এমন কিছু একটা ঘটতে পারে, ধারণা করেছিলেন অনেকেই। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বরাবরই একটু অভিমানী, আত্মমর্যাদাটা সবসময়ই বেশি। কোচের সঙ্গে এর আগেও মনোমালিন্য হয়েছে, কিন্তু ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেনি আগে। রোনালদো সেটাই করেছিলেন, তাও দেশের হয়ে খেলায়। যে দেশের জন্য জীবন বাজি রাখতেও পিছপা হননি রোনালদো, তিনিই গল্পের ইতি টানলেন হাতে লেখা এক বার্তা পড়ে।
পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসকে ঠিক দুইভাগে ভাগ করা যায়। রোনালদোর অভিষেকের আগে আর অভিষেকের পরে। শুনতে ঠিক যতটা বিশাল কিছু মনে হচ্ছে, বাস্তবে আসলেও তাই। রোনালদোর আগমনের আগেও পর্তুগাল ছিল, তবে সেটা ইতিহাসের পাতায় আর গুটি কয়েক রাজ্যহীন রাজা হয়ে। ‘কালো চিতা’ ইউসেবিও এসেছিলেন, একক নৈপুণ্যে বিশ্বকাপে তৃতীয় হওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি। সেই অর্জন ক্ষয়ে গিয়েছে ষাটের দশকেই। মানুষ নস্টালজিয়ায় তাঁকে মনে করে, কিন্তু বছরের পর বছর টেনে নেওয়ার মতো তারকা হয়ে উঠতে পারেননি কেউ। রোনালদো পেরেছিলেন। ফিগো-রুই কস্তারা যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, সেটায় পূর্ণতা দিয়েছেন রোনালদো। ক্যারিয়ারের প্রথম ট্রফিটা আসতে পারত প্রথম খেলা ইউরোতেই। ২০০৪ ইউরোতে হাতছোঁয়া দূরত্বে ফসকে গিয়েছিল শিরোপা। সেদিনের সেই ১৯ বছর বয়সী রোনালদোর কান্না মনে গেঁথে গিয়েছিল সবার। রোনালদো হয়তো প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, পর্তুগালকে এমন দলে পরিণত করবেন যেন যে কেউ মাঠে নামার আগে সমীহ করে।

পর্তুগালের আশা-ভরসা রোনালদো
যত দিন পার হয়েছে, পর্তুগাল ডানা মেলেছে। রোনালদো যতটা না পর্তুগালের হয়ে উঠতে পেরেছিলেন, তার চেয়ে বেশি পর্তুগাল হয়ে উঠেছিল রোনালদোর। আশা-ভরসা সবকিছু যেন রোনালদোর ওপর। কেনই বা হবে না? রোনালদো ক্লাবে রাজত্ব করে বেড়াচ্ছেন, পুরো বছরের সব পুরস্কার জিতে নিচ্ছেন একা হাতে, সেই খেলোয়াড় দলকে শিরোপা জেতাতে পারবেন না? রোনালদোও পেরেছেন, টানা ব্যর্থতার পর ২০১৬ সালে এসে রোনালদোর ভাগ্যের শিকেও খুলেছে। ২০১৬ ইউরো দিয়ে শুরু, অতঃপর দুটো নেশনস লিগ। রোনালদো আসার আগে পর্তুগাল বিশ্বকাপে সুযোগও পেত না, রোনালদো আসার পর পর্তুগাল খেলেছে টানা ৬ বিশ্বকাপ। পর্তুগালকে সমীহ করা দলের তালিকায় জায়গা পাওয়ার গল্পটা শুরু হয়েছে রোনালদোর আগমনের পরই।
মাদেইরা দ্বীপ থেকে শুরু
রোনালদোর জন্ম পর্তুগালের মূল ভূখণ্ডে নয়। বরং সেখান থেকে প্রায় হাজার কিলোমিটার দূরে মাদেইরা নামক একটা দ্বীপে। ১৪২০ সালের দিকে পর্তুগাল থেকে বিশ্বভ্রমণে বের হওয়া নাবিকরা জাহাজ ভেঙে পৌঁছে গিয়েছিলেন মাদেইরায়। সেদিন থেকে ৭৪১ বর্গকিলোমিটারের জায়গাটা পর্তুগালের। দ্বীপটা খুঁজে পেতে একটু এদিক সেদিক হলেই রোনালদো হয়তো হয়ে যেতেন অন্য কোনো দেশের, অন্য কোনো গল্পের নায়ক।

কিন্তু রোনালদো আজীবন পর্তুগালেরই হতে চেয়েছেন। স্বপ্নে ভাসাতে চেয়েছেন। রাশিয়ার মাটিতে স্পেনের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক নাকি সুইডেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করা হ্যাটট্রিক, ২৩৪ ম্যাচে এমন বহু ইতিহাস লিখেছেন নিজ হাতে। অসম্ভবকে যেমন সম্ভব করেছেন, তেমনই হতাশায়ও ভাসিয়েছেন সমর্থকদের। রোনালদো যেন হেরে-জিতে মিলেমিশে হয়েছেন পর্তুগালের সর্বেসর্বা।
ছোট কিন্তু আবেগঘন বিদায়
৫ মিনিটের নাতিদীর্ঘ এক বিদায়ী বার্তা। ভিডিওতে ছিল ফুটে উঠেছে ক্যারিয়ারের নানা চিত্র। হাতে লেখা চিঠি পড়তে পড়তে গলা ধরে এসেছে, নিজেকে সামলেছেনও। ২৩ বছর ধরে টানা পর্তুগালের জার্সি গায়ে রাজত্ব করে গিয়েছেন। পর্তুগালের বাকি খেলোয়াড়দের ভয় না পেলেও ৭ নম্বর জার্সিটাকে আলাদাভাবে সমীহ করতো দলগুলো। সেই রোনালদোই ব্রাত্য হয়ে পড়েছেন পর্তুগালের কাছে। ৪১ বছর বয়সে এসে তাই বয়সের কাছে হার মানতে হলো তাঁকে।

অথচ আর যাই হোক না কেন, রোনালদোর ক্যারিয়ারের ইতি টানার কথা এভাবে ছিল না। আতশবাজি ফুটিয়ে, সতীর্থদের কাঁধে উঠে লেখার কথা ছিল তাঁর বিদায়ের বার্তা। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। রোনালদো ইতি টানলেন পর্তুগাল থেকে বহুদূরে, সৌদি আরবে নিজের বাসার সোফায় বসে। চোখের জল সামাল দিয়ে রোনালদো বিদায় নিলেন বটে, কিন্তু আফসোস থেকেই গেল মাঠ থেকে বিদায় না নিতে পারার।
আগে যেমন বলেছিলাম, পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাস লেখা হয় দুই ভাগে। রোনালদোর আগে আর রোনালদোর সময়। আজ থেকে সেখানে আরেকটা অধ্যায়ও যুক্ত হবে, রোনালদো পরবর্তী সময়টা। শেষবেলায় এসে আফসোস নিয়ে দল ছেড়েছেন, সতীর্থদের সাহায্যও খুব একটা পেয়েছেন বলতে পারবেন না। তবুও শেষবেলা পর্যন্ত দিয়ে গিয়েছেন নিজের সর্বোচ্চটা।
মাদেইরার রাস্তায় ঝাড়ু দেওয়া সেই ছেলেটাই তিন তিনটি শিরোপা এনে দিয়েছেন পর্তুগালকে। হাজারও অর্জনের মধ্যেও তাই রোনালদো বোধহয় মনে রাখবেন পর্তুগালকে শিরোপা এনে দেওয়ার রাতটা। ট্রফি জাদুঘরে জায়গা পায়, রেকর্ডও একদিন ভেঙে যায় কিন্তু রোনালদো যে স্মৃতি রেখে গিয়েছেন বিশ্বের জন্য, তাই হয়তো অজান্তে এনে দিবে মুখে এক চিলতে হাসি।
সূত্র: প্রথম আলো