গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৫ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:২২ পিএম

নতুন অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে রান্না, ভাতেই কেজিতে ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম সিসা!

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
নতুন অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে রান্না, ভাতেই কেজিতে ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম সিসা!

নতুন অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিলে রান্না করা খাবারেও মিশছে বিষাক্ত সিসা। গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন পাত্রে প্রথমবার রান্না করা প্রতি কেজি সাদা ভাতে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে ৪২০ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া গেছে। শিশু ও ছোট শিশুদের খাবারে সিসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) নির্ধারিত রেফারেন্স মাত্রা প্রতি কেজিতে ১০ মাইক্রোগ্রাম। সে হিসাবে নতুন অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে রান্না করা ভাত ও খিচুড়িতে সিসার উপস্থিতি ওই মাত্রার যথাক্রমে ৩০ দশমিক ৫ ও ৪২ গুণ পর্যন্ত। শুধু নতুন পাত্রই নয়, পুরোনো অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল থেকেও খাবারে সিসা মিশতে পারে। বিশেষ করে নতুন পাত্রে প্রথম কয়েকবার রান্নার সময় সিসা নির্গমনের পরিমাণ বেশি থাকে। বারবার ব্যবহারে তা কমলেও নিরাপদ মাত্রায় নেমে আসে না। রান্নার পাত্র পরিষ্কারে স্টিলের তারের মাজুনি ব্যবহার এবং ধাতব খুন্তি দিয়ে খাবার নাড়াচাড়া করলেও সিসা খাবারে মিশে যাওয়ার পরিমাণ বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের আশঙ্কা, রান্নার পাত্রের মাধ্যমে শিশুদের শরীরে নিয়মিত সিসা প্রবেশ করলে তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার ক্ষমতা ও আচরণে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত রান্নার পাত্রের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ন্যাচার গ্রুপের সাময়িকী জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজি-তে। এতে বাংলাদেশের পরিবার থেকে সংগ্রহ করা সাতটি ব্যবহৃত এবং বাজার থেকে কেনা ২০টি নতুন অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র পরীক্ষা করা হয়। প্রথমে পাত্রগুলোর ধাতুতে সিসার উপস্থিতি ও পরিমাণ নির্ণয় করেন গবেষকেরা। পরে এসব পাত্রে সাদা ভাত ও খিচুড়ি রান্না করে খাবার ও পানিতে সিসার মাত্রা পরীক্ষাগারে পরিমাপ করা হয়। নতুন পাত্রেই বেশি সিসা গবেষণার ফল বলছে, নতুন অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে প্রথমবার রান্নার সময় খাবারে সিসা মিশে যাওয়ার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। প্রথম কয়েকবার ব্যবহারের পর এই নির্গমন কমে আসে। তবে পুরোনো পাত্রেও সিসা খাবারে মিশতে পারে। অর্থাৎ পাত্রটি নতুন না পুরোনো, শুধু সেই বিবেচনায় এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। বাংলাদেশে পুরোনো হাঁড়ি-পাতিলের পরিবর্তে নতুন পাত্র কেনা কিংবা পুরোনো কাপড়ের বিনিময়ে নতুন পাত্র নেওয়ার প্রচলন রয়েছে। চকচকে নতুন পাত্র দেখলে অনেকেই সেটিকে নিরাপদ মনে করেন। কিন্তু গবেষকেরা বলছেন, নতুন দেখালেই পাত্রটি সিসামুক্ত, এমন নিশ্চয়তা নেই। এর কারণ হিসেবে স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে পুরোনো স্ক্র্যাপ ধাতু ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এসেছে। এসব ধাতু গলিয়ে নতুন পাত্র তৈরি করা হয়। ব্যবহৃত ধাতুতে সিসা থাকলে তা নতুন পাত্রেও থেকে যেতে পারে। যথাযথ পরীক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এসব পাত্র বাজারজাত করা হলে ভোক্তারা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। মাজুনি ও খুন্তিতেও বাড়ে ঝুঁকি রান্নার পাত্রের উপাদানের পাশাপাশি পরিষ্কার ও রান্নার পদ্ধতিও খাবারে সিসা মিশে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র স্টিলের তারের মাজুনি দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করলে না ঘষে ব্যবহারের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি সিসা খাবারে মিশেছে। একইভাবে ধাতব খুন্তি দিয়ে খাবার নাড়াচাড়া করলেও সিসা নির্গমনের পরিমাণ বেড়েছে। অর্থাৎ পাত্রের ভেতরের অংশে ঘষা লাগা এবং রান্নার সময় ধাতব সরঞ্জামের ব্যবহার সিসা খাবারে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। গবেষকদের পরামর্শ, অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র পরিষ্কারে স্টিলের তারের মাজুনি ব্যবহার না করা এবং ধাতব খুন্তি দিয়ে অতিরিক্ত ঘষাঘষি এড়িয়ে চলা উচিত। তবে এসব সতর্কতা দূষিত পাত্রকে পুরোপুরি নিরাপদ করতে পারে না। শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ নিয়ে উদ্বেগ সিসার বিষক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশুরা। তাদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র বিকাশের পর্যায়ে থাকায় অল্প বয়সে সিসার সংস্পর্শও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে। এতে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা, শেখার ক্ষমতা, মনোযোগ ও আচরণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান অ্যান্ড প্ল্যানেটারি হেলথের প্রজেক্ট আনলেডেডের পরিচালক ড. জেনা ফরসিথ বলেন, গবেষণায় রান্নার পাত্র এবং সেই পাত্রে রান্না করা খাবার, দুটিতেই সিসার পরিমাণ পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষকেরা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের শিশুদের ভাত খাওয়ার পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে একটি হিসাবও করেছেন। এতে দেখা গেছে, এ ধরনের পাত্রে রান্না করা ভাত খেলে একটি শিশু খাবারের মাধ্যমে দৈনিক সিসা গ্রহণের ক্ষেত্রে এফডিএর নির্ধারিত রেফারেন্স মাত্রার পাঁচ গুণেরও বেশি সিসা গ্রহণ করতে পারে। তবে এই হিসাব শিশুদের রক্ত বা শরীরের নমুনা পরীক্ষা করে পাওয়া নয়। শিশুদের খাবার গ্রহণের পরিমাণ এবং পরীক্ষায় পাওয়া সিসার মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে একটি মডেলের মাধ্যমে সম্ভাব্য গ্রহণের পরিমাণ অনুমান করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা নেই, যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায়। সিসার সংস্পর্শ শিশুদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ও শেখার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পরীক্ষিত পাত্র ব্যবহারের পরামর্শ আইসিডিডিআরবির এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ওয়াশ বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট ড. জেসমিন সুলতানা বলেন, পরিবারগুলো প্রতিদিন যত্ন নিয়ে ভাত ও খিচুড়ি রান্না করে। অথচ সেই খাবারেই রান্নার পাত্র থেকে সিসা মিশছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগের কারণ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের খাবার তৈরিতে খাদ্যনিরাপত্তার দিক থেকে পরীক্ষিত রান্নার পাত্র ব্যবহার করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। তার পরামর্শ, অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র পরিষ্কারে স্টিলের তারের মাজুনি দিয়ে ঘষা এবং টক বা অম্লীয় খাবার রান্না করা এড়িয়ে চলা ভালো। তবে এসব সতর্কতা দূষিত পাত্রকে পুরোপুরি নিরাপদ করতে পারে না। গবেষকদের মতে, রান্নার পাত্র থেকে সিসা খাবারে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু ভোক্তাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশে সিসার সংস্পর্শে আসার একাধিক উৎস রয়েছে। হলুদে সিসা মেশানোর ঘটনাও এর মধ্যে অন্যতম। এর পাশাপাশি রান্নার পাত্রের মাধ্যমে সিসা শরীরে প্রবেশের বিষয়টিও জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার আলোচনায় গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। আইসিডিডিআর,বির এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ওয়াশ বিভাগের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, রান্নার পাত্র থেকে খাবারে সিসা মিশে যাওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট নিরাপত্তা মান নির্ধারণ করা জরুরি। এ জন্য বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রতি প্রয়োজনীয় মান নির্ধারণ এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) প্রতি রান্নার পাত্রে সিসার নিরাপত্তা মান তৈরি ও কার্যকর করার আহ্বান জানান তিনি। ছোট পরিসরের গবেষণা, আরও পরীক্ষা প্রয়োজন গবেষকেরা জানিয়েছেন, এটি পরীক্ষাগারে পরিচালিত ছোট পরিসরের গবেষণা। এতে বাংলাদেশের পরিবার থেকে সংগ্রহ করা সাতটি ব্যবহৃত ও বাজার থেকে কেনা ২০টি নতুন পাত্র পরীক্ষা করা হয়েছে। ফলে দেশের বাজারে থাকা সব ধরনের অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র সম্পর্কে এই ফলাফলকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে শিশুদের সিসা গ্রহণের যে পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে, তা সরাসরি শিশুদের শরীরে পরীক্ষা করে পাওয়া নয়। খাবারের পরিমাণ ও পরীক্ষাগারে পাওয়া সিসার মাত্রার ভিত্তিতে মডেল ব্যবহার করে তা অনুমান করা হয়েছে। তবে গবেষণার ফল রান্নার পাত্রের নিরাপত্তা যাচাই, উৎপাদনে ব্যবহৃত ধাতুর মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারজাতের আগে সিসা পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। গবেষকদের মতে, বিভিন্ন ধরনের রান্নার পাত্র, উৎপাদনপ্রক্রিয়া ও দৈনন্দিন রান্নার অভ্যাস নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সিসামুক্ত রান্নার পাত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিমালা ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।