গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:২২ পিএম

ক্ষমতার বাইরে থাকতে ফেসবুকে জবাবদিহি চাইতেন, এখন নীরব বালেন্দ্র শাহ

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
ক্ষমতার বাইরে থাকতে ফেসবুকে জবাবদিহি চাইতেন, এখন নীরব বালেন্দ্র শাহ
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ একসময় ফেসবুক ব্যবহার করতেন সরকারের সমালোচনা, অনিয়ম তুলে ধরা এবং জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সেই একই ফেসবুক পেজ এখন পরিণত হয়েছে সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণা ও সমর্থকদের আশ্বস্ত করার প্ল্যাটফর্মে। ক্ষমতায় আসার পর তার পোস্টে কমেছে ব্যক্তিগত আক্রমণ, প্রতিশ্রুতিতে কমেছে পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা। এমনকি সরকারের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সময়ও তাকে অনেক ক্ষেত্রে নীরব থাকতে দেখা যাচ্ছে। কাঠমান্ডু পোস্টের একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৩১ অক্টোবর সকালে সাদাপোশাকের পুলিশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে প্রবেশ করে সাংবাদিকদের আটক করার এক দিন পর শাহ ফেসবুকে মোবাইল গেম নিয়ে পোস্ট দেন। সেখানে তিনি জানান, বিশ্বের বহুল ডাউনলোড করা লুডু ও কলব্রেক গেম নেপালে তৈরি হয়েছে এবং তার সরকার গেমিং শিল্পের নিয়মকানুন সহজ করবে। গত ২৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ৫৮টি পোস্ট দিয়েছেন শাহ। প্রতিবেদক তার প্রধানমন্ত্রিত্বকালের এসব পোস্টের পাশাপাশি কাঠমান্ডুর মেয়র থাকাকালে করা ২০০টির বেশি পোস্ট বিশ্লেষণ করেছেন। এ কাজে ক্লড এআইয়ের ওপাস ৫.৫ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মেয়র থাকাকালীন শেষ দুই বছরের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও শাহ সপ্তাহে গড়ে প্রায় দুটি পোস্ট করেন। তবে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার আটটি পোস্ট রাত ৯টার পর প্রকাশিত হয়েছে। সমালোচকের ভূমিকা থেকে সরকারি বার্তাবাহক প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার আগে শাহ ফেসবুকে কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করতেন, বিভিন্ন ব্যক্তিকে নাম উল্লেখ করে আক্রমণ করতেন এবং নিজের কার্যালয়ের প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি ও লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরতেন। মেয়র থাকাকালে তার ২০৭টি পোস্টের মধ্যে ৩৯টিতে কাউকে নাম ধরে বিদ্রূপ বা আক্রমণ করা হয়েছিল। এসব আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিলেন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যক্তিরা। ২০২৫ সালের মার্চে এক পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ‘কেউ যদি বিভ্রান্তি ছড়ানোর বিষয়ে পিএইচডি করতে পারে, তাহলে বর্তমান সরকারকে সেই ডিগ্রি দেওয়া উচিত।’ গত বছরের সেপ্টেম্বরে জেন-জি আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে বিক্ষোভকারীরা নিহত হওয়ার দিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সমালোচনা করে তাকে ‘শুধু নিজের অনুগতদের বাবা’ বলে কটাক্ষ করেন শাহ। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এ ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। মার্চে দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত মাত্র একবার নেপালি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে এমন আক্রমণাত্মক পোস্ট দিয়েছেন তিনি। প্রতিশ্রুতিতে নেই পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা মেয়র থাকাকালে শাহ বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরতে নিয়মিত পরিসংখ্যান ব্যবহার করতেন। যেমন, ৬০ দিনে ৩ হাজার ৪৬৯টি পথকুকুরের বন্ধ্যাকরণ, প্রতি বছর ১৫ হাজার তরুণকে প্রশিক্ষণ এবং তাদের অন্তত ৫ হাজারের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার পোস্টে এ ধরনের নির্দিষ্ট সংখ্যা ও পরিমাপযোগ্য প্রতিশ্রুতি খুব কম দেখা যাচ্ছে। এর পরিবর্তে সমর্থকদের আশ্বস্ত করার ভাষা প্রাধান্য পাচ্ছে। বাজেট ঘোষণার রাতে তিনি মাত্র দুটি শব্দ লিখেছিলেন, ‘নিশ্চিন্ত থাকুন’। আগস্টে লিখেছিলেন, ‘সঠিক সময় আসতে কিছুটা সময় লাগে।’ পরের মাসে জেন-জি আন্দোলনের বর্ষপূর্তিতে তিনি বলেন, ‘সুশাসন অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হবে।’ সংকটে তৎপর, জবাবদিহির প্রশ্নে নীরবতা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত আগস্টে ভোতেকোশি বন্যার পর থেকে শাহ তার ১০টি পোস্টে ‘সম্মানিত মা-বাবা, ভাই-বোনেরা’ সম্বোধনটি ব্যবহার করেছেন। এর আগে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে এ ধরনের সম্বোধন দেখা যায়নি। বন্যার পর প্রায় দুই সপ্তাহ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে নিয়মিত পরিস্থিতির আপডেট দিয়েছেন তিনি। এসব পোস্টে নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন ও উদ্ধার হওয়া মানুষের সংখ্যা তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণার ক্ষেত্রেও ফেসবুককে গুরুত্ব দিচ্ছেন শাহ। জুলাইয়ে বেসরকারি স্কুল ও হাসপাতালের ওপর তার মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আরোপিত ৩ শতাংশ ফি প্রত্যাহারের ঘোষণা প্রথমে ফেসবুকেই দেন তিনি। দেশটির অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে কাঠমান্ডু পোস্টকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী যা বলেন, সেটিই চূড়ান্ত। তবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সরকারের জবাবদিহির প্রশ্ন উঠলে শাহকে তুলনামূলক নীরব দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এপ্রিলে অধ্যাদেশ জারির পথ সুগম করতে তার মন্ত্রিসভা সংসদের অধিবেশন সংক্ষিপ্ত করেছিল। এ বিষয়ে তিনি কোনো পোস্ট দেননি। ফাঁস হওয়া কথোপকথনে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে কয়েকজন বিচারপতির অভিশংসন নিয়ে তার দল আলোচনা করলেও এ বিষয়ে শাহের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সাংবাদিকদের আটকের পরদিন গেমিং শিল্প নিয়ে তার পোস্টটিও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এর আগে রোববার তিনি সতর্ক করে লিখেছিলেন, ‘এক বা দুজন পার পেয়ে যাবে, এমন স্বপ্ন কারও দেখা উচিত নয়।’ তবে কাদের উদ্দেশে তিনি এ কথা বলেছেন, তা স্পষ্ট করেননি। এর কয়েক ঘণ্টা আগে তার প্রধান উপদেষ্টা কুমার বেন ২৮ জন সাংবাদিককে ট্যাগ করে তাদের সাংবাদিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তালিকায় কাঠমান্ডু পোস্ট মিডিয়া গ্রুপের কয়েকজন সাংবাদিকও ছিলেন। শাহ ও তার প্রধান উপদেষ্টাকে নিয়মিত একে অপরের ফেসবুক পোস্টে সক্রিয় দেখা যায়। সংসদে উপস্থিতি মাত্র দুইবার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর শাহ ৫৮টি ফেসবুক পোস্ট দিলেও সংসদে উপস্থিত হয়েছেন মাত্র দুবার। নেপালের রাজনীতিতে পরিবর্তন ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল তার দল। সেই প্রতিশ্রুতি প্রচারেও ফেসবুক ছিল শাহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এখনো নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্মটি তার প্রধান ভরসা। সেখানে তার পোস্টে সমর্থক ও সমালোচকদের হাজার হাজার মন্তব্য এলেও তাকে সরাসরি কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে হচ্ছে না। প্রতিবেদনের মূল পর্যবেক্ষণ হলো, ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে যে ফেসবুক পেজকে শাহ জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সেই পেজই এখন অনেক বেশি সরকারি সিদ্ধান্ত প্রচার ও জনমত সামাল দেওয়ার মাধ্যম হয়ে উঠেছে। সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।