গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৮:৩০ এএম

মেঘের পরে মেঘ; যুদ্ধ শেষ হয়, যন্ত্রণা কি শেষ হয়

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
মেঘের পরে মেঘ; যুদ্ধ শেষ হয়, যন্ত্রণা কি শেষ হয়

আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে জন্ম, বাবা–মায়ের মুখে মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনে বড় হয়েছি, কিছুটা বাস্তব সত্য ইতিহাসের হাত ধরে কিছুটা কল্পনার এবং অনুমানের মাধ্যমে আমাদের মধ্যেও মুক্তিযুদ্ধ বিরাজ করে। কিন্তু আমাদের বাবা–মায়েরা সেই চরম পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে ফিরেছিলেন।

বরেণ্য কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের কাহিনি অবলম্বনে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন কিংবদন্তি পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম। চাষী নজরুল আনন্দস্বরূপ। নিপুণ বুদ্ধিদীপ্ত গাঢ় রসের আনন্দ, দেশীয় ঐতিহ্যের মননশীল সাংস্কৃতিক চেতনা ও চিন্তাচর্চার মাধ্যমে জ্ঞান লাভ করব বলে ওনার চলচ্চিত্র দেখতে বসি।

লেখক ও পরিচালক দুজনই মুক্তিযুদ্ধকে সামনে থেকে দেখেছেন। তাই উপন্যাসের আকারে একটি বৃহত্তর কাহিনি হলেও এবং সেই কাহিনির অনবদ্য চলচ্চিত্রায়ণ হলেও এই চলচ্চিত্রকে মুক্তিযুদ্ধের এবং পরবর্তী স্বাধীন দেশের বাস্তব দলিল হিসেবে বেছে নেওয়া যেতে পারে। চলচ্চিত্রের নাম ‘মেঘের পরে মেঘ’।

কতটা ত্যাগ, যন্ত্রণা, রক্তক্ষয়ের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, তিলে তিলে মরণযন্ত্রণা ভোগ করে ঘাতক পাকিস্তানিদের হাতে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, সেই রাক্ষুসে মানুষগুলোকে সঙ্গ দিয়েছে দেশীয় রাজাকার, আল বদর, আল শামসসহ ঘৃণ্য কিছু মানুষ—প্রবীণ পরিচালকের দৃশ্যের পর দৃশ্যের বুননে তা উঠে এসেছে।

এত বড় একটা দেশের এত প্রাণের রক্তক্ষয়ের, উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণার বিনিময়ে দেশের যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, সেই স্বাধীন দেশে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা, পুনরায় রাজাকারদের হাতে নির্মমভাবে অত্যাচারিত হওয়া, ঘাতক রাজাকারদের মুক্তিযোদ্ধা সেজে বসা—এ ধরনের জঘন্য বৈরী ঘটনাও উঠে এসেছে এখানে। যার বাস্তবতা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

লেখক–পরিচালকেরা জীবনজারিত ভেতরের যন্ত্রণার তাড়নায় শুধু ইতিহাসের চাক্ষুস দৃশ্যের নির্মম চিত্র আপন সৃজনশীলতায় তুলে আনেন না, তাঁরা ভবিষ্যৎও দেখতে পান। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত ত্যাগতিতিক্ষার মূল্য কোথায় এসে ঠেকেছে, সেদিনকার ঘাতক দালালরা শুধু বহাল তবিয়তে বিরাজ করছে না, নিজেরা মুক্তিযোদ্ধা সেজে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের পর্যন্ত নানা ফন্দিফিকিরে রাজাকার বানিয়ে তুলছে, সেই অবক্ষয়ের কূট রাজনীতির চিত্র অন্তক্ষরা যন্ত্রণায় এখানে বিস্তৃত হয়েছে।

রাবেয়া খাতুনের বাস্তব কাহিনির চিত্রায়ণের বাস্তব সংলাপ রচনা করেছেন স্বয়ং রাবেয়া খাতুন ও ওয়াকিল আহমেদ। সুন্দর চিত্রনাট্য সাজিয়েছেন ওয়াকিল আহমেদ ও জ্যোৎস্না কাজী। সহযোগী পরিচালক ছিলেন তারেক শিকদার। সংগীত পরিচালনা করেছেন ইমন সাহা। শুরু থেকেই মন ভালো করে দেওয়া আবহসংগীতের মাধ্যমে আমাদের মন কেমনের জগতে নিয়ে যায়। উত্তম গুহের সুন্দর শিল্পনির্দেশনা একেবারে স্বপ্ন ও বাস্তব দিয়ে আঁকা ছবির মতো চলচ্চিত্রের পরতে পরতে অনুভূত হয়। চাষীর চাঁদের হাটে জ্যোৎস্না এভাবে পরতে পরতে মায়াময় জগৎ তৈরি করে।

ঘাতক, দালাল, রাজাকারদের নির্দেশে পাকিস্তানি বর্বর সেনাদের হাতে মজিদের টুপি পরা ধার্মিক মুসলমান বাবা মারা যায়। মজিদের মায়ের দুচোখে গুলি লাগে, অন্ধ হয়ে যায়। ক্যাপ্টেন সাদেক কিশোরী বোনকে ধর্ষণ করে। তীব্র যন্ত্রণার দুনিয়াকাঁপানো আর্তনাদে তার মৃত্যু হয়।

রাজাকাররা যে চেনা–পরিচিত কিশোরী–যুবতী নারীদের ঘরে ঘরে পাকিস্তানিদের ঢুকিয়ে দিত, এই ঘটনাগুলো আমাদের বারবার শোনা। মজিদ নতুন বউকে নিয়ে পুকুরে পানির মধ্যে গিয়ে লুকিয়ে ছিল। মা, ঠাকুরমার কাছে এভাবে কচুরিপনার ঝোঁপে পানির মধ্যে লুকিয়ে থাকার গল্প আমিও শুনেছি। আর আমার একমাত্র পিসি নিভা চৌধুরীর সঙ্গে সুহাস আচার্য্যের নমঃ নমঃ করে বিয়ে হয়েছিল একাত্তরের এই যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে। রাজাকারদের হাত থেকে যুবতী মেয়েকে বাঁচাতে এভাবে যে যেভাবে পারেন, কন্যাকে পাত্রস্থ করেছেন। কাহিনিতে যেমন মজিদ ঢাকায় এসে সুরাইয়াকে বিয়ে করে গ্রামে নিয়ে যায় যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই। এভাবে টুকরা টুকরা ঘটনার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার আমাদের বাবা–মায়েদের জীবনের গল্পও মিলে যায়।

‘দম’ কি বাংলা সিনেমায় দম আনতে পেরেছে

গ্রামে এসেও নিস্তার নেই। রাজাকারের নজর পড়ে যায় সুরাইয়ার ওপরে। সুরাইয়া চরিত্রে পূর্ণিমাকে শুধু অসাধারণ সুন্দরী লাগেনি এখানে। চরিত্রের প্রতিটি ভাঙা-গড়ায় সু–অভিনয়ে অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন যথাযোগ্য মর্যাদায়। সুন্দরী পূর্ণিমা চাষীর জ্যোৎস্নার মায়াময় জগতের অবশ্যই অনবদ্য আবিষ্কার। যদিও বৃদ্ধ বয়সের রূপসজ্জা ঠিক ততটা বৃদ্ধ করে তুলতে পারেনি তাঁকে। দক্ষ অভিনয়ের জোরে উতরে গিয়েছেন।

তবে মজিদ ও সেজানের দ্বৈত ভূমিকায় অভিনয়ে রিয়াজকে রূপ দিতে শিল্পী কিন্তু একেবারে সফল। একই রকম দেখতে দুজন মানুষ যে দুনিয়াতে বিরল নয়, সেই সত্যও এখানে উঠে আসে। অঙ্গসজ্জায় ছিলেন দিলীপ সিং, রূপসজ্জাকার রহমান। চাষী ভাইয়ের চলচ্চিত্রে তিনি যে দক্ষ শিল্পীদেরই সুযোগ দেবেন, বলাই বাহুল্য।

অভিনেতা রিয়াজও দ্বৈত ভূমিকায় এই চলচ্চিত্রে একজন সুদক্ষ সফল অভিনেতা। দুই চরিত্রের দুই রকম মনস্তত্ত্ব বোঝাটাও সহজ কাজ নয়। রিয়াজ যে অক্ষরে অক্ষরে উপলব্ধি করেছেন, অভিনয়ে তা প্রকাশ পেয়েছে। রিয়াজ ও পূর্ণিমা ছাড়া এই চলচ্চিত্রের অন্যান্য দক্ষ শিল্পী–কলাকুশলীরা হলেন সুব্রত, শহিদুল আলম সাচ্চু, প্রবীর মিত্র, এ কে এম জাহাঙ্গীর খান, জামিলুর রহমান শাখা, খালেদা আক্তার কল্পনা, নার্গিস, কুমকুম কেয়া, আজহারুল ইসলাম খান, আমির সিরাজী, মো. আবুল হোসেন, ওয়াকিল আহমেদ, শামীম ভিস্তি, তারেক শিকদার, সাজন, উত্তম গুহ, কাজী ইয়াছিন বাবুল, কোহিনুর, ফাহিম, রূপম, তপন, মাজনুন মিজান, রতন বিশ্বাস, মো. কামাল, খোকন মোল্লা, রবিন, শামীম, তমাল, তুহিন, মো. আলী, সৈয়দ আক্তার আলী। শিশুশিল্পী প্রমী আতিক, রাজীব। সহকারী পরিচালক তুহিন, তপন। চিত্রগ্রহণ করেছেন মজিবুল হক ভূঁইয়া। সম্পাদনায় ছিলেন আতিকুর রহমান মল্লিক।

চলচ্চিত্রের গান রচনা করেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। কণ্ঠ দিয়েছেন সুবীর নন্দী ও সাদী মোহাম্মদ। গানগুলো অফুরন্ত প্রাণে ভরা। ভালো লাগে। মাতৃমন্ত্রে দীক্ষিত স্বাধীন করা স্বপ্নের দেশে নারীর অবমাননা এই চলচ্চিত্রের বড় অংশজুড়ে আছে।

চাষী নজরুলের এই চলচ্চিত্র চোখে জল এনে দেয়। মা রাবেয়া খাতুনের এই মর্মস্পর্শী মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি চিত্রায়ণে সহযোগিতা করেছেন সাংবাদিক ফরিদুর রেজা সাগর।

তবে মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি হলেও মুক্তিযুদ্ধকে বাইরে রেখেও নারীজীবনের আরেকটি বড় দিক এই চলচ্চিত্রে আলোচিত হয়, বিষয়টিকে একেবারে সাম্প্রতিক সময়ের বিষয় বলে ধরা হলেও ভুল হবে না। তা হলো, গর্ভের সন্তান কার? তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা।

লেখক ও পরিচালক ২০০৪ সালে বসে এই বিষয় নিয়ে ভেবেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ ধরনের প্রশ্ন উঠত বলেই তাঁরা ভেবেছেন। নারীকে অত্যাচারিত হয়ে পুরুষশাসিত সমাজের দাঁড় করানো এই অগ্নিপরীক্ষার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে যুগের পর যুগ। নারীকে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হয়েছে চিরাচরিত সমাজের বানানো মাপকাঠিতেই, তাতে ব্যক্তিত্বের মানহানি ঘটেছে। তাতে ব্যক্তিত্বের মান বারবার লাঞ্ছিত হয়েছে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।