টোকিওর আকাশে তখন শরতের মৃদু রোদ। গিঙ্কোগাছের পাতায় সোনালি আলো ঝরে পড়ছে, যেন ঋতু নিজেই নগরীর কাঁধে একটি রেশমি চাদর জড়িয়ে দিয়েছে। সেই দূরদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বললেন, ঢাকাকেও টোকিওর মতো সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
কথাটি সংবাদপত্রের একটি শিরোনাম হয়তো। কিন্তু তার গভীরে ছিল আরও বড় কিছু। ছিল একটি নগরসভ্যতার প্রশ্ন, একটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। কারণ, শহর কেবল নির্মাণ করা যায় না, তাকে লালনও করতে হয়।
একটি গোলাপগাছের কাছে যেমন শুধু মালিই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ঋতুর অনুকম্পা, মাটির উর্বরতা, শিশিরের স্পর্শ; তেমনি একটি শহরকে সুন্দর রাখার জন্য শুধু সরকারের উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন নাগরিকের ভালোবাসা। আর ভালোবাসাহীন সৌন্দর্য খুব বেশি দিন টেকে না।
ঢাকা শহরকে আমি অনেক সময় এক ক্লান্ত মায়ের সঙ্গে তুলনা করি। ভোর হতে না হতেই সে জেগে ওঠে। তার বুকে লাখো মানুষের পদচারণ। তার কপালে যানজটের চিন্তার ভাঁজ। তার চোখের কোণে ধুলো জমে। তার ফুসফুসে বিষাক্ত ধোঁয়া। তার নদীগুলোয় ক্লান্তির কালো জল। তবু সে বেঁচে থাকে। প্রতিদিন। প্রতিটি সকাল। প্রতিটি সন্ধ্যা। যেন সন্তানদের জন্য দুঃখ গোপন করে রাখা কোনো জননীর মতো। কিন্তু সেই মায়ের মুখে যদি আমরা প্রতিদিনই ধুলো ছুড়ে দিই, তার আঁচলে যদি আমরা নিজেরাই ময়লা মুছি, তবে তাকে দোষ দিয়ে আর কত দূর যাওয়া যায়?
ভোরবেলায় শহরের রাস্তায় হাঁটলে দেখা যায়, কিছু মানুষ নিঃশব্দে দিন শুরু করে। গত রাতের জমানো ধুলো সরায়। পাতা সরায়। পলিথিন সরায়। বোতল সরায়। শহরের শরীর ধুয়ে দেয় নিজের শ্রমের ঘামে।
সূর্য ওঠে। মানুষ বের হয়। আর দুপুর না হতেই সেই একই রাস্তায় আবার উড়ে এসে পড়ে প্লাস্টিকের কাপ, চিপসের মোড়ক, সিগারেটের প্যাকেট। তারা কিছু বলে না। কিন্তু বাতাস যেন তাদের হয়ে প্রশ্ন করে, ‘আমরা কি রাস্তা পরিষ্কার করছি, নাকি মানুষের অভ্যাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি?’ এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের প্রত্যেককেই দিতে হবে।
আমরা প্রায়ই বলি, টোকিও পরিষ্কার। সিঙ্গাপুর পরিচ্ছন্ন। সিউল সুসংগঠিত। কিন্তু এই শহরগুলোর গল্প শুধু উন্নত অর্থনীতির গল্প নয়। এগুলো মানুষের চরিত্রের গল্প। নাগরিক চেতনার গল্প। আত্মশাসনের গল্প।
জাপানের একজন মানুষ রাস্তার ওপর ময়লা ফেলেন না কেবল জরিমানার ভয়ে নয়; তিনি ফেলেন না কারণ শহরটিকে তিনি নিজের সম্প্রসারিত ঘর বলে মনে করেন। এ অনুভূতিই সভ্যতার সবচেয়ে বড় সম্পদ। যেখানে নাগরিক বলে, ‘এই রাস্তা আমার’, ‘এই ফুটপাত আমার’, ‘এই পার্ক আমার’, ‘এই নদী আমার’, সেখানে শহর ধীরে ধীরে সুন্দর হয়ে ওঠে। শাসকের নির্দেশে নয়, মানুষের মমতায়।
আসলে শহরকে সুন্দর রাখা কোনো প্রকৌশলগত সমস্যা নয়। এটি একধরনের নৈতিক কবিতা। একধরনের সামাজিক সংগীত, যার প্রতিটি পঙ্ক্তি লিখতে হয় মানুষের আচরণ দিয়ে। একটি শিশু যখন চকলেটের মোড়ক রাস্তায় না ফেলে পকেটে রাখে, তখন সে একটি পরিচ্ছন্ন শহরের জন্য একটি লাইন লেখে। একজন তরুণ যখন দেয়ালে পোস্টার না লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সে আরেকটি লাইন লেখে। একজন দোকানি যখন দোকানের সামনের ময়লা নিজে পরিষ্কার করে, তখন সে সেই কবিতায় আরও একটি শব্দ যোগ করে। এভাবেই একটি নগরীর সৌন্দর্য রচিত হয়। ধীরে ধীরে। নীরবে। গভীরে।
আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হয়তো এখানেই। আমরা মনে করি, শহর সরকারের। অথচ সত্য হলো, শহর কারও একার নয়। এটি এক বিশাল যৌথ উত্তরাধিকার, যার মালিক একসঙ্গে রিকশাচালকও, অধ্যাপকও; শ্রমিকও, মন্ত্রীও। সরকার রাস্তা বানাতে পারে। ফুটপাত নির্মাণ করতে পারে। পার্ক গড়ে তুলতে পারে। আইন প্রণয়ন করতে পারে। কিন্তু মানুষের বিবেক নির্মাণ করার ক্ষমতা কোনো রাষ্ট্রের নেই। সেটি জন্ম নেয় পরিবারে। সেটি বড় হয় স্কুলে। সেটি বিকশিত হয় সংস্কৃতিতে। আর পরিণত হয় ব্যক্তির চরিত্রে।
ঢাকা আজ যেন দুটি সময়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে তার সম্ভাবনা। অন্যদিকে তার বিশৃঙ্খলা। একদিকে মেট্রোরেলের দ্রুতগতি, অন্যদিকে বেপরোয়া ব্যাটারি রিকশা। একদিকে উন্নয়নের আলোকমালা, অন্যদিকে অনিয়মের দীর্ঘ ছায়া। কখনো কখনো মনে হয়, শহরটি যেন একটি নদী, যে সাগরের দিকে যেতে চায়, কিন্তু নিজেরই তীরে ফেলে রাখা আবর্জনায় বারবার আটকে যায়।
টোকিওর মতো হওয়ার স্বপ্ন আসলে টোকিও হওয়ার স্বপ্ন নয়। এটি নিজের সেরা সংস্করণে পৌঁছানোর স্বপ্ন। পদ্মা যেমন মেঘনা হওয়ার চেষ্টা করে না, কুশিয়ারা যেমন যমুনার অনুকরণ করে না, তেমনি ঢাকারও টোকিও হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু এতটুকু যে, সে যেন নিজের ধুলো নিজে চিনতে শেখে। নিজের ক্ষত নিজে সারাতে শেখে। নিজের সৌন্দর্য নিজে রক্ষা করতে শেখে।
যে শহরকে মানুষ ভালোবাসে, তাকে পরিষ্কার রাখতে আইন লাগে না। যে শহরকে মানুষ আপন বলে জানে, সেখানে দায়িত্ববোধই সবচেয়ে বড় পুলিশ। সে কারণে ঢাকাকে বদলানোর যাত্রা শুরু হবে না কোনো উড়ালসেতুর উদ্বোধন দিয়ে, কোনো বিদেশ সফরের ঘোষণায়ও নয়।
একটি শহর, যার সৌন্দর্য কংক্রিটে নয়, মানুষের বিবেকে। একটি শহর, যার পরিচ্ছন্নতা ঝাড়ুদারের ঝাড়ুতে নয়, নাগরিকের হৃদয়ে। একটি শহর, যার নাম ঢাকা। প্রতিটি শহরেরই একটি স্মৃতি থাকে। যেমন মানুষের থাকে। একটি শিশুর প্রথম হাঁটার স্মৃতি যেমন তার মায়ের চোখে বেঁচে থাকে, তেমনি একটি নগরীরও কিছু অদৃশ্য স্মৃতি থাকে তার রাস্তার ধুলোয়, তার পুরোনো গাছের ছায়ায়, তার নদীর জলে, তার ভাঙা ঘাটের ইটের গায়ে। ঢাকাও তেমন একটি স্মৃতিবাহী নগরী।
এই শহর দেখেছে নবাবদের শোভাযাত্রা। দেখেছে মাঝির ভাটিয়ালি। দেখেছে ভাষা আন্দোলনের মিছিল। দেখেছে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত দিন। দেখেছে বিজয়ের পতাকা। এই শহরের প্রতিটি অলিগলি যেন ইতিহাসের একেকটি নীরব পাণ্ডুলিপি। কিন্তু ইতিহাস কেবল স্মৃতির জন্য টিকে থাকে না। স্মৃতি টিকে থাকে উত্তরাধিকারীদের যত্নে। যে সন্তান পৈতৃক ভিটা আগলে রাখে না, একদিন সেই ভিটা আগাছায় ঢেকে যায়। যে জাতি নিজের শহরকে ভালোবাসে না, একদিন সেই শহর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আজ আমরা যখন একটি চিপসের মোড়ক রাস্তার পাশে ফেলে দিই, তখন হয়তো মনে হয়, এটি খুব সামান্য ঘটনা। কিন্তু সেই সামান্য ঘটনাই ধীরে ধীরে একটি শহরের মর্যাদাকে ক্ষয় করে।
একটি নগর কখনো এক দিনে নষ্ট হয় না। অযত্নের ছোট ছোট বালুকণা জমতে জমতে একদিন মরুভূমি হয়ে ওঠে। আবার ভালোবাসার ছোট ছোট ফোঁটাও জমতে জমতে নদী হয়ে যায়। টোকিও আজ যে পরিচ্ছন্ন, তার কারণ তারা কেবল আধুনিক নগরী নির্মাণ করেছে বলে নয়; তারা তাদের নগর-স্মৃতিকে সম্মান করেছে। তারা বুঝেছে, শহর একটি উত্তরাধিকার।
শহর আসলে বর্তমানের সম্পদ নয়; শহর ভবিষ্যতের কাছ থেকে ধার নেওয়া একটি দায়িত্ব। আমরা কেবল তার সাময়িক অভিভাবক। আজ যে রাস্তায় আমরা হেঁটে চলি, কাল সেখানে হাঁটবে অন্য কেউ। আজ যে গাছের ছায়ায় আমরা দাঁড়াই, কাল সেখানে বিশ্রাম নেবে অন্য প্রজন্ম। তাই শহরের প্রতি দায়িত্ববোধ আসলে নিজের প্রতি দায়িত্ব নয়, ভবিষ্যতের প্রতিও এক নীরব অঙ্গীকার।
আর হয়তো সেদিনই ঢাকা সত্যিকারের সুন্দর হতে শুরু করবে, যেদিন নাগরিকেরা শহরকে সরকারের সম্পত্তি নয়, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া একটি মূল্যবান আমানত হিসেবে দেখতে শিখবে। তখন রাস্তার ধুলোও আমাদের কাছে অর্থহীন হবে না। তখন একটি গাছ কাটা মানে হবে ইতিহাসের একটি পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলা। তখন একটি নদী বাঁচানো মানে হবে ভবিষ্যতের জন্য একটি কবিতা রক্ষা করা। আর তখনই ঢাকার সৌন্দর্য কেবল তার স্থাপত্যে নয়, তার মানুষের হৃদয়ে আশ্রয় নেবে।
মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সূত্র: প্রথম আলো