তার প্রতিপক্ষ রামের গল্প। শ্রীধর রাঘবন ও নীতেশ তিওয়ারির চিত্রনাট্যে আবেগ ও নাটকীয়তার বেশ কিছু মুহূর্ত রয়েছে। তবে প্রথমার্ধের গতি কিছুটা ধীর। প্রায় সব চরিত্রের পরিচয় ও অতীত তুলে ধরতে গিয়ে গল্পের শুরুটা দীর্ঘ হয়ে গেছে। এ ছাড়া এআই ডাবিংয়েও কিছু ছোটখাটো সমস্যা চোখে পড়েছে।
তবে দ্বিতীয়ার্ধে সিনেমার গতি বাড়ে। বিশেষ করে অ্যাকশন দৃশ্যগুলো দর্শককে মুগ্ধ করার মতো। ভিএফএক্সের কাজেও রয়েছে বড় চমক। ডিএনইজির করা ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের মান প্রশংসা পেয়েছে রিভিউতে। সিনেমাটির কথিত ৪ হাজার কোটি রুপি বাজেটের বড় অংশই এই প্রযুক্তিগত কাজে ব্যয় হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছে। পর্দায় সেই বিনিয়োগের ছাপও স্পষ্ট।
সিনেমাটিতে রাবণের কুবেরের লঙ্কা দখল, শিবের প্রতি তার ভক্তি এবং কৈকেয়ীর নিজের ভুল বুঝতে পারার মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পরিচিত কাহিনির মূল কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন না এনে নির্মাতারা দর্শকের স্মৃতিতে থাকা রামায়ণের আবহ ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন।
তবে সংগীতের ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। হলিউডের জনপ্রিয় সংগীত পরিচালক হ্যান্স জিমার ও ভারতের এ আর রহমান যৌথভাবে সিনেমাটির সংগীত ও আবহসংগীত তৈরি করেছেন। কিছু দৃশ্যে তাদের কাজ ভালো লাগলেও বহুল আলোচিত এই জুটির কাছ থেকে আরও বেশি কিছু প্রত্যাশা ছিল। কয়েকটি গান অপ্রয়োজনীয় বলেও মনে হয়েছে রিভিউকারীর।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রশংসা পেয়েছেন যশ। রাবণের চরিত্রে তার উপস্থিতি, চলাফেরা ও অভিব্যক্তি চরিত্রটির সঙ্গে মানিয়ে গেছে। বিশেষ করে রাবণের দশটি মুখের উপস্থাপনা প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আগের সিনেমা ‘টক্সিক’-এর পর এই ছবিতে যশ নিজের অভিনয়দক্ষতা নতুন করে তুলে ধরেছেন বলেও মন্তব্য করা হয়েছে।
অন্যদিকে রামের চরিত্রে রণবীর কাপুরের অভিনয় নিয়ে মূল্যায়ন কিছুটা মিশ্র। অ্যাকশন দৃশ্যে সাবলীল হলেও চরিত্রটির মধ্যে প্রত্যাশিত ভক্তি ও আধ্যাত্মিক আবহ পুরোপুরি ফুটিয়ে তুলতে পারেননি তিনি। তবে রাজা দশরথের চরিত্রে অরুণ গোভিলের অভিনয় প্রশংসা পেয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৮৭ সালের রামানন্দ সাগরের ‘রামায়ণ’ টেলিভিশন সিরিজে রামের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অরুণ গোভিল।
কৈকেয়ীর চরিত্রে লারা দত্তের অভিনয়ও প্রশংসিত হয়েছে। মন্থরার ভূমিকায় শিবা চাড্ডাকে যথাযথ মনে হয়েছে। পর্দায় অল্প সময় উপস্থিত থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃশ্যে নিজের ছাপ রেখেছেন তিনি।
সীতার চরিত্রে সাই পল্লবীর অভিনয় নিয়েও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন রিভিউকার। পর্দায় তার উপস্থিতি, সংযত অভিব্যক্তি ও চরিত্রের সঙ্গে মানানসই অভিনয় দেখে এই চরিত্রে তার নির্বাচন নিয়ে আর কোনো সংশয় থাকে না বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
লক্ষ্মণের চরিত্রে রবি দুবেও প্রশংসা পেয়েছেন। চরিত্রটির আনুগত্য ও আবেগপ্রবণ স্বভাব দুটিই ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।
তবে সিনেমাটির অন্যতম সেরা আকর্ষণ জটায়ুর দৃশ্য। সীতাকে রাবণের হাত থেকে রক্ষা করতে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে জটায়ু। বিশেষ করে সিনেমার শেষভাগে অনুপম খেরের কণ্ঠে জটায়ুর উপস্থিতি দর্শকের মনে দাগ কাটবে বলে মনে করছেন রিভিউকার।
সব মিলিয়ে রিভিউতে বলা হয়েছে, রাবণের দশটি মাথা থাকলেও নির্মাতাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল কোটি কোটি মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা। প্রথম পর্বে সেই চ্যালেঞ্জ অনেকটাই সামলেছেন তারা। মহাকাব্যের আবেগ অক্ষুণ্ন রেখে চোখধাঁধানো ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা সিনেমাটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
তবে বড় লড়াই এখনো বাকি। দ্বিতীয় পর্বে হনুমানের চরিত্রে সানি দেওয়েলের আগমন, সঞ্জীবনী বুটি নিয়ে আলোচিত দৃশ্য এবং রাম-রাবণের যুদ্ধ দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন দর্শক। পরবর্তী পর্বে গল্পের উত্তেজনা আরও বাড়বে বলেই প্রত্যাশা।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স