গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৯:৫৯ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:০০ এএম

বিশ্বজুড়ে মানুষ কেন বাংকার বানাচ্ছে

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
বিশ্বজুড়ে মানুষ কেন বাংকার বানাচ্ছে

ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিতে আছে বিশেষ এক বাংকার। যেখানে মাটির প্রায় ২৫ মিটার নিচে আছে বিশাল এক আশ্রয়কেন্দ্র। স্বাভাবিক সময়ে এটি খেলার মাঠ, জিম, এমনকি শিশুদের খেলার জায়গা হিসেবে ব্যবহার হয়। কিন্তু জরুরি পরিস্থিতিতে মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জায়গাটিকে বাংকারে রূপান্তর করা সম্ভব।

ফিনল্যান্ডের এই আশ্রয়কেন্দ্র দেখতে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে যাচ্ছেন অনেকে। শহরের মেয়র, সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা এটি দেখতে যাচ্ছেন। ২০২৬ সালের মে মাসে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হেলসিঙ্কির মেরিহাকা নামের আশ্রয়কেন্দ্রটি দেখতে প্রায় ৮০০টি বিদেশি প্রতিনিধিদল গিয়েছেন। ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরের মেয়ররাও গিয়েছেন। তাঁরা জানতে চান, কীভাবে এমন আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা যায়, যেখানে একদিকে মানুষ স্বাভাবিক সময়ে নানা কাজ করতে পারবে, অন্যদিকে যুদ্ধ বা বিপর্যয়ের সময় নিরাপদে থাকতে পারবে।

যুদ্ধের ভয় থেকে বাংকারের আগ্রহ

বিশ্বজুড়ে বাংকার তৈরির আগ্রহ বাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ যুদ্ধ। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু করার পর ইউরোপের অনেক দেশে বাসার নিচে ব্যক্তিগত বাংকার তৈরির বিষয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। এরপর ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যেও সংঘাত বেড়েছে। রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে উত্তেজনা এবং পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা নিয়েও আলোচনা বেড়েছে। ফলে নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে বিভিন্ন দেশের সরকার ও সাধারণ মানুষ।

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ইউরোনিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে স্পেনে ব্যক্তিগত বাংকার নির্মাণের হার ২০০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে এ খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। শুধু স্পেন নয়, জার্মানি, ফ্রান্স ও বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলোতেও আশ্রয়কেন্দ্র নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। অনেক পরিবার নিজেদের বাড়িতেই নিরাপদ আশ্রয়ের জায়গা তৈরি করছে। কেউ কেউ আবার শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মজুত রাখছে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে কয়েক দিন বাইরে না গিয়েও চলতে পারে।

ইতিহাসে যুদ্ধ ছাড়া কি কোনো যুগ ছিল

তবে যুদ্ধই একমাত্র কারণ নয়। বিদ্যুৎব্যবস্থা অচল হয়ে যাওয়া, সাইবার হামলা, মহামারি কিংবা সামাজিক অস্থিরতার মতো পরিস্থিতি নিয়েও মানুষের উদ্বেগ রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও নাগরিকদের জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছে। ২০২৫ সালে ইউরোপীয় কমিশন অন্তত ৭২ ঘণ্টা চলার মতো খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মজুত রাখার পরামর্শ দেয়। ইউরোপের কয়েকটি দেশ নাগরিকদের জন্য জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় জানিয়ে নির্দেশিকাও প্রকাশ করেছে।

ফিনল্যান্ডের বাংকারে যা আছে

বাংকার তৈরিতে ফিনল্যান্ডের অভিজ্ঞতা বেশ পুরোনো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রতিবেশী সোভিয়েত ইউনিয়নের আক্রমণের আশঙ্কা দেশটিকে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র তৈরিতে গুরুত্ব দিতে শিখিয়েছে। দেশটিতে নির্দিষ্ট আয়তনের চেয়ে বড় আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের নিচে আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা বাধ্যতামূলক। ১ হাজার ২০০ বর্গমিটারের বেশি আয়তনের ভবনের ক্ষেত্রেও এ নিয়ম প্রযোজ্য।

হেলসিঙ্কির মেরিহাকা আশ্রয়কেন্দ্রটি তৈরি হয়েছিল ২০০৩ সালে। এর আয়তন প্রায় ৭১ হাজার ঘনমিটার, যা সাততলা একটি অফিস ভবনের আয়তনের কাছাকাছি। একসঙ্গে এখানে ছয় হাজার মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে। স্বাভাবিক সময়ে এখানে খেলাধুলার মাঠ, জিম ও শিশুদের খেলার জায়গা ব্যবহার করা হয়। জরুরি অবস্থা দেখা দিলে এখানে খাট, পানির ট্যাংক ও বহনযোগ্য শৌচাগার বসিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

হেলসিঙ্কিতে এমন বড় আশ্রয়কেন্দ্র আছে ৪৮টি, আর ছোট আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার ৫০০। পুরো ফিনল্যান্ডে এ ধরনের আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার ৫০০টি। এগুলো শুধু বোমা হামলা থেকে বাঁচার জন্য নয়; জরুরি পরিস্থিতিতে বহু মানুষকে একসঙ্গে নিরাপদে রাখার ব্যবস্থাও।

ফিনল্যান্ডের আরেকটি ভূগর্ভস্থ সুইমিংপুলের কথাও বলা যায়। শক্ত পাথর কেটে তৈরি করা এই সুইমিংপুল স্বাভাবিক সময়ে সাঁতার কাটার কাজে লাগে। কিন্তু জরুরি অবস্থায় এর পানি সরিয়ে জায়গাটিকে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। অর্থাৎ একই স্থাপনা স্বাভাবিক সময়ে মানুষের বিনোদনের জায়গা, আবার বিপদের সময় নিরাপদ আশ্রয়।

১ ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে ইলন মাস্ক যা যা করতে পারবেন

অন্য দেশগুলোও প্রস্তুতি নিচ্ছে

ফিনল্যান্ডের মতো অন্য দেশগুলোও আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। ইউক্রেন ও পোল্যান্ড নতুন কিছু ভবনে আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি বাধ্যতামূলক করেছে। পোল্যান্ড ২০২৫ ও ২০২৬ সালে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার আশ্রয়কেন্দ্রগুলো সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের জন্য ৫৮০ কোটি জ্লোটি (১ জ্লোটি সমান ৩১.৪৫ বাংলাদেশি টাকা) বরাদ্দ দিয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের পর সেখানে নতুন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কাজ অনেকটাই থেমে ছিল। এখন আবার নতুন করে শুরু হচ্ছে।

জার্মানিতেও আশ্রয়কেন্দ্রের সংকট রয়েছে। দেশটিতে আগে প্রায় দুই হাজার বাংকার থাকলেও ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী চালু অবস্থায় ছিল মাত্র ৫৭৯টি। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৪ লাখ ৭৮ হাজার মানুষ জায়গা পেতে পারে। অথচ দেশটির জনসংখ্যার তুলনায় এই ব্যবস্থা খুবই সীমিত। তাই সেখানে সুড়ঙ্গ, ভূগর্ভস্থ রেলস্টেশন, গাড়ি রাখার জায়গা ও সরকারি ভবনের বেজমেন্টকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

সুইজারল্যান্ডে অবশ্য আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত। ১৯৬০-এর দশক থেকে দেশটিতে প্রত্যেক বাসিন্দার জন্য বাড়ির কাছাকাছি একটি সুরক্ষিত আশ্রয়ের ব্যবস্থা রাখার নিয়ম রয়েছে। কোনো এলাকায় পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র না থাকলে নতুন আবাসিক ভবন নির্মাণের সময় আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করতে হয়, অথবা এর পরিবর্তে নির্দিষ্ট অর্থ দিতে হয়। ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন মিলিয়ে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে প্রায় ৯০ লাখ মানুষের আশ্রয়ের ব্যবস্থা আছে।

ধনকুবেররা কিনছেন দ্বীপ, বানাচ্ছেন বাংকার, কিসের আশঙ্কা

বাংকার তৈরির নতুন ব্যবসা

মানুষের এই আগ্রহকে ঘিরে গড়ে উঠছে নতুন ব্যবসাও। ফিনল্যান্ডের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাংকার তৈরির প্রযুক্তি অন্য দেশে রপ্তানি করছে। বাংকারের দরজা, বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা, জরুরি বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে তাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সৌদি আরবের তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোসহ বিভিন্ন দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এসব প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে আগ্রহ দেখিয়েছে।

স্পেনেও ব্যক্তিগত বাংকার নির্মাণের ব্যবসা বাড়ছে। ইউরোনিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটিতে একটি সাধারণ ব্যক্তিগত বাংকার তৈরিতে খরচ হতে পারে প্রায় দেড় লাখ ইউরো। বিলাসবহুল বাংকারের দাম সাড়ে তিন লাখ ইউরো ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফলে এমন বাংকার তৈরি করা অনেক পরিবারের পক্ষেই সম্ভব নয়। স্পেনে প্রায় ৪০০টি ব্যক্তিগত বাংকার আছে বলে ধারণা করা হয়। দেশটিতে সরকারি পারমাণবিক আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যাও খুব কম। প্রতিবেদনে চারটি সরকারি পারমাণবিক আশ্রয়কেন্দ্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

একটি কার্যকর বাংকার তৈরির ক্ষেত্রে শুধু মাটির নিচে ঘর বানালেই চলে না। ইউরোনিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংকারটি অন্তত ১০ মিটার গভীরে হওয়া, দেয়াল মজবুত হওয়া, বাতাস ও পানি পরিশোধনের ব্যবস্থা এবং আঘাত সহ্য করতে পারে এমন দরজা থাকা প্রয়োজন। পারমাণবিক বিকিরণ থেকে সুরক্ষার জন্য বিশেষ উপকরণও ব্যবহার করতে হয়। একটি বাংকারে পানীয় জল, খাবার, বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা এবং দীর্ঘ সময় থাকার মতো প্রয়োজনীয় সুবিধা থাকতে পারে। স্পেনের একটি বাংকার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের তৈরি আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে এক হাজার লিটার পানীয় জল এবং একাধিক বিকল্প বিদ্যুৎব্যবস্থা। নির্মাতাদের ভাষায়, এটি এমন একটি নিরাপদ অ্যাপার্টমেন্ট, যেখানে কয়েক মাস পর্যন্ত থাকা সম্ভব।

গরম পানিতেও কেন গলছে না এই আইসক্রিম

শুধু বাংকার নয়, দরকার প্রস্তুতিও

বাংকার বানানোর সামর্থ্য সবার নেই। তাই অনেকেই নিজেদের বাড়ির ভেতরেই নিরাপদ জায়গা তৈরি করছেন। সেখানে শুকনো খাবার, পানি, ওষুধ ও জরুরি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখছেন। স্পেনের একজন সামরিক কর্মকর্তা ও বেঁচে থাকার কৌশলবিষয়ক প্রশিক্ষক মানোলো কামারা মনে করেন, জরুরি পরিস্থিতিতে শুধু জিনিসপত্র মজুত রাখলেই হবে না, সেগুলো কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সেটাও জানা জরুরি। তাঁর প্রশিক্ষণে মানুষকে আগুন জ্বালানো, পানি খুঁজে বের করা, আশ্রয় তৈরি করা এবং মানচিত্র দেখে পথ চলার মতো বিষয় শেখানো হয়।

মানোলো কামারা আরও বলেন, পরিবারের সবার জন্য একটি পরিকল্পনা থাকা দরকার। বিপদের সময় কে কোথায় যাবে, পরিবারের সদস্যরা আলাদা হয়ে গেলে কোথায় মিলিত হবে, কোন পথে নিরাপদে সরে যাওয়া যাবে—এসব আগে থেকেই ঠিক করে রাখা উচিত। কারণ, যুদ্ধ বা বড় কোনো সংকটের সময় খাবার, পানি ও চিকিৎসাসেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। স্পেনের আরেকটি সারভাইভাল প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ইগনাসিও ওর্তেগার মতে, ভবিষ্যতে মানুষের বড় ধরনের বিপদে পড়ার আশঙ্কা শুধু বনজঙ্গলে নয়, বরং শহরেই বেশি। বিদ্যুৎ ও প্রয়োজনীয় সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে শহরের জীবনও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

তাহলে কি বিশ্বজুড়ে বাংকার তৈরির এই প্রবণতা মানেই পারমাণবিক যুদ্ধ আসন্ন? বিষয়টি তেমন নয়। বাংকার তৈরি বা জরুরি জিনিসপত্র মজুত রাখার অর্থ যুদ্ধ হবেই এমন ভবিষ্যদ্বাণী করা নয়। বরং নানা ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কায় মানুষ ও সরকার আগেভাগে প্রস্তুতি নিতে চাইছে।

সূত্র: রয়টার্স ও ইউরো নিউজ
বিশ্বের তৃতীয় দীর্ঘতম নদী ইয়াংজিতে কেন মাছ ধরা নিষিদ্ধ

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।