প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:০৩ পিএম || প্রকাশের তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম
দুবারের আলট্রাসনোগ্রামে যমজ সন্তান বললেও সিজারের পর একজন দেওয়ার ঘটনায় ওয়ার্ডবয়কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার (৭ নভেম্বর) সকালে জিহাদ হোসেন নামের ওই ওয়ার্ডবয়কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার জিহাদ হোসেন নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার মুসকিপুর গ্রামের আজাদুল ইসলামের ছেলে।
নওগাঁর বদলগাছীর বাসিন্দা শান্তনা আক্তার ও শান্ত ইসলাম দম্পতিকে দুবারের আলট্রাসনোগ্রাম প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, গর্ভে যমজ সন্তান। সেই প্রত্যাশা নিয়েই বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নওগাঁর একটি বেসরকারি ক্লিনিকে সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করেন শান্তনা।
কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি কন্যাশিশু। অপর সন্তানটির কী হয়েছে, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে শুরু হয় উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও সমঝোতার চেষ্টা। একপর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী গৃহবধূর স্বামী শান্ত ইসলাম।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, অপর নবজাতকের সন্ধান চাইলে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ সন্তোষজনক জবাব না দিয়ে আর্থিক প্রস্তাব দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।
ভুক্তভোগী শান্ত ইসলামের দাবি, গত ১২ ও ২১ অক্টোবর পৃথক দুটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করা আলট্রাসনোগ্রামের উভয় প্রতিবেদনেই তার স্ত্রীর গর্ভে দুটি জীবিত ভ্রূণের উপস্থিতির কথা উল্লেখ ছিল। প্রথমে জয়পুরহাটের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করানো হয়। পরে নওগাঁ শহরের রি-লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও আলট্রাসনোগ্রাম করানো হলে সেখানেও যমজ সন্তানের কথা জানানো হয়।
শান্ত ইসলাম বলেন, চিকিৎসক ডা. মাহফুজা খাতুন যমজ সন্তান থাকার কারণে সিজার করানোর পরামর্শ দেন। তার পরামর্শেই বৃহস্পতিবার বিকেলে স্ত্রীকে বলাকা ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়। পরে ওই চিকিৎসকের অধীনে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করেন শান্তনা। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর একটি কন্যাশিশু হস্তান্তর করা হলেও অপর সন্তানটির বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, অপর সন্তান কোথায়, জানতে চাইলে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ কোনো সদুত্তর দেয়নি। উল্টো বিষয়টি ধামাচাপা দিতে আমাকে আর্থিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আমি আমার অপর সন্তানের সন্ধান চাই। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
শান্তনার অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের পর তাকে শুধু একটি শিশুই দেখানো হয়। বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের জানালে তারা প্রতিবাদ শুরু করেন। এ সময় তার পেটের অস্ত্রোপচারের কাটা অংশ সেলাই না করে প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট ফেলে রাখা হয়।
শান্তনা বলেন, পরিবারের সদস্যরা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করলে তারা আমার পেটের কাটা অংশ সেলাই না করে ফেলে রাখে। এ সময় মোবাইল ফোনে ভিডিও করে বলে, তাদের কথা না শুনলে এ অবস্থায় রেখেই চলে যাবে। পরে শরীরে কাঁপুনি শুরু হলে আমি বলি, আপনাদের সব কথা শুনব, আগে পেটের সেলাই করেন। এরপর চিকিৎসক আমার সঙ্গে রাগারাগি ও হুমকি-ধমকি দিয়ে ভিডিও ধারণ করেন। পরে পেটের কাটা অংশ সেলাই করা হয়। আমি আমার দুই সন্তানকেই চাই। আমার আরেক সন্তান কোথায়, তা জানতে চাই।
রি-লাইফ ক্লিনিকে আলট্রাসনোগ্রাম করা চিকিৎসক দিনা বলেন, আমি ওনার লাস্ট একটা আলট্রা করেছিলাম। আমার মেশিনে যেভাবে দেখানো হয়েছে, আমি সেটাই রোগীকে বলেছি। হয়তোবা ভুল হতে পারে। কারণ অনেক সময় মেশিনে মাথা ডাবল দেখা যায়, আর এ কারণে আমি বলেছিলাম। আর ওটিতে যেহেতু একটা বেবি হয়েছে, কাজেই আমার মেশিনে ভুল হতে পারে।
রি-লাইফ ডায়াগনস্টিকের মালিক শরিফুল বলেন, আমার কোনো ভুল বা দোষ নেই। এখানে ডা. মাহফুজার নির্দেশনায় ডা. দিনা আলট্রা করেছে। ডা. দিনা টুইন বেবির রিপোর্ট দিয়েছে। কিন্তু সিজারের পর জানতে পারলাম একটা বেবি হয়েছে। এখন এটা নিয়ে রোগীদের দ্বিধামত আসলে রিপোর্ট নাকি অপারেশন কোনটা সঠিক? আর আলট্রা রিপোর্টই একমাত্র ডাক্তার করেন। সেক্ষেত্রে আলট্রার রিপোর্ট সঠিক কি না সেটা ডাক্তারই জবাব দেবে। তবে আমি যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে ক্লিনিক পরিচালনা করছি এবং ডাক্তার নিয়োগ দিয়েছি।
বলাকা ক্লিনিকের মালিক এনামুল হক বলেন, ‘ডা. মাহফুজা খাতুনের পরামর্শেই ওই নারীকে আমার ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছিল। তিনিই নিজে অস্ত্রোপচার করেছেন। এর আগে তার নির্দেশেই রি-লাইফ ক্লিনিকে দিনা নামের এক ডাক্তার আলট্রাসনোগ্রাম করেছে। আমার এখানে শুধু অপারেশন করা হয়েছে। অপারেশনের পর সন্তান হাতে দেওয়ার সবকিছু সিসি ক্যামেরায় রেকর্ড আছে। পুলিশ এসে দেখে গিয়েছে।
সমঝোতার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, রোগীর স্বজনরাই আমাকে রি-লাইফে নিয়ে গিয়েছিল এবং দুই লাখ টাকা চেয়েছিল। আমি সেখানে উপস্থিত সবার সামনে তাদেরকে বলেছিলাম, সিজারের টাকা রি-লাইফ বহন করবে। কিন্তু রোগীর স্বজনরা শোনেননি। আর ডাক্তার দিনার কথাবার্তা তেমন ভালো না। এখানে আমার কোনো গাফিলতি বা দোষ নেই।
অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. মাহফুজা খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের কোনো বক্তব্য দেননি।
নওগাঁ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিন্টু রহমান বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে। এ ঘটনায় আটজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলার পর একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারের জন্যও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স