গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:৫২ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৮:০১ এএম

চা-শ্রমিক ঊষামণির নতুন ভোরের গল্প

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
চা-শ্রমিক ঊষামণির নতুন ভোরের গল্প

জন্ম কবে, চা-বাগানে জীবনের কতগুলো শীত-গ্রীষ্ম কাটিয়েছেন, তা জানেন না ঊষামণি। কত বছর ধরে চা-পাতা তুলছেন—এই প্রশ্ন শুনে আঙুলে গুনে বললেন, তাঁর শ্বশুর ছিলেন এই চা-বাগানের শ্রমিক। আজ থেকে তিরিশ বছর আগে তাঁর মৃত্যু হলে তাঁর বদলি হিসেবে তিনি এই কাজ পেয়েছেন। চা-বাগানে কোনো শ্রমিক অবসরে গেলে কিংবা কোনো কারণে কাজ করতে অক্ষম হলে তাঁর পরিবারের কোনো সদস্যকে সেই কাজ দেওয়া হয়। 

ঊষামণি তিরিশ বছর ধরে সেই কাজ করে চলেছেন। ঋতু বদলায়, গাছের পাতা বদলায়, বদলায় ঊষামণির বয়স। কিন্তু প্রতিদিন ভোরে বাগানের মেঠো পথ ধরে চা-পাতা তুলতে যাওয়ার পথটি তাঁর আর বদলায় না। দিনের শেষে ঘরে ফিরে রান্না ও গৃহস্থালির নানা কাজ; পরের দিনের চিন্তা। ঘরের বাজার, ওষুধের খরচ কিংবা সারা দিনে কতটা পাতা তুলছেন, সপ্তাহ শেষে কত টাকা মজুরি পাবেন, তার হিসাব মেলাতে মেলাতে হাজির হয় আরেকটি নতুন ভোর।

সিলেট শহরতলির লাক্কাতুরা চা-বাগানের ঊষামণির এই গল্প প্রায় প্রত্যেক চা-শ্রমিকের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। তাঁদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গাছের পর গাছের সারি, টিলার বাঁক, রোদ-বৃষ্টিতে কাজের ডাক আর দিন শেষে সংসারের হিসাব মেলানোর তাগিদ। দূর থেকে দেখা ঢেউখেলানো অপরূপ সৌন্দর্যময় সবুজ চা-বাগানের পাতার আড়ালে এভাবেই বয়ে চলে ঊষামণিদের জীবন। 

২৩ কেজির হিসাব-নিকাশ

লাক্কাতুরা চা-বাগানের গহিন নির্জনতায় ঊষামণির সঙ্গে কথা হয় এক দুপুরে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তোলা ৩৩ কেজি চা-পাতা ওজনকেন্দ্রে জমা দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। বাগানের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে কথা হয়। তিনি বলেন, সাত বছর আগে তাঁর স্বামী মারা গেছেন। চার মেয়ের মধ্যে তিনজনের বিয়ে দিয়েছেন। প্রতিদিন টিলায় টিলায় ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ তোলার কাজ করেন। সপ্তাহ শেষে মজুরি হিসেবে পান ১ হাজার ৩১৫ টাকা, সঙ্গে সাড়ে ৩ কেজি আটা। প্রতিদিন ২৩ কেজির কম চা-পাতা তুললে ওই দিনের হাজিরা গণনা করা হয় ‘লেস হাজিরা’ হিসেবে। অর্থাৎ পূর্ণ হাজিরা না পাওয়ায় মজুরি কমে যায়। আর ২৩ কেজির বেশি চা-পাতা তুলতে পারলে অতিরিক্ত প্রতি কেজির জন্য ৫ টাকা করে পান। 

চা-শ্রমিকেরা কিছু বাড়তি মজুরির আশায় কাজের সময় গল্পগুজব করেন না। সবার চোখ থাকে চা-পাতার দিকে। এমনটাই বললেন লাক্কাতুরা চা-বাগানের আরেক শ্রমিক সুমিত্রা ভূমিজ। চল্লিশ পেরোনো এই নারীর ছয় সদস্যের পরিবার। ভাশুরের বদলি হিসেবে ১৩ বছর বয়স থেকে চা-পাতা তুলছেন। এখন তাঁর ছেলেও চা-শ্রমিক। মা-ছেলের আয়েই চলে সংসার। 

নারী চা-শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন তামাটে রঙের দীর্ঘদেহী এক পুরুষ। তাঁর হাতে ছাতা, মাথায় অবিন্যস্ত চুল, গালে কয়েক দিনের না-কামানো দাড়ি, গলায় তুলসীর মালা। বয়স চল্লিশের মতো। তিনি চা-পাতা ওজন করার কাজ করেন। নাম সুনীল লোহার। এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে আমাদের কথাবার্তা শুনছিলেন। কাছে এসে বললেন, ‘পাঁচজনের সংসার। একলা কাম করি। ২০ হাজার ট্যাকা ঋণ নিয়া ঘর ঠিক করছি। সপ্তাহে মজুরি পাই ১৩১৫ ট্যাকা। এর মইধ্যে প্রতি সপ্তাহে ৭০০ টাকা ঋণের কিস্তি দেই। বাকি ট্যাকা দিয়া সংসার চালাইতে খুব কষ্ট হয়। জীবন শ্যাষ, দুক্ক আর ঘুচল না!’

সুমনকুমার দাশ, নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রথম আলো, সিলেট

দুঃখের উল্টো পিঠ

দুঃখই কি তবে চা-বাগানের বাসিন্দাদের একমাত্র পরিচয়? এতক্ষণ ধরে সঙ্গে থাকা চৌত্রিশ পেরোনো যুবক চঞ্চল বাকতিকে এ প্রশ্ন করলে তিনি তা মানতে নারাজ। লাক্কাতুরা চা-বাগানে স্টোর সামলানোর দায়িত্বে থাকা এই চা-শ্রমিক বলেন, মোটেই তা নয়। এখানে দুঃখের উল্টো পিঠে আনন্দও আছে। পূজা, উৎসব, পার্বণ, চা-চয়ন উৎসব প্রায়ই লেগে থাকে। কাঠিনৃত্য, ঝুমুর গান, কারাম উৎসব, চড়কপূজা—কত কী যে হয়! আর্থিক অনটনের মধ্যেও শ্রমিকেরা নিজেদের মতো করে সুখ খুঁজে নেন। চা-বাগানে এখনো পারিবারিক বন্ধন দৃঢ়। এখনো এখানে প্রায় সব কটিই যৌথ পরিবার। 

চঞ্চল চা-বাগানের স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। তারপর পাথরকোয়ারিতে কাজ নেন। পাশাপাশি একটি নৈশ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। কিন্তু কাজ আর পড়াশোনা একসঙ্গে চালিয়ে যেতে পারেননি। একসময় চা-বাগানের শ্রমিকের পেশাতেই থিতু হন। 

রাজু গোয়ালা বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সিলেট ভ্যালির কার্যকরী পরিষদের সভাপতি। তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম যে মাটিতে চা-শ্রমিকেরা বসবাস করছেন, এর ওপর তাঁদের কোনো অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাঁদের ঘর আছে, ভূমি নেই। তবে গত এক দশকে চা-জনগোষ্ঠীর অনেকেই উন্নত জীবনের আশায় পেশা বদল করছেন। 

রাজু গোয়ালার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরতে ফিরতে ভাবি, চা-বাগানেও বদলের হাওয়া লেগেছে। খুলেছে শিক্ষা ও পেশা বদলের নতুন দুয়ার। কেউ সেই দুয়ার পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, কেউ এখনো আটকে আছেন অভাব আর অনিশ্চয়তার পুরোনো বৃত্তে। টিলায় টিলায় ঊষামণিরা এখনো চা-পাতা তোলেন, সপ্তাহ শেষে মজুরির টাকা গুনে সংসারের হিসাব মেলান। ঋতু বদলায়, কচি পাতায় ভরে ওঠে চা-গাছ, সবুজে ঢেকে যায় টিলার পর টিলা। সেই সবুজ সৌন্দর্যের আড়ালে বয়ে চলে চা-শ্রমিকদের জীবনের গল্প। কোথাও না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস, কোথাও আবার ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন।

  • সুমনকুমার দাশ

    নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রথম আলো, সিলেট

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।