গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:১১ এএম

সহপাঠীরা যখন পরীক্ষা দিচ্ছিলেন, তখন পুকুরে ভাসছিল আদনানের লাশ

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
সহপাঠীরা যখন পরীক্ষা দিচ্ছিলেন, তখন পুকুরে ভাসছিল আদনানের লাশ

সহপাঠীরা যখন তৃতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিলেন, তখন পুকুরে ভাসছিল আদনান আলতাফের (২৬) নিথর দেহ। ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের এই শিক্ষার্থী কুমিল্লার বেসরকারি ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করছিলেন। ‘মানসিক অসুস্থতার’ কারণে দীর্ঘদিন ধরে পড়াশোনায় পিছিয়ে ছিলেন তিনি। পরিবারের সদস্যরা তাঁর চিকিৎসাও করিয়েছিলেন। ছেলের পরীক্ষার সময় পাশে থাকতে ভারত থেকে কুমিল্লায় এসেছিলেন তাঁর মা নিঘাত বেগম। কিন্তু পরীক্ষা আর দেওয়া হলো না আদনানের।

নিখোঁজের দুই দিন পর গত বুধবার সকালে কলেজের কাছের একটি পুকুর থেকে আদনানের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় বুড়িচং থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ পরিদর্শনে আসেন চট্টগ্রামে কর্মরত ভারতীয় হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি (কনস্যুলার ও শিক্ষা) মৃন্ময় কুমার সিং (এম কে সিং)। তিনি আদনানের মা ও কলেজে অধ্যয়নরত অন্য ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। পাশাপাশি কলেজের শিক্ষক ও পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে আদনানের ছাত্রাবাস, খাবার খেতে যাওয়া হোটেল এবং যে পুকুর থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, সেসব স্থানও পরিদর্শন করেন।

পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়েছিলেন আদনান

আদনান আলতাফ ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছিলেন। ১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থীর সহপাঠীরা ইতিমধ্যে অনেকেই ইন্টার্ন চিকিৎসক হয়েছেন। কেউ কেউ ইন্টার্নশিপ শেষ করেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকায় আদনানের স্নাতক শেষ করা হয়নি।

কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথম পেশাগত পরীক্ষায় একবারেই উত্তীর্ণ হয়েছিলেন আদনান। দ্বিতীয় পেশাগত পরীক্ষায় তিনবারের চেষ্টায় পাস করেন। তবে তৃতীয় পেশাগত পরীক্ষায় ২০২৫ সালের মে মাসে অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হতে পারেননি। একই বছরের নভেম্বরের পরীক্ষাতেও অকৃতকার্য হন।

কুমিল্লায় ভারতীয় মেডিকেল শিক্ষার্থী নিখোঁজের দুই দিন পর পুকুর থেকে লাশ উদ্ধার

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময় অনলাইনে ক্লাস করলেও পরীক্ষায় অংশ নেননি আদনান। এভাবেও পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়েন। পরে মানসিক অসুস্থতা ও অন্য কারণে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে ভারতে নিয়ে চিকিৎসা করান। এরপরও পড়াশোনায় নিয়মিত হতে পারেননি তিনি।

ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ জাকিরুল ইসলামের ভাষ্য, মেডিকেলের পড়াশোনার চাপ সামলাতে পারছিলেন না আদনান। এ কারণে তিনি হতাশাগ্রস্ত ছিলেন।

কুমিল্লার ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের ভারতীয় শিক্ষার্থী আদনান আলতাফের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর মা নিঘাত বেগমকে সান্ত্বনা দেন চট্টগ্রামে কর্মরত ভারতীয় হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি (কনস্যুলার ও শিক্ষা) মৃন্ময় কুমার সিং। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে কলেজ ক্যাম্পাসে

ছেলের পাশে থাকতে বাংলাদেশে এসেছিলেন মা

আদনানের মানসিক অবস্থার কারণে তাঁর মা নিঘাত বেগম কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে শান্তি-সুনীতি ছাত্রীনিবাসের একটি কক্ষে থাকতেন। আদনান থাকতেন ছেলেদের ছাত্রাবাসে। ছেলের অসুস্থতার কারণে মা তাঁকে সব সময় নজরে রাখতেন।

এর আগে আদনানের বাবা আলতাফ হোসাইন রাথারও ছেলের দেখাশোনার জন্য কুমিল্লায় ছিলেন। কলেজসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, একসময় তিনি কয়েক মাস কুমিল্লায় অবস্থান করেছিলেন।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার রাতে আদনান কলেজসংলগ্ন বিসমিল্লাহ হোটেলে খাবার খেতে যান। এ সময় মুঠোফোনটি হোটেলে ফেলে আসেন তিনি। পরে মায়ের কাছে গিয়ে মুঠোফোনের কথা জানান। মা তাঁকে সেটি নিয়ে আসতে বলেন। এরপর হোটেলের উদ্দেশে বের হয়ে আর ফেরেননি আদনান।

আদনান মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন দাবি করে তাঁর মা নিঘাত বেগম বলেন, ‘সে পরীক্ষা দিতে চাইত না। আমি পরীক্ষার সময় তাঁর পাশে থাকতে এসেছি। ছেলেকে চোখে চোখে রেখেছিলাম। এখন আমি বাড়ি গিয়ে আদনানের বাবাকে কী জবাব দেব?’

নিঘাত বেগম, আদনান আলতাফসে পরীক্ষা দিতে চাইত না। আমি পরীক্ষার সময় তাঁর পাশে থাকতে এসেছি। ছেলেকে চোখে চোখে রেখেছিলাম। এখন আমি বাড়ি গিয়ে আদনানের বাবাকে কী জবাব দেব?’

‘এই মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়’

ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজে ইন্টার্ন চিকিৎসকসহ অন্তত ২৭০ জন ভারতীয় শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন জম্মু ও কাশ্মীর, মেঘালয়, মহারাষ্ট্র, কেরালা, আসাম, মণিপুর, পশ্চিমবঙ্গ ও গুজরাটের শিক্ষার্থীরা।

গতকাল বিকেলে এসব শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেন ভারতীয় হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি মৃন্ময় কুমার সিং। তাঁদের নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজ নেন। মৃন্ময় কুমার সিং সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি মূলত এসেছি ভারতের অন্য শিক্ষার্থীদের মনোবল বাড়াতে। তাঁদের পাশে ভারত সরকার আছে—এটা জানাতে। ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা দেখতে। এখানে এসে দেখলাম এই প্রতিষ্ঠান ভারতীয় শিক্ষার্থীদের বিষয়ে খুবই যত্নবান। তবু এই মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়।’

এ সময় ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ মো. সেলিম, পরিচালক খোরশেদ আলম ও জাকিরুল ইসলাম, উপাধ্যক্ষ পীযূষ কর্মকার ও বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লুৎফুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে আদনানের লাশ ঢাকার একটি হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরের কার্যকারিতা না থাকায় লাশ ঢাকায় নেওয়া হয়। ভারতীয় হাইকমিশন প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে লাশ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। ছেলের লাশ নিয়ে ভারতে ফিরবেন নিঘাত বেগম।

বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লুৎফুর রহমান জানান, আদনানের মৃত্যুর ঘটনায় থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর কারণ জানতে তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।