প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৮:২০ পিএম || প্রকাশের তারিখঃ ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:৫৬ পিএম
বিশ্বের অন্যতম বড় সাইবার চুরির ঘটনায় জড়িত উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের জন্য রয়েছে বিলাসবহুল আবাসন, বিপুল অঙ্কের ডলার পুরস্কার, বিদেশ ভ্রমণ এবং ক্ষমতাসীন দলের সদস্য হওয়ার সুযোগ। দেশটির নেতা কিম জং উন এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিকল্পিতভাবে মেধাবী শিশুদের বাছাই করে বিশ্বমানের হ্যাকার হিসেবে গড়ে তুলছেন। লক্ষ্য, সাইবার হামলার মাধ্যমে দেশের জন্য অর্থ ও কৌশলগত সুবিধা অর্জন। খবর রয়টার্সের।
সম্প্রতি বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বাইন্যান্সে হ্যাকিংয়ের ঘটনায় প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই ও বাইন্যান্স এ ঘটনায় পিয়ংইয়ংকে দায়ী করেছে। ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, ‘ট্রেডারট্রেইটর’ নামের উত্তর কোরীয় একটি গোষ্ঠী এ হামলা চালিয়েছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে পিয়ংইয়ং।
উত্তর কোরিয়ার সাবেক হ্যাকার প্রশিক্ষক ও বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থানরত কিম হিউং-কোয়াং বলেন, কিম জং উনের জন্য হ্যাকাররা এক ধরনের গোপন অস্ত্র। তার মতে, বিশ্বের অন্য কোনো দেশ এত পরিকল্পিতভাবে মেধাবী শিশুদের খুঁজে বের করে শুধু সাইবার অপারেটিভ তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ দেয় না।
শৈশব থেকেই বাছাই
১৯৯৮ সালে উত্তর কোরিয়া সাইবার ইউনিট গঠন করে। তবে কিম জং উন ক্ষমতায় আসার পর এর গুরুত্ব বাড়ে। ২০১৩ সালে তিনি সাইবার যুদ্ধকে পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি দেশের আঘাত হানার সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ‘সর্বমুখী তরবারি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সাবেক প্রশিক্ষক ও দেশত্যাগী তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের তথ্যমতে, ১১ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের মধ্য থেকেই প্রতিবছর প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জনকে বাছাই করা হয়। তাদের কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে পড়ানো হয়। ১৭ বছর বয়সে সেরা শিক্ষার্থীদের দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। কয়েক ধাপ যাচাই-বাছাইয়ের পর নির্বাচিতদের সামরিক সাইবার ইউনিটে যুক্ত করা হয়।
প্রশিক্ষণে ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রযুক্তি, বিদেশি যন্ত্রপাতির সফটওয়্যার বিশ্লেষণ, উন্নত গণিত ও বিদেশি ভাষা শেখানো হয়। যারা সরাসরি হ্যাকার হয় না, তাদের পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানের জন্য দূর থেকে সফটওয়্যার ও অ্যাপ তৈরির কাজে প্রশিক্ষিত করা হয়।
কোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক লিম জং-ইন বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার মেধাবীরা যেখানে চিকিৎসাসহ মর্যাদাপূর্ণ পেশায় যাওয়ার সুযোগ খোঁজে, উত্তর কোরিয়া সেখানে শীর্ষ মেধাকে পারমাণবিক ও সাইবার কর্মসূচিতে নিয়োজিত করে এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে।
পুরস্কার ও বিশেষ সুবিধা
সফল সাইবার হামলার মাধ্যমে পাওয়া অর্থের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্যাকারদের সামরিক ইউনিটের জন্য বরাদ্দ হতে পারে। ব্যক্তিগত পুরস্কার হিসেবে ডলার, পিয়ংইয়ংয়ে ফ্ল্যাট এবং পরিবারের সদস্যদের সেখানে থাকার সুযোগও দেওয়া হয়। কোনো কোনো ফ্ল্যাটের আয়তন ১৩২ বর্গমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
এ ছাড়া চীনের মতো মিত্র দেশে ভ্রমণ, ক্ষমতাসীন দলের সদস্যপদ এবং প্রভাবশালী পরিবারের সঙ্গে বিয়ের সুযোগও মেলে। তবে এ সুবিধা পান অল্পসংখ্যক ব্যক্তি। দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার সাইবার যুদ্ধ কার্যক্রমে প্রায় ৮ হাজার ৪০০ জন কাজ করেন।
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ঝুঁকি বাড়ছে
লাজারাস গ্রুপসহ উত্তর কোরিয়ার একাধিক হ্যাকার গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির অভিযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় এসব গোষ্ঠী বারবার হামলা চালিয়েও আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহির মুখোমুখি হয় না বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। এতে তারা নিজেদের কৌশল আরও উন্নত করার সুযোগ পায়।
চেইনঅ্যানালাইসিসের কর্মকর্তা অ্যালেক জেব্রিক বলেন, সাধারণ সাইবার অপরাধীরা একটি ভুল করলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়তে পারে। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা রাষ্ট্রের হয়ে কাজ করায় ব্যর্থতার পরও অভিযান চালিয়ে যেতে পারে।
উত্তর কোরিয়ার তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের সঙ্গে কাজ করা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, তারা অত্যন্ত সংগঠিত এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার করে। চাকরির আবেদন, জীবনবৃত্তান্ত তৈরি, কোড লেখা এমনকি ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরিতেও এআই ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বাইন্যান্স জানিয়েছে, ভুয়া চাকরির সাক্ষাৎকার ও বিজ্ঞাপনের আড়ালে ক্ষতিকর সফটওয়্যার ব্যবহার করে কর্মীদের কম্পিউটারে প্রবেশ করেছিল হ্যাকাররা।
তবে এসব কর্মীর জীবনও কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে কাটে। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সংকীর্ণ আবাসন, সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং মাসিক আয়ের লক্ষ্য পূরণের চাপ তাদের নিত্যসঙ্গী। মানবাধিকার সংগঠন পিসকোরের নির্বাহী পরিচালক নাম বাদা বলেন, নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ না হলে কর্মীদের অপমান ও শাস্তির মুখে পড়তে হয়। অতিরিক্ত মানসিক চাপ থেকে শারীরিক সমস্যাও দেখা দেয়।
সূত্র : রয়টার্স
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স