গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৬:৫০ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:৩০ এএম

‘স্যরি’ না বলেও কীভাবে ক্ষমা চাইবেন

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
‘স্যরি’ না বলেও কীভাবে ক্ষমা চাইবেন

বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। আপনি যাননি, ফোনও ধরেননি। পরদিন মেসেঞ্জারে লিখলেন, ‘স্যরি দোস্ত।’ জবাব এল, ‘কিসের স্যরি?’

এই প্রশ্নের মানে খুব সহজ। দুই অক্ষরের একটি শব্দে আমরা অনেক সময় ভুলটা স্বীকার করি না, শুধু ঝামেলা মেটাতে চাই। যাঁকে কষ্ট দিয়েছি, তিনি চান বুঝতে, আমরা আসলে কী বুঝেছি।

‘স্যরি’ কেন অনেক সময় কাজ করে না
পারিবারিক শিক্ষায় ছোটবেলা থেকে আমরা শিখি, ভুল করলে ‘স্যরি’ বলতে হয়। ‘আপুর কাছে গিয়ে স্যরি বল’, এমন ধমক অনেকেরই মনে আছে। ফলে ক্ষমা চাওয়া হয়ে ওঠে দায় সারার একটা নিয়ম, মন থেকে আসা কিছু নয়।

আরেকটি কারণ লজ্জা। কিছু সংকেতে মনে হয়, নিজের ভুল মেনে নেওয়া মানে ছোট হয়ে যাওয়া। কিন্তু প্রকৃত ক্ষমা চাওয়া দুর্বলতা নয়। এতে বোঝা যায়, সম্পর্কটাকে আপনি মূল্য দেন। ‘স্যরি’ বলা দোষেরও নয়, কিন্তু শুধু ওটুকু বললে সম্পর্ক জোড়া লাগে না। ক্ষমা চাওয়ায় থাকতে হবে স্বীকারোক্তি, অন্যের অনুভূতির প্রতি মনোযোগ আর ভুল শুধরে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি।

চার ধাপে ক্ষমা চাওয়া
১.
কী ঘটেছে, সরাসরি বলুন। ঘুরিয়ে নয়, ব্যাখ্যা দিয়েও নয়। ‘আমি কথা দিয়েছিলাম মঙ্গলবার কাজটা জমা দেব, দিতে পারিনি’ কিংবা ‘তোমার পাশে থাকা দরকার ছিল, আমি ছিলাম না’—এটুকুই যথেষ্ট। এর সঙ্গে ‘তুমি হয়তো ভেবেছ...’ জুড়ে দিলে স্বীকারোক্তি দুর্বল হয়ে যায়।

২. ওই ঘটনায় অন্যের কী হয়েছে, বুঝেছেন, তা জানান। ‘আমি না যাওয়ায় তোমাকে একা সব সামলাতে হয়েছে। নিশ্চয়ই খুব একা লেগেছে।’ এখানে নিজের কষ্টের কথা টানবেন না। অন্যের জায়গায় দাঁড়িয়ে বলুন।

৩. দায় নিন। ‘ভুলটা আমার।’ এই বাক্য বলতে সাহস লাগে, কিন্তু এর জোর অনেক। এখানেও বাদ দিন ‘কিন্তু’।

৪. কীভাবে ঠিক করবেন, বলুন। ‘আজ বিকেলের মধ্যেই ক্লায়েন্টকে ফোন করে পরিস্থিতি জানাব’ অথবা ‘এখন থেকে দেরি হলে আগেই মেসেজ দেব।’ কথাটা যত নির্দিষ্ট ও সময়ে বাঁধা হবে, বিশ্বাসযোগ্যতা তত বাড়বে। ‘আর হবে না’ বলার চেয়ে এটি অনেক বেশি কাজের।

আলোচনায় দুটি অতিরিক্ত পরামর্শও পাওয়া যায়। একটি হলো কথা শেষে জিজ্ঞাসা করা, ‘কী করলে তোমার ভালো লাগবে?’ এতে অন্যজন সমাধানের অংশ হয়ে যান। অন্যটি হলো কয়েক দিন পর খোঁজ নেওয়া, ‘এখন কেমন লাগছে?’

যেসব কথা বলবেন না
কিছু বাক্য ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে এলেও আসলে আত্মরক্ষা:
• ‘যদি তোমার কষ্ট লেগে থাকে...’ (এতে মনে হয়, কষ্ট পাওয়াটাই সন্দেহজনক)
• ‘আমি তো এমন করতে চাইনি, আসলে...’ (সাফাই শুরু হলে মনোযোগ নিজের দিকে চলে যায়)
• ‘তুমিও তো সেদিন...’ (এটা ক্ষমা চাওয়া নয়, পাল্টা অভিযোগ)
• ‘অন্যরা তো আরও খারাপ করে।’ (তুলনা কারও কষ্ট কমায় না)

কখন, কীভাবে বলবেন
রাগের মাথায় বা ঝগড়ার মাঝখানে ক্ষমা চাইতে গেলে হিতে বিপরীত হয়। আবার সপ্তাহের পর সপ্তাহ চুপ করে থাকলে মনে হয়, বিষয়টা আপনার কাছে গুরুত্বহীন। একটি আলোচনায় মোটামুটি ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কথা বলার পরামর্শ আছে, তবে তা বড় কোনো নিয়ম নয়। মূল কথা, দুজনেই শান্ত থাকার মতো সময় বেছে নেওয়া।

কেউ যদি বলেন, ‘এখন কথা বলতে চাই না’, তাঁকে সময় দিন। শুধু বলে রাখুন, ‘আমি কাল সন্ধ্যায় আবার যোগাযোগ করব।’ একদম গায়েব হয়ে যাবেন না।

মাধ্যম বাছতে হবে ঘটনার গুরুত্ব বুঝে। গুরুতর ক্ষত হলে সামনাসামনি বলাই ভালো, তাতে সঙ্গে সঙ্গে অন্যজনের প্রতিক্রিয়া বোঝা যায়। তা না হলে ফোন। আবেগ বেশি থাকলে কিংবা দূরে থাকলে গুছিয়ে লেখা বার্তাও কাজ করে। লিখে ভাবার সুযোগ থাকে বলে অনেক সময় তা বেশি স্পষ্ট হয়। তবে বার্তায় ঠিক সেই চার ধাপই থাকতে হবে।

রাগ নিয়ন্ত্রণ করবেন কীভাবে

কথার সঙ্গে কাজ
ক্ষমা চাওয়ার আসল পরীক্ষা কথার পরে। ওয়াদা করেছেন সময়মতো খবর দেবেন? এক মাস তা মেনে চলুন। অফিসে ডেডলাইন ফসকেছে? পরেরটায় আগেভাগে কাজ শেষ করুন। ছোট ছোট কাজই বিশ্বাস ফেরায়।
আর কেউ ক্ষমা চাওয়ার পরেও সঙ্গে সঙ্গে নরম না হলে অধৈর্য হবেন না। ক্ষমা করা বা না–করা তাঁর সিদ্ধান্ত। আঘাত গভীর হলে সময় লাগে।

একই ভুল বারবার হলে
যদি দেখেন, একই ঝগড়া আর একই ক্ষমা চাওয়া বারবার ফিরে আসছে, তাহলে হয়তো সমস্যাটা কেবল কথার নয়। তখন খোলাখুলি স্বীকার করুন যে এটা একটা ধরন হয়ে গেছে, আর একসঙ্গে পরিকল্পনা করুন। প্রয়োজনে পরিবারের বড় কেউ বা পরামর্শকের সাহায্য নেওয়াও যায়। এটি দুর্বলতা নয়; বরং সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার প্রমাণ।

শেষ কথা, ‘স্যরি’ বলা বারণ নয়, বারণ হলো শুধু ওটুকুতেই থেমে যাওয়া। পরেরবার ভুল করে বসলে বলে দেখুন—‘আমি এটা করেছি, তুমি এভাবে কষ্ট পেয়েছ, ভুলটা আমার। আমি এভাবে ঠিক করব।’ এই কয়েক লাইনের কাছে ‘স্যরি’ প্রায়ই হার মানে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।