ইদানীং সন্ধ্যায় আলো জ্বেলে কাজ করতে গেলে ছোট কিছু পোকার দেখা মিলছে। আলোর আশপাশে উড়ছে ছোট ছোট সবুজ পোকা। সন্ধ্যা হলেই জানালার কাচ, দেয়াল কিংবা বাতির চারপাশে জড়ো হচ্ছে এমন অনেক পোকা। উড়ে এসে গায়ে বসছে। কখনো আবার কামড়েও দিচ্ছে।

কার্তিক মাসের দিকে গ্রিন লিফহপারের আনাগোনা বেড়ে যায়। স্থানীয়ভাবে অনেকে এদের শ্যামা পোকা বলেন। তবে পোকাটির ইংরেজি নাম গ্রিন লিফহপার বা সবুজ পাতা ফড়িং।
গ্রিন লিফহপার আসলে কী?
গ্রিন লিফহপার ছোট, সবুজ রঙের একধরনের পোকা। এদের শরীর সাধারণত সরু ও কিছুটা ত্রিকোণাকৃতি। গাছের পাতা ও কাণ্ডে বসে এরা খাবার খায়। মুখের অংশ অনেকটা সরু সুচের মতো। এই অংশ দিয়ে গাছের কোষ ফুটা করে ভেতর থেকে রস শুষে খায়। তবে গ্রিন লিফহপার বলতে একটিমাত্র প্রজাতিকে বোঝায় না। এই নামে কাছাকাছি বৈশিষ্ট্যের একাধিক প্রজাতির পোকা আছে।

বাংলাদেশেও ধানখেতের পোকা নিয়ে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত চালানো একটি গবেষণায় ১০ প্রজাতির লিফহপার ও ৫ প্রজাতির প্ল্যান্টহপারের সন্ধান পাওয়া গেছে। তাই শুধু সবুজ রং বা আকার দেখে কোনো পোকাকে নির্দিষ্ট প্রজাতির বলে চিহ্নিত করা কঠিন। গ্রিন লিফহপার ধানের ক্ষতিকর পোকা হিসেবে পরিচিত। ধানগাছের রস শুষে খাওয়ার পাশাপাশি কিছু প্রজাতি ধানে টুংরো ভাইরাস ছড়াতেও ভূমিকা রাখে। ফলে আক্রান্ত গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে, কমে যেতে পারে ফলন।
আলো দেখলেই ঘরে আসে কেন?
গ্রিন লিফহপারসহ অনেক উড়ন্ত পোকাকে রাতে কৃত্রিম আলোর আশপাশে ঘুরতে দেখা যায়। ঘরের বাতি, রাস্তার বাতি কিংবা দোকানের উজ্জ্বল আলো এদের স্বাভাবিক চলাচলে প্রভাব ফেলে। তবে পোকাগুলো সব সময় সরাসরি আলোর দিকে ছুটে আসে না।
২০২৪ সালে ‘নেচার কমিউনিকেশন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা উচ্চগতির ক্যামেরা ও ত্রিমাত্রিক গতিপথ বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন পোকাকে কৃত্রিম আলোর আশপাশে উড়িয়ে দেখেছেন। গবেষণায় দেখা যায়, অনেক পোকা আলোর দিকে পিঠ ঘুরিয়ে রাখার চেষ্টা করে।
প্রাকৃতিক পরিবেশে আকাশ সাধারণত চারপাশের তুলনায় বেশি উজ্জ্বল থাকে। অনেক উড়ন্ত পোকা আকাশের উজ্জ্বল অংশকে ওপরের দিক বোঝার সংকেত হিসেবে ব্যবহার করে। এতে উড়তে গিয়ে শরীরের ভারসাম্য ঠিক রাখা সহজ হয়। বিজ্ঞানীরা এই আচরণকে বলেন ডরসাল লাইট রেসপন্স।
সহজভাবে বললে, শরীরের পিঠকে সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকের দিকে রাখার প্রবণতা। কিন্তু রাতে ঘরের বাতি বা রাস্তার আলো এই স্বাভাবিক সংকেতকে বিভ্রান্ত করতে পারে। পোকা তখন আলোকে ওপরের দিক ভেবে শরীর ঘোরাতে থাকে। ফলে সোজা পথে উড়ে চলে যাওয়ার বদলে আলোর চারপাশে ঘুরপাক খায়। কখনো একই জায়গায় বারবার চক্কর দিতে থাকে।
কার্তিক মাসে এত বেশি দেখা যায় কেন?
কার্তিক মাসে গ্রিন লিফহপার বেশি দেখা যাওয়ার পেছনে ঋতু পরিবর্তন ও ধানখেতের অবস্থার ভূমিকা থাকতে পারে। এ সময় আমন ধান পাকে। ধানগাছের পাতা ও কাণ্ড থেকে রস শুষে খাওয়া সবুজ পাতা ফড়িংয়ের জন্য ধানখেত গুরুত্বপূর্ণ খাবারের উৎস। বাংলাদেশের গাজীপুরে ছয় বছর ধরে চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, সবুজ পাতা ফড়িংয়ের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি ছিল অক্টোবর মাসে, এরপর নভেম্বরে।
তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও বাতাসের আর্দ্রতাও এদের সংখ্যা ওঠানামায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কার্তিক মাসে এরা সবাই একসঙ্গে ডিম পাড়ে বলেই সংখ্যা বেড়ে যায়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ কম। প্রজাতিভেদে এদের প্রজনন ও জীবনচক্র আলাদা। আবার ধানখেতে পোকা বাড়লে বাসাবাড়িতে পোকা বেশি দেখা যাবে, সব সময় এমন ঘটনা ঘটে না।

গ্রিন লিফহপার কি মানুষকে কামড়ায়?
গ্রিন লিফহপার মানুষের রক্ত খায় না। এদের মুখের অংশ মূলত গাছের কোষ ছিদ্র করে রস শুষে নেওয়ার জন্য তৈরি। তাই মশা বা ছারপোকার মতো মানুষকে কামড়ে রক্ত খাওয়ার জন্য এরা আসে না। কিছু প্রজাতির লিফহপার ভুল করে মানুষের ত্বকে মুখের অংশ ফুটিয়ে দিতে পারে। ২০১৩ সালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনামূলক গবেষণায় মানুষের ত্বকে এভাবে খোঁচা দেওয়া বা কামড়ানোর ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন দেশের পর্যবেক্ষণ একত্র করা হয়েছে। গবেষণায় অন্তত ৩৯ প্রজাতির লিফহপারের এমন আচরণের তথ্য পাওয়া যায়। এরা গায়ে বসলে কখনো সুচ ফোটার মতো ব্যথা বা হঠাৎ খোঁচা লাগার অনুভূতি হতে পারে।
কারও ক্ষেত্রে সাময়িক অস্বস্তিও তৈরি হতে পারে। তবে এরা মানুষের রক্ত খায় না এবং সাধারণভাবে মানুষের জন্য বিপজ্জনক পোকা হিসেবে পরিচিত নয়। কোনো পোকা গায়ে বসলে হাত দিয়ে ঝাপটা মেরে সরানোর বদলে আলতোভাবে সরিয়ে দেওয়াই ভালো। কামড়ানোর মতো অনুভূতি হলে জায়গাটি সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে নেওয়া যেতে পারে। অস্বস্তি থাকলে ঠান্ডা সেঁক দেওয়া যেতে পারে। তীব্র ফোলা, শ্বাসকষ্ট বা শরীরের অন্য কোথাও অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
ঘর থেকে তাড়াবেন যেভাবে
গ্রিন লিফহপার ঘরে ঢোকা ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় দরজা-জানালা বন্ধ রাখা। জানালায় সূক্ষ্ম জাল বা নেটও লাগানো যায়। সন্ধ্যার সময় আলো জ্বালালে দরজা–জানালা বন্ধ করে রাখা যায়।
ঘরের বাইরের দিককার দরজা বা জানালার একেবারে কাছে উজ্জ্বল বাতি না রাখলে এই পোকার আক্রমণ থেকে বাঁচা যায়। জানালার কিছুটা দূরে রাখা, অপ্রয়োজনীয় বাতি বন্ধ রাখাও কাজে আসতে পারে। এতে সব পোকা আসা বন্ধ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
আলোর রং বদলালেই গ্রিন লিফহপার আর আসবে না, এমন ধারণারও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। বিভিন্ন প্রজাতির পোকা আলোর রং ও তীব্রতায় ভিন্নভাবে সাড়া দিতে পারে। তাই শুধু বাতির রং বদলানোর চেয়ে অপ্রয়োজনীয় আলো কমানো এবং দরজা-জানালা সুরক্ষিত রাখাই বেশি বাস্তবসম্মত।
ঘরে পোকা ঢুকে পড়লে মেরে ফেলার প্রয়োজন নেই। জানালা বা দরজা খুলে ঘরের বাতি নিভিয়ে বাইরের দিকে আলো জ্বেলে দিন। পোকাগুলো বাইরে যাওয়ার সুযোগ পাবে। দেয়াল বা মেঝেতে বসে থাকলে কাগজ কিংবা ছোট পাত্রের সাহায্যে ধরে বাইরে ছেড়ে দেওয়া যায়। ঘরের মধ্যে কীটনাশক ছিটিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ইন্টারনেটে গ্রিন লিফহপার তাড়ানোর জন্য লেবু, মরিচ, কর্পূর কিংবা নানা ধরনের তেলের মিশ্রণ ব্যবহারের পরামর্শ পাওয়া যায়। কিন্তু এসব উপাদান ঘর থেকে পোকা দূরে রাখে, এমন প্রমাণ নেই। বরং কর্পূর বা অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ ভুলভাবে ব্যবহার করলে মানুষের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সূত্র: প্রথম আলো