গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:৫১ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম

যুব মহিলা লীগের নেত্রীকে নির্যাতনের দাবি, ছবিতে এআই ব্যবহার, নারীর খোঁজও মেলেনি

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
যুব মহিলা লীগের নেত্রীকে নির্যাতনের দাবি, ছবিতে এআই ব্যবহার, নারীর খোঁজও মেলেনি

ঢাকার মিরপুরে বাসায় ঢুকে যুব মহিলা লীগের এক নেত্রীকে নির্যাতন করা হয়েছে—এক নারীর পিঠে আঘাতের চিহ্ন থাকা ছবি দিয়ে এমন দাবি ছড়িয়েছে ফেসবুক ও এক্সে। অর্ধশতাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই প্রচার চালানোর বিষয়টি প্রথম আলো যাচাই করেছে।

আজ শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দিনভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্টগুলোতে ওই নারী থানায় অভিযোগ জানাতে গেছেন উল্লেখ করে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে তাঁর কথাবার্তার একটা বর্ণনাও রয়েছে। তবে ঘটনাটি কবে ঘটেছে, তার উল্লেখ নেই।

প্রথম আলোর যাচাইয়ে ছবিটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ জানিয়েছে, এমন কোনো অভিযোগ তাদের কাছে আসেনি। যে পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে, সেটার অস্তিত্বও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

ছবিটি পোস্ট করেছেন, এমন তিনজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে প্রথম আলো। যে নারীকে নির্যাতনের কথা বলা হচ্ছে, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের উপায়, তাঁর ঠিকানা ও থানায় দেওয়া অভিযোগের অনুলিপি চাওয়া হয়েছিল তিনজনের কাছেই। কেউই তা দিতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তাঁরা জানিয়েছেন, অন্যের পোস্ট কপি করে নিজেদের অ্যাকাউন্টে দিয়েছেন। ঘটনা সম্পর্কে তাঁরা বিস্তারিত জানেন না।

কী দাবি করা হয়েছে পোস্টে

ফেসবুক ও এক্সের পোস্টগুলোতে একটা মানুষের পিঠের ছবি দিয়ে বলা হয় এর নাম ‘শ্রীময়ী রীতা রানী’। তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে মিরপুর থানা যুব মহিলা লীগের ‘সংগঠক’ হিসেবে। দাবি করা হয়েছে, তিনি হিন্দু, আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন এবং দেখতে সুন্দরী—এসব কারণে তাঁর বাসায় ঢুকে তাঁকে ‘পাশবিক নির্যাতন’ করা হয়। মারধরে তাঁর শরীর রক্তাক্ত হয়।

কিছু পোস্টে ফিরোজ নামে এক ব্যক্তিকে নির্যাতনের জন্য দায়ী করা হয়েছে। তবে তাঁর পরিচয় নিয়ে পোস্টগুলোর বর্ণনায় অমিল আছে। কোথাও বলা হয়েছে, মিরপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়কের নির্দেশে ফিরোজ ওই নারীর বাসায় ঢোকেন। আবার কোথাও ফিরোজকেই থানা কমিটির আহ্বায়ক উল্লেখ করে বলা হয়েছে, নির্যাতন হয়েছে তাঁর নেতৃত্বে।

পোস্টদাতাদের আরও দাবি, ওই নারী মিরপুর থানায় অভিযোগ করতে গেলে ওসি তাঁকে বলেন, তাঁর সৌন্দর্যই তাঁর ‘কাল’। ওসি তাঁকে বোরকা পরার পরামর্শও দেন। এসব অভিযোগ তুলে পোস্টগুলোতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সুরক্ষা, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং নারীবাদীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

ফেসবুক থেকে এক্সেও ছড়াল দাবি

প্রথম আলো এ-সংক্রান্ত অর্ধশতাধিক পোস্ট যাচাই করেছে। এর মধ্যে প্রথমে শুক্রবার বেলা ১১টা ৫৯ মিনিটে ‘এফ কে জয় জয়’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ছবিটি পোস্ট করার তথ্য পাওয়া যায়।

পরে ‘মুকুল আহমেদ’ ও ‘সুমন মল্লিক’ নামের আরও দুটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকেও একই দাবিতে ছবিটি পোস্ট করা হয়। প্রোফাইলগুলোর আগের পোস্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেগুলো থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে নিয়মিত পোস্ট দেওয়া হয়।

বিকেল ৪টা ৪৮ মিনিটে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন নিজের ফেসবুক পেজে ছবিটি পোস্ট করেন। রাত আটটা পর্যন্ত তাঁর পোস্টে প্রায় চার হাজার প্রতিক্রিয়া পড়ে।

এক্সেও একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে একই দাবিতে ছবিটি ছড়ানো হয়। এর মধ্যে ‘Dr Baidyanath Ghosh’ নামের একটি অ্যাকাউন্টের পোস্ট রাত নয়টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ১ লাখ ৪৮ হাজার বার দেখা হয়েছে।

ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। প্রথম আলোর অনেক পাঠক ফোন করেও ঘটনার সত্যতা জানতে চেয়েছেন। এরপর ছবিটি যাচাইয়ের বিভিন্ন টুলের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অভিযোগে নাম আসা ব্যক্তির সঙ্গেও কথা বলে প্রথম আলো।

ছবিটি যাচাই করে কী পাওয়া গেল

মিরপুরে যুব মহিলা লীগের এক নেত্রীকে নির্যাতনের দাবি করে ছড়ানো ছবিটি যাচাইয়ে তিনটি টুল ব্যবহার করা হয়। এগুলো হলো সিন্থআইডি, ওপেনএআইয়ের এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট যাচাইয়ের টুল ও হাইভ মডারেশন।

যাচাইয়ে ছবিটি তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। তবে পুরো ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি, নাকি আগের কোনো ছবি এআই দিয়ে সম্পাদনা করা হয়েছে, যাচাইয়ের ফলাফলে তা স্পষ্ট নয়।

ছবিটির সূত্র খুঁজতে গিয়ে প্রায় এক মাস আগের কয়েকটি অনলাইন পোস্ট পাওয়া যায়। সেসব পোস্টে ভারতের কেরালায় যৌতুকের দাবিতে এক নববধূকে তাঁর স্বামীর নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে একটি ছবি জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। ঢাকার মিরপুরে নির্যাতন করার দাবিতে ছড়ানো ছবিটির সঙ্গে ওই ছবির কিছুটা মিল আছে। তবে কেরালার ঘটনার সঙ্গে ছড়ানো ছবিটি সম্পাদনা করেই পরেরটি তৈরি করা হয়েছে কি না, তা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অনলাইন প্রচারণায় ওই নারীর দলীয় পরিচয় নিয়েও অসংগতি পাওয়া গেছে। তাঁকে ‘মিরপুর থানা যুব মহিলা লীগের সংগঠক’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। যুব মহিলা লীগের একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে জানিয়েছে, সংগঠনটিতে ‘সংগঠক’ নামে কোনো পদ নেই।

আসলে থানায় কেউ গিয়েছিলেন কি না

ঘটনাস্থল ধরে বিষয়টি যাচাই করতে যোগাযোগ করা হয় মিরপুর থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি আজ সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর থানা এলাকায় এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। এমন অভিযোগ নিয়েও কোনো নারী থানায় আসেননি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের অন্যান্য থানায় এমন ঘটনা ঘটেছে কি না, সেটিও জানার চেষ্টা করা হয়। মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বিভাগের অধীন কোনো থানা এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেনি। পোস্টে যে নারীর কথা বলা হয়েছে, এমন নামে বা তাঁর পক্ষে কেউ মিরপুর বিভাগের কোনো থানায় মামলা বা অভিযোগ করতেও আসেননি।

অভিযোগে নাম আসা ফিরোজ যা বললেন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো পোস্টে অভিযোগের বিষয়ে মিরপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি ফিরোজ আহমেদের সঙ্গে এই প্রতিবেদক কথা বলেছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এমন কোনো বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তাঁকে চিনিও না। এলাকায় এমন নামে কেউ আছেন, আবার তিনি যুব মহিলা লীগ করেন—এমন শুনিওনি। কেউ বলতেও পারছেন না। অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরাও আমাকে ফোন দিয়েছেন।’

ফিরোজ আহমেদ বলেন, ‘একেক জায়গায় আমার পরিচয় একেকভাবে দেওয়া হয়েছে। একেবারেই উড়ো একটি খবর ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও কাল্পনিক। আমি বর্বর জগতে বসবাস করি না যে আমার দ্বারা এমন ঘটনা ঘটবে। আমিও চাই প্রকৃত ঘটনার উদ্‌ঘাটন হোক।’

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।