নিজের শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে দুর্বলতা নয়, বরং শক্তিতে পরিণত করেছেন। তিনি লিজি ভেলাস্কেজ, যাঁর জীবন আজ বিশ্বজুড়ে আত্মবিশ্বাস, সাহস ও সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক অনন্য উদাহরণ।
পৃথিবীর সবচেয়ে কুৎসিত নারী! এমন একটি শিরোনাম দিয়ে ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁর ছবি। ভিডিওটির নিচে জমেছিল হাজার হাজার কটূক্তি, বিদ্রূপ আর অপমানজনক মন্তব্য। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৭ বছর। চাইলে সেই অপমান তাঁকে ভেঙে দিতে পারত। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন অন্য পথ। নিজের শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে দুর্বলতা নয়, বরং শক্তিতে পরিণত করেছেন। তিনি লিজি ভেলাস্কেজ, যাঁর জীবন আজ বিশ্বজুড়ে আত্মবিশ্বাস, সাহস ও সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক অনন্য উদাহরণ।

১৯৮৯ সালের ১৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের অস্টিনে জন্ম লিজির। তাঁর পুরো নাম এলিজাবেথ অ্যান ভেলাস্কেজ। জন্মের সময় তাঁর ওজন ছিল মাত্র প্রায় ১ দশমিক ২ কেজি। চিকিৎসকেরা তখনই বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর শারীরিক অবস্থা অন্য শিশুদের মতো নয়। তিনি আক্রান্ত এক অত্যন্ত বিরল জিনগত রোগে, যা নিয়নেটাল প্রোজেরয়েড সিনড্রোম বা মারফানয়েড-প্রোজেরয়েড-লিপোডিস্ট্রফি সিনড্রোম নামে পরিচিত।
এই রোগের কারণে তাঁর শরীরে স্বাভাবিকভাবে চর্বি জমে না। ফলে পর্যাপ্ত খাবার খেলেও তাঁর ওজন বাড়ে না। শরীরের প্রয়োজন মেটাতে তাঁকে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার ক্যালরি গ্রহণ করতে হয়। এ ছাড়া ডান চোখে তিনি দেখতে পান না, অন্য চোখেও দৃষ্টিশক্তি সীমিত। তবে এসব শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনোই তাঁর জীবনকে আটকে রাখতে পারেনি।

একটি ভাইরাল ভিডিও বদলে দিল জীবনের লক্ষ্য
২০০৬ সালে একদিন ইউটিউবে নিজের একটি ভিডিও দেখতে পান লিজি। ভিডিওটির শিরোনাম ছিল 'দ্য ওয়ার্লডস আগলিয়েস্ট উয়োম্যান'। ভিডিওটি কোনো অনুমতি ছাড়াই তাঁকে নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। লাখ লাখ মানুষ সেটি দেখছিলেন। কেউ তাঁর চেহারা নিয়ে হাসাহাসি করছিলেন, কেউ লিখছিলেন তাঁকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত। এমনকি অনেকে তাঁর বাবা-মাকেও দোষারোপ করেছিলেন।

মাত্র ১৭ বছরের একজন কিশোরীর জন্য ঘটনাটি ছিল ভয়াবহ মানসিক আঘাত। কিন্তু লিজি সিদ্ধান্ত নেন, অন্যের নেতিবাচক মন্তব্য তাঁর পরিচয় নির্ধারণ করবে না। তিনি নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং টেক্সাস স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে যোগাযোগ বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
অপমানকে শক্তিতে পরিণত করা
২০১৩ সালে তাঁর টেড এক্স বক্তৃতা হাউ ডু ইউ ডিফাইন ইয়োরসেলফ বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেখানে তিনি বলেন, মানুষ তাঁকে কীভাবে দেখে, সেটি তাঁর নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু নিজের জীবনকে কীভাবে দেখবেন এবং কীভাবে এগিয়ে যাবেন, সেই সিদ্ধান্ত তাঁর নিজের।

বক্তৃতায় তিনি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আত্মপরিচয়, আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক মানসিকতার গুরুত্ব বোঝান। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, নিজের সীমাবদ্ধতা কিংবা অন্যের নেতিবাচক মন্তব্য দিয়ে নিজেকে বিচার করা উচিত নয়। বরং নিজের লক্ষ্য ও কাজের মধ্য দিয়েই পরিচয় তৈরি করতে হবে।
এরপর থেকে লিজি হয়ে ওঠেন বুলিং ও সাইবার বুলিংবিরোধী আন্দোলনের পরিচিত মুখ। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়ে তিনি তরুণদের সাহস জোগান। বিশেষ করে অনলাইনে কাউকে চেহারা, শারীরিক গঠন কিংবা ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে অপমান না করার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করেন।

বই, সিনেমা ও নতুন পরিচয়
নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে একাধিক বই লিখেছেন লিজি। এর মধ্যে লিজি বিউটিফুল, চুজিং হ্যাপিনেস, বি বিউটিফুল বি ইউ ও ডেয়ার টু বি কাইন্ড উল্লেখযোগ্য। তাঁর বইগুলোতে আত্মমর্যাদা, সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণা, সহমর্মিতা ও নিজের প্রতি ভালোবাসার কথা উঠে এসেছে। ২০১৫ সালে মুক্তি পায় তাঁকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র আ ব্রেভ হার্ট: দ্য লিজি ভেলাস্কেজ স্টোরি। এতে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সংগ্রাম, সাইবার বুলিংয়ের অভিজ্ঞতা এবং সেই অভিজ্ঞতাকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার গল্প তুলে ধরা হয়েছে।

লিজির জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সৌন্দর্য কোনো নির্দিষ্ট চেহারা বা শারীরিক গঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে যেখানে একটি ছবি বা মন্তব্য মুহূর্তেই কাউকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে, সেখানে তাঁর গল্প আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। অন্যকে ছোট করে আনন্দ পাওয়ার বদলে সহমর্মিতা দেখানোই যে প্রকৃত মানবিকতা, লিজি ভেলাস্কেজের জীবন তারই উদাহরণ। তিনি শুধু নিজের জন্য লড়েননি, তাঁর মতো পরিস্থিতির শিকার অসংখ্য মানুষের জন্যও সাহসের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
সূত্র: ফোর্বস, দ্য মিলেনিয়াল জার্নাল
ছবি: ইন্সটাগ্রাম
সূত্র: প্রথম আলো