গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:০৫ এএম

আমনের ফলন বাড়ছে, লাভে পিছিয়ে কৃষক

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
আমনের ফলন বাড়ছে, লাভে পিছিয়ে কৃষক

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার সন্তোষপুর ইউনিয়নের কৃষক নাজিম উদ্দিনের আমনখেতে ধান পাকতে শুরু করেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই ধান কাটবেন। এ জন্য নোয়াখালী থেকে শ্রমিক আনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে ভালো ফলনের আশা থাকলেও লাভ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। শ্রমিকের মজুরি, সারসহ অন্যান্য খরচ মিটিয়ে কত টাকা হাতে থাকবে, এখন সেই হিসাব মেলাতে হচ্ছে তাঁকে।

এবার প্রায় ৬৫ একর জমিতে আমন চাষ করেছেন নাজিম উদ্দিন। বেশির ভাগ জমিতে স্থানীয়ভাবে লেম্বু নামে পরিচিত ধান লাগিয়েছেন। রয়েছে রাজশাইল ও কালিজিরাও। তাঁর হিসাবে, ভালো ফলন হলে স্থানীয় কানিপ্রতি ৩০ থেকে ৩৫ মণ ধান পাওয়া যাবে।

নাজিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ধান কাটার আগেই প্রতি কানিতে প্রায় ২২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কাটার খরচ যোগ হলে ব্যয় দাঁড়াবে ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা। অথচ প্রতি মণ ধান বিক্রি হয় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায়। এ কারণে ভালো ফলন হলেও লাভ খুব বেশি হয় না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে, চলতি ২০২৬-২৭ মৌসুমে চট্টগ্রামে ১ লাখ ৮০ হাজার ৩৫২ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হচ্ছে। ব্রি ধান-৪৯, ৫১, ৫২, ৮৭ ও ১০৩-এর মতো উচ্চফলনশীল জাতের পাশাপাশি হাইব্রিড ধানও চাষ করছেন কৃষকেরা। রয়েছে ভারতীয় পাইজাম, নাজিরশাইল, কালিজিরা, কুমড়া বৈলাম, বিন্নিসহ বিভিন্ন স্থানীয় ও প্রচলিত জাত।

চট্টগ্রামে পাঁচ বছরে আমনের আবাদ কিছুটা কমলেও উৎপাদন বেড়েছে ২০ হাজার টনের বেশি। উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের বিস্তারে ফলন বাড়ছে। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচের তুলনায় ধানের দাম কম হওয়ায় কৃষকের লাভ সীমিত থাকছে। বেশি লাভের আশায় কেউ কেউ সবজি চাষের দিকেও ঝুঁকছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে, চলতি ২০২৬-২৭ মৌসুমে চট্টগ্রামে ১ লাখ ৮০ হাজার ৩৫২ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হচ্ছে। ব্রি ধান-৪৯, ৫১, ৫২, ৮৭ ও ১০৩-এর মতো উচ্চফলনশীল জাতের পাশাপাশি হাইব্রিড ধানও চাষ করছেন কৃষকেরা। রয়েছে ভারতীয় পাইজাম, নাজিরশাইল, কালিজিরা, কুমড়া বৈলাম, বিন্নিসহ বিভিন্ন স্থানীয় ও প্রচলিত জাত।

খরচ বাড়ছে, লাভ সীমিত

নাজিম উদ্দিনের হিসাবে, ধান কাটার একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৮০০ টাকা। সঙ্গে তিন বেলা খাবার দিতে হয়। সব মিলিয়ে খরচ পড়ে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। শ্রমিকের এই বাড়তি মজুরি উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে।

তাঁর প্রত্যাশিত ফলন ও বিক্রয়মূল্য ধরে স্থানীয় কানিপ্রতি আয় হতে পারে ৩০ হাজার থেকে ৩৮ হাজার ৫০০ টাকা। সম্ভাব্য খরচ বাদ দিলে সর্বোচ্চ সাড়ে ১০ হাজার টাকা অবশিষ্ট থাকতে পারে। তবে ফলন ও দাম কম হলে লাভ প্রায় থাকবে না।

—আপ্রু মারমা, উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর–চট্টগ্রাম।আমন চাষের পর ফলন পেতে সাড়ে তিন থেকে চার মাস লাগে। অন্যদিকে অনেক সবজি চাষ করে দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে আয় শুরু করা যায়। এ কারণে কৃষকেরা সবজির দিকে ঝুঁকছেন।

সার সংগ্রহেও ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন নাজিম উদ্দিন। তাঁর অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে অন্য ডিলারের কাছ থেকে কিনতে হয়েছে। সরকারি ব্যবস্থায় ধান বিক্রির সুযোগ না পাওয়ায় ব্যবসায়ীদের কাছেই বিক্রি করতে হয় তাঁকে।

বাঁশখালীর সাধনপুরের কৃষক আবদুল হাকিম গত মৌসুমে প্রতি মণ ধান গড়ে এক হাজার টাকায় বিক্রি করেছিলেন। খরচ বাদ দিয়ে লাভ হয়েছিল পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। এবার দুই কানি জমিতে ব্রি ধান-৮৭ চাষ করেছেন। ভালো ফলনের আশা করছেন। তবে ধানের দাম নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। চন্দনাইশের কৃষক মোতালেব ইসলামও গত মৌসুমে প্রতি মণ ধান এক হাজার টাকায় বিক্রি করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, ধানের দাম সেভাবে বাড়ছে না।

কৃষি কর্মকর্তাদের হিসাবে, চট্টগ্রামের প্রচলিত ৪০ শতকের এক কানি জমিতে আমন চাষে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা খরচ হয়। ভালো ফলন হলে ধান পাওয়া যায় প্রায় ২৫ মণ। প্রতি মণ এক হাজার টাকায় বিক্রি করলে আয় দাঁড়ায় ২৫ হাজার টাকা। খরচ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট থাকে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। তবে জমির ভাড়া ও নিজস্ব শ্রমের মূল্য হিসাবে থাকলে প্রকৃত লাভ আরও কম হতে পারে।

সবজিতে ঝোঁক

ধানের তুলনায় সবজি চাষে বেশি লাভের কথা জানিয়েছেন কৃষকেরা। তাঁদের হিসাবে, সমপরিমাণ পরিশ্রমে সবজি চাষে প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেশি লাভ হতে পারে। বিশেষ করে আগাম শীতকালীন সবজি বাজারে তুলতে পারলে ভালো দাম পাওয়া যায়।

চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আপ্রু মারমা প্রথম আলোকে বলেন, আমন চাষের পর ফলন পেতে সাড়ে তিন থেকে চার মাস লাগে। অন্যদিকে অনেক সবজি চাষ করে দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে আয় শুরু করা যায়। এ কারণে কৃষকেরা সবজির দিকে ঝুঁকছেন।

তবে আমন চাষের কিছু সুবিধাও রয়েছে। বর্ষার বৃষ্টিতে পানির চাহিদার বড় অংশ পূরণ হওয়ায় সেচের প্রয়োজন তুলনামূলক কম। অনেক সবজির তুলনায় নিয়মিত পরিচর্যাও কম লাগে। ফলে লাভ সীমিত হলেও কৃষকেরা আমন চাষ ধরে রেখেছেন বলে জানান কৃষি কর্মকর্তারা।

পাঁচ বছরে উৎপাদন বেড়েছে ৪ শতাংশ

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২১-২২ অর্থবছরে চট্টগ্রামে ১ লাখ ৮২ হাজার ৬৭১ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছিল। উৎপাদন হয়েছিল ৫ লাখ ১০ হাজার ২২৯ টন। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবাদ কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮০৯ হেক্টরে। অথচ উৎপাদন বেড়ে হয় প্রায় ৫ লাখ ৩০ হাজার ৬২৬ টন। অর্থাৎ পাঁচ বছরে আবাদ কমেছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ, উৎপাদন বেড়েছে ৪ শতাংশ। একই সময়ে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ২ দশমিক ৭৯ টন থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৯৫ টনে পৌঁছেছে। তবে উৎপাদন প্রতিবছর বাড়েনি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন কমে প্রায় ৪ লাখ ৯৭ হাজার টনে নেমেছিল। পরের অর্থবছরে আবাদ বেড়েছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, উৎপাদন বেড়েছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. আতিক উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ব্রি ধান-৮৭ ও ১০৩-এর মতো উচ্চফলনশীল জাতের পাশাপাশি হাইব্রিড ধানের আবাদ বেড়েছে। এসব জাতের উৎপাদনক্ষমতা বেশি হওয়ায় জমি কিছুটা কমলেও মোট উৎপাদন বেড়েছে। তবে কৃষি বিভাগের কর্মপরিকল্পনায় শিল্পকারখানা, ইটভাটা ও বসতবাড়ি নির্মাণে আবাদি জমি কমা, সেচসংকট ও লবণাক্ততাকে কৃষির সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জেলায় ৩৬ হাজার হেক্টরের বেশি লবণাক্ত জমি রয়েছে।

লাভ বাড়াতে করণীয়

কৃষকের লাভ বাড়াতে ন্যায্য দাম নিশ্চিত ও উৎপাদন খরচ কমানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশেষ করে যন্ত্রের মাধ্যমে ধান কাটার সুযোগ বাড়ালে শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, হাতে কাটার তুলনায় কম্বাইন হারভেস্টারে ধান কাটার খরচ প্রায় ৫৮ শতাংশ কমে।

ধানের বিক্রয়মূল্য বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে। ২০২৫-২৬ আমন মৌসুমে সরকার প্রতি মণ ধানের সংগ্রহমূল্য নির্ধারণ করেছিল ১ হাজার ৩৬০ টাকা। অথচ চট্টগ্রামের কয়েকজন কৃষক গত মৌসুমে প্রতি মণ ধান বিক্রি করেছেন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায়। সরকারি সংগ্রহমূল্যের তুলনায় এই দাম ২৬০ থেকে ৩৬০ টাকা কম। কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সরাসরি সরকারি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ বাড়ানো, সময়মতো সার ও মানসম্মত বীজ সরবরাহ এবং আধুনিক যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে খরচ কমানো গেলে উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল কৃষকের কাছে আরও বেশি পৌঁছাতে পারে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।