গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:৪০ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:০৮ এএম

ক্যানভাসে ১৬ নদী, শিল্পের ভাষায় নদী বাঁচানোর বার্তা

বিনোদন
গণমাধ্যম ডেক্স
ক্যানভাসে ১৬ নদী, শিল্পের ভাষায় নদী বাঁচানোর বার্তা

নদী শুধু জলপ্রবাহ নয়, নদী মানুষের স্মৃতি, জীবন ও সভ্যতার নীরব সাক্ষী। কোথাও নদীর বুকে ভেসে বেড়ানো পুরোনো স্টিমার, লঞ্চ ও নৌকার স্মৃতি, কোথাও বাউলের গান, আবার কোথাও দখল-দূষণে বিপন্ন নদীর হাহাকার। এমন নানা অনুষঙ্গে ক্যানভাসে নদীর বহুমাত্রিক জীবন তুলে ধরেছেন চিত্রশিল্পী রাশিদ খান। রাজধানীর বনানীতে ঢাকা গ্যালারিতে চলছে তার একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘নদীলিপি: রিভার স্ক্রিপ্ট’। শিল্প-লেখক জাভেদ জলিলের কিউরেটোরিয়াল আয়োজনে ১৫ দিনব্যাপী এই প্রদর্শনীতে চিত্রকর্মের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে কবিতা, সংগীত, আলোকচিত্র ও নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন। প্রথাগত ফিতা কাটার আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই শুরু হওয়া প্রদর্শনীর প্রথম দিকে দর্শনার্থীর উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলেও ৬ নভেম্বর শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে গ্যালারিতে দেখা যায় চিত্রপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের ভিড়। গ্যালারির ছাদ থেকে ঝুলে থাকা তাম্রাভ জাল, ফিরোজা ও পলির উষ্ণ রঙে আঁকা ক্যানভাস এবং সাদা-কালো আঁচড়ের গতিময়তা দর্শকদের নিয়ে যায় নদীর এক ভিন্ন জগতে। প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে প্রায় ৬০টি চিত্রকর্ম। চিত্রা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, রূপসা, তিস্তা, ভৈরব, পায়রা, ধলেশ্বরী, তুরাগ, যমুনা, কপোতাক্ষ, মধুমতি, ধরলা, বুড়িগঙ্গা, হালদা ও পানগুছি, মোট ১৬টি নদীর বিভিন্ন সময়ের রূপ উঠে এসেছে এসব কাজে। দিনের আলো থেকে সন্ধ্যার ছায়া, নদীর নান্দনিকতা থেকে তার বিপন্ন অস্তিত্ব, নানা অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা প্রকাশ পেয়েছে শিল্পীর ক্যানভাসে। চিত্রকর্মগুলোতে অ্যাক্রিলিক অন ক্যানভাস, অ্যাক্রিলিক অয়েল ক্যানভাস, ওয়াটার অন পেপার, অ্যাক্রিলিক অন স্যান্ড পেপার, মিক্সড মিডিয়া, চারকোল অন ক্যানভাস ও পেন্সিল অন পেপারের মতো বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করেছেন রাশিদ খান। প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ নদীর অতীত ও বর্তমানের বৈপরীত্য। পুরোনো স্টিমার, লঞ্চ, নৌকা ও বাউলদের উপস্থিতি দর্শকদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় নদীকেন্দ্রিক জীবনের স্মৃতিময় সময়ে। অন্যদিকে বুড়িগঙ্গার চিত্রে উঠে এসেছে দখল, দূষণ, পলিথিন ও শিল্পবর্জ্যে বিপর্যস্ত এক নদীর বাস্তবতা। একসময় যে নদী ছিল প্রাণবন্ত জনজীবনের অংশ, আজ সেই নদীর পানিতে জমেছে বর্জ্য, ছড়িয়েছে দুর্গন্ধ। শিল্পীর ‘Turmoil: The Present River’ এবং ‘পলিথিনে রুদ্ধশ্বাস’ শীর্ষক চিত্রকর্মে ফুটে উঠেছে নদীর সেই বিপন্ন দশা। নদীর সৌন্দর্যের পাশাপাশি তার ক্ষত ও যন্ত্রণাকেও সামনে এনেছে এসব কাজ। নিজের শিল্পভাবনা প্রসঙ্গে রাশিদ খান বলেন, ‘আমাদের সবার ভেতরেই একটা নদী প্রবাহিত হচ্ছে। আমি আমার এই চিত্রকর্মের মাধ্যমে আমাদের সবার ভেতরের সেই অভ্যন্তরীণ নদীকেই ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি।’ তার মতে, নদী কেবল দেখার বা আঁকার বিষয় নয়। এটি এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি, যার মধ্য দিয়ে সময়, মানুষ, প্রকৃতি ও জীবনের পরিবর্তিত গল্প দেখা যায়। তাই প্রচলিত ল্যান্ডস্কেপের বাইরে গিয়ে নদীকে মানুষের স্মৃতি ও জীবনবোধের প্রতিচ্ছবি হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি। প্রদর্শনীর বিশেষ আয়োজন ‘নদী সুর’ ঘিরে ৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকা গ্যালারি পরিণত হয় সংগীত ও শিল্পের মিলনস্থলে। অনুষ্ঠানের শুরুতে বাঁশি বাজিয়ে চারটি ভিন্ন কম্পোজিশন পরিবেশন করেন তরুণ শিল্পী তপু। বেনারস থেকে চিত্রশিল্পে উচ্চতর পড়াশোনা শেষ করে আসা এই শিল্পী নদীকে কেন্দ্র করে নিজের সংগীতচর্চার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন। এরপর মঞ্চে আসেন মানিকগঞ্জের নদীপারের মানুষ বাউল সাধক শাহজাহান মুন্সী। ফেরি ও লঞ্চে চড়ে নদীকেন্দ্রিক জীবন কাটানো এই বাউল শিল্পীর গানে উঠে আসে নদীঘনিষ্ঠ মানুষের জীবনসংগ্রাম ও অভিজ্ঞতা। তার পরিবেশনা মুগ্ধ করে উপস্থিত দর্শকদের। অনুষ্ঠানে নদী নিয়ে নিজের দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী কাকলী প্রধান। নদী দখল ও ধ্বংসের চিত্র ধারণ করতে গিয়ে করপোরেট ও প্রভাবশালী মহলের বাধা এবং জীবনের ঝুঁকিতে পড়ার অভিজ্ঞতার কথা বলেন তিনি। কিউরেটর জাভেদ জলিলের সঙ্গে কথোপকথনে নদী নিয়ে তার বিভিন্ন আলোকচিত্র প্রকল্প এবং লঞ্চঘাটকেন্দ্রিক ফটোগ্রাফি প্রদর্শনীর অভিজ্ঞতাও ভাগ করে নেন। এ আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন চিত্রশিল্পী ও সংগীতশিল্পী সুমনা হক, ব্যান্ড চিরকুটের ভোকাল সুমি, সংগীতশিল্পী আলিফ এবং ফ্যাশন ডিজাইনার বিপ্লব সাহাসহ অনেকে। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে শিল্পী রাশিদ খানের বড় ভাই, স্থপতি জাহিদ আই খান ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে তাদের একসঙ্গে কাটানো দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেন। তিনি জানান, ক্যাডেট কলেজে পড়ার সময় তিনি সিনিয়র গ্রুপে ছবি আঁকায় প্রথম হতেন, আর রাশিদ জুনিয়র গ্রুপে প্রথম হতেন। পরবর্তী সময়ে তিনি স্থাপত্যকে পেশা হিসেবে বেছে নিলেও রাশিদ শিল্পচর্চা অব্যাহত রেখেছেন। ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পথে নদী দেখার স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, সেই সময়ের নদী দেখার অভিজ্ঞতা রাশিদের মনে কতটা গভীর প্রভাব ফেলেছিল, তা আজ তার চিত্রকর্ম ও প্রদর্শনী দেখেই উপলব্ধি করছেন। প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে বিশেষ আর্ট-পাবলিকেশন ‘নদীলিপি: দ্য রিভার স্ক্রিপ্টস হোয়ার দ্য রিভার স্পিকস’। ৩০০ টাকা মূল্যের এই প্রকাশনায় স্থান পেয়েছে রাশিদ খানের চিত্রকর্ম, তার নিজস্ব গীতকবিতা এবং কিউরেটর জাভেদ জলিলের শিল্পবিশ্লেষণ ও সাহিত্যিক অনুভব। ‘নদী দেখতে খুঁজে পাওয়া নদী!’ এবং ‘Sentience Rides’-এর মতো কবিতার সঙ্গে চিত্রকর্মের সংযোগ প্রকাশনাটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। জাভেদ জলিল এখানে কিউরেটোরিয়াল অনুসন্ধান, গ্রন্থনা ও লেখার দায়িত্ব পালন করেছেন। তার ভাষা ও শিল্পবিশ্লেষণ প্রতিটি চিত্রকর্মের অন্তর্নিহিত ভাবনাকে আরও গভীরভাবে অনুধাবনের সুযোগ তৈরি করেছে। প্রদর্শনীতে রাশিদ খানকে ‘দ্য অ্যানালগ ড্রিমার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি। ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে প্রদর্শনী আগামী ১৫ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ঢাকা গ্যালারিতে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে ‘নদীলিপি’। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টায় নদীকে কেন্দ্র করে থাকছে বিশেষ সাংস্কৃতিক আড্ডা ও অনুষ্ঠান। আয়োজনের সূচি অনুযায়ী, ৭ নভেম্বর ‘নদী সাহিত্য’, ৮ নভেম্বর ‘নদী কথা’, ৯ নভেম্বর ‘নদী সুর’, ১০ নভেম্বর বিশেষ আর্ট ওয়ার্কশপ ‘Art in Everyday Life’ এবং সন্ধ্যায় ‘নদী পাঠ’ অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া ১১ নভেম্বর ‘নদী কথা’, ১২ নভেম্বর ‘নদী গল্প’, ১৩ নভেম্বর ‘নদী সুর’ এবং ১৪ নভেম্বর ‘নদী পাঠ’ অনুষ্ঠিত হবে। ১৫ নভেম্বর ‘নদীলিপি’ শীর্ষক বিশেষ আড্ডার মধ্য দিয়ে শেষ হবে এই আয়োজন। চিত্রকর্ম, কবিতা, সংগীত ও আলোকচিত্রের সমন্বয়ে ‘নদীলিপি’ কেবল একটি চিত্রপ্রদর্শনী নয়, বরং নদীকে নতুন করে দেখার ও তার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অনুধাবনের একটি শিল্পিত প্রয়াস। নদীর সৌন্দর্য যেমন এখানে স্মৃতির রং হয়ে ধরা দিয়েছে, তেমনি তার বিপন্ন বর্তমানও দর্শকের সামনে তুলে ধরেছে জরুরি এক প্রশ্ন: যে নদী আমাদের জীবন ও সভ্যতার অংশ, সেই নদীকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমরা কতটা পালন করছি?

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।