সম্বন্ধ গড়তে গড়তে ৩০ বছর পার করে দিলেন রংপুরের তারাগঞ্জের এশরা বেগম। দিয়েছেন চার শতাধিক বিয়ে। এই ঘটকের গল্প শোনাচ্ছেন রহিদুল মিয়া
তারাগঞ্জের ইকরচালী হাটে ভিড় বাড়ছে। পাশের হাইস্কুল মার্কেটের একটি কাপড়ের দোকানে বসে আছেন এশরা বেগম। হাতে কয়েকটি জীবনবৃত্তান্ত। পাশে বসা দুজনকে সেগুলো দেখাচ্ছেন। একজনের ছেলে বিয়ে করবেন, অন্যজন মেয়ের জন্য পাত্র খুঁজছেন। দুই পক্ষের চাহিদা মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন এশরা।
১৫ অক্টোবর সন্ধ্যা তখন। বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন সেই দুপুরে। ইকরচালী গ্রামের এক মেয়েকে হাজীরহাটের এক ছেলের দেখতে আসার কথা ছিল। ছেলেপক্ষের আসতে দেরি হলেও শেষ পর্যন্ত দেখা হয়েছে। দুই পক্ষেরই পরস্পরকে পছন্দ হয়েছে। এখন পরবর্তী আলোচনার অপেক্ষা।
হাটে আসা দুজনের বিষয়ে এশরা বলেন, ‘একজন ছেলের বউ খুঁজছে। তাকে দুজনের সিভি দেখালাম। পছন্দ হলে দুই পক্ষকে দেখানোর ব্যবস্থা করব।’
২৮ বছর ধরে এভাবেই এশরার দিন যাচ্ছে। পাত্র-পাত্রী খুঁজে দেওয়া, দুই পরিবারের মধ্যে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া, দেখাদেখির ব্যবস্থা করা—এসব করতে গিয়ে চার শতাধিক বিয়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের ৩০টি বিয়েও রয়েছে।

পাত্রী খুঁজতে গিয়ে
১৯৯৬ সালের দিকে একবার বাড়িতে এলেন তাঁর নন্দাই নজরুল ইসলাম। রংপুর শহরে কাপড়ের ব্যবসা করলেও ঘটক হিসেবে পরিচিত নজরুল। গ্রাম থেকে শহরের অনেক ছেলে–মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ করিয়ে দিয়েছেন। তিনিই এশরাকে রংপুরের মাহিগঞ্জের কাপড় ব্যবসায়ী রেজাউলের জন্য পাত্রী খোঁজার দায়িত্ব দেন।
বেশি দূর যেতে হলো না। পাশের গ্রাম উত্তরপাড়ায় বিজলী বেগমকে পাওয়া গেল। তাঁর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে বিয়ের প্রস্তাব দেন। দুই পক্ষের দেখাদেখি হলো। এক মাসের মধ্যে বিয়েও হয়ে গেল।
এশরা বলেন, ‘সেই বিয়ের পর নতুন শাড়ি উপহার পেয়েছিলাম।’
সেকাল–একাল
পরের চারটি ঘটকালিই কিন্তু ব্যর্থ হলো। পঞ্চম ঘটকালিতে সফল হওয়ার পর নিয়মিত এই কাজ শুরু করেন। একসময় আশপাশে পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ল। পাত্র-পাত্রী খুঁজতে মানুষ তাঁর কাছে আসতে শুরু করল। দীর্ঘ ২৮ বছরের ঘটকালিজীবনে কত পরিবারে যে বিয়ের সম্বন্ধ পাতিয়ে দিয়েছেন, তার হিসাবও রেখেছেন এশরা। চার শতাধিক বিয়ে দিয়েছেন তিনি। তবে তাঁর কাছে সংখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি করে দেওয়া।
তারাগঞ্জের সরকারপাড়া গ্রামের আসাবুদ্দিনের পরিবারের কথাই ধরা যাক। আসাবুদ্দিনের বিয়ের ঘটকালি করেছিলেন এশরা। পরে তাঁর মেয়ে আসমা বেগমের বিয়ের সম্বন্ধও তিনিই করিয়ে দেন। অর্থাৎ এক পরিবারের দুই প্রজন্মের বিয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন এশরা।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা তাঁর একটা নয়, যে পরিবারের মা-বাবার বিয়ে দিয়েছেন, পরে সেই পরিবারের সন্তানদের বিয়ের জন্যও ডাক পেয়েছেন। এটিই তাঁর কাছে বড় প্রাপ্তি।
এখন পাত্র-পাত্রী খোঁজার ধরন বদলেছে। এশরা বলেন, ‘এখন সবাই সৎ, কর্মজীবী ও সচ্ছল পরিবার খোঁজে। চাকরি থাকলে বেশি গুরুত্ব দেয়। বংশও দেখে, তবে কর্মসংস্থানটা ভালো করে দেখে।’
আগে পরিবারের বড়রা ছেলে পছন্দ করলেই বিয়ের আলোচনা এগোত। মেয়ের মতামত নেওয়ার চল ছিল কম। এখন সেই চিত্র বদলেছে। এশরার ভাষায়, ‘আগে বাবা, দাদা, মামারা ছেলে দেখে পছন্দ করলে বিয়ে হতো। এখন পরিবার পছন্দ করলেও মেয়ে পছন্দ না করলে বিয়ে হয় না। মেয়েদের পছন্দের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে।’

তবে মেয়েদের মতামতের গুরুত্ব বাড়ার পাশাপাশি ঘটকের কাজও বেড়েছে। দুই পক্ষের চাহিদা মেলানো, পাত্র-পাত্রীকে দেখানো এবং বিয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো—সবকিছুতেই আগের চেয়ে বেশি সময় দিতে হয়।
এশরার কদর কমেছে
ঘটকালি করতে গিয়ে কত অভিজ্ঞতা! কোনো কোনো বিয়ে অল্প চেষ্টাতেই সফল। আবার অনেক সম্বন্ধ শেষ পর্যন্ত ভেঙে গেছে। এর মধ্যে কিছু অভিজ্ঞতা তাঁকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তও করেছে।
২০২২ সালের কথা। করোনা মহামারির প্রভাব রয়ে গেছে। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত। এশরার আয়ও কমে গিয়েছিল। সেই সময় তারাগঞ্জের চিকলীপাড়ার এক মেয়ের জন্য পার্বতীপুরের ব্যবসায়ীর সম্বন্ধ করান। কয়েক দিন ধরে দুই পক্ষের দেখাদেখির ব্যবস্থা করেন। যাতায়াতের খরচও নিজের পকেট থেকে দেন। পরে দেনদরবার নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় বিয়ের আলোচনা ভেস্তে যায়।
কিন্তু এক মাস পর জানতে পারেন, দুই পক্ষ সরাসরি যোগাযোগ করে বিয়ে করে ফেলেছে। তাঁকে কিছু জানানো হয়নি, দেওয়া হয়নি কোনো সম্মানীও। এশরার হিসাবে, তখন নিজের পকেট থেকে প্রায় দুই হাজার টাকা খরচ হয়েছিল।
এমন অভিজ্ঞতা আরও হয়েছে। দুই পক্ষকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর অনেকে নিজেরাই যোগাযোগ করে বিয়ের আয়োজন করেন। ঘটককে আর পারিশ্রমিক দেন না। এশরা বলেন, ‘দুই পক্ষকে দেখালাম, তাদের পছন্দও হলো। পরে নিজেরাই আলাপ-আলোচনা করে বিয়ে ঠিক করে। আমাকে আর টাকা দেয় না। এমন বহু ঠকেছি।’
ফেসবুক ও মুঠোফোনের যুগে ঘটকালির কাজেও পরিবর্তন এসেছে। প্রেমের বিয়ে বেড়েছে, দুই পরিবার নিজেরাই যোগাযোগ করে বিয়ের আয়োজন করছে। এশরা মনে করেন, আগের মতো ঘটকের প্রয়োজন এখন আর নেই। তাঁর কথায়, ‘আগে ঘটক ছাড়া বিয়ে কল্পনাই করা যেত না। এখন সেই দিন হারিয়ে গেছে।’
ঘটকালি করে যেতে চান
জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী, ১৯৬০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তারাগঞ্জের মাটিয়ালপাড়া গ্রামে এশরার জন্ম। তবে নিজের প্রকৃত বয়স সম্পর্কে নিশ্চিত নন এশরা। মুক্তিযুদ্ধের আগেই তাঁর জন্ম হয়েছিল, সেটুকু মনে করতে পারেন।
মাত্র ১৫ বছর বয়সে পারিবারিকভাবে আলিমুদ্দিনের সঙ্গে বিয়ে হয়। ঘটকালি করেছিলেন তাঁর ফুফু। স্বামী আলিমুদ্দিন একসময় ভ্যান চালাতেন। তবে তাঁর ভ্যানটি চুরি হয়ে যায়। ধারদেনা করে কেনা ভ্যান হারানোর পর সংসারে আর্থিক টানাপোড়েন বেড়েছে। নিজেই দুই মেয়ে ও এক ছেলের বিয়ে দিয়েছেন এশরা। অবশ্য অন্য এক ঘটকের সহযোগিতা নিয়েছিলেন। বিয়ের পর সন্তানেরা এখন আলাদা সংসারে থাকেন।
এশরার ঘটকালি পেশা নিয়ে প্রথম দিকে এলাকার মানুষেরা কেউ কেউ কটূক্তি করতেন। কারণ, সাধারণত পুরুষেরাই এ কাজ করেন। তবে সময়ের সঙ্গে সেই মনোভাব বদলেছে। এখন এলাকার মানুষ তাঁকে সম্মান করেন, ভালোবাসেন।
অবশ্য এ পেশা থেকে আয় এখন আগের চেয়ে অনেক কম। এশরা বলেন, ‘ঘটকালির আয় দিয়ে এই যুগে সংসার চালানো কঠিন। মাসে একটা-দুইটা বিয়ে দেওয়াও দুষ্কর। বিয়ে হলে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু পরিশ্রম অনেক। কোনো কোনো দিন নিজের টাকা খরচ করতে হয়। আর দেখা করানোর পর পছন্দ হলে কেউ ৩০০ টাকা, কেউ ৫০০ টাকা দেয়।’
তবু এ কাজ করে আনন্দ পান এশরা। তাই কাজটা করে যেতে চান। তাঁর নিজের কথায়, ‘বেঁচে থাকার আগপর্যন্ত মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করে যেতে চাই।’
সূত্র: প্রথম আলো