গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:৩৪ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০১ জানুয়ারি, ১৯৭০, ০৬:০০ এএম

স্তন ক্যানসার মোকাবিলায় বাংলাদেশ: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
স্তন ক্যানসার মোকাবিলায় বাংলাদেশ: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

বিশ্বজুড়ে নারীদের স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে স্তন ক্যানসার অন্যতম। আন্তর্জাতিক সংস্থা IARC-এর GLOBOCAN 2024-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ২৪ লাখ ৩৪ হাজার নারী নতুন করে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৬ লাখ ৯৪ হাজার নারীর মৃত্যু হয়। গত কয়েক দশকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে স্তন ক্যানসারের প্রকোপ বেড়েছে। নগরায়ণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রজননগত পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং জনসংখ্যার বয়স বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো এ প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০-২০১০ সময়কালে বাংলাদেশে নগরায়ণের হার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্প ও সেবানির্ভর অর্থনীতির সম্প্রসারণ, নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে স্তন ক্যানসার মোকাবিলায় নগরায়ণের সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকি ও স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য বোঝা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ জনসংখ্যাভিত্তিক জাতীয় ক্যানসার রেজিস্ট্রি না থাকায় স্তন ক্যানসারের প্রকৃত প্রকোপ ও মৃত্যুহার নির্ভুলভাবে নিরূপণ করা কঠিন। তবে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (NICRH) ২০২৫ সালের হাসপাতালভিত্তিক ক্যানসার রেজিস্ট্রি অনুযায়ী, নিবন্ধিত নারী ক্যানসার রোগীদের মধ্যে স্তন ক্যানসারের অনুপাত ছিল প্রায় ২৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

স্তন ক্যানসারের নগরায়ণের প্রভাব: গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জনস্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। মানুষের আয়ু বৃদ্ধি, নগরজীবনের বিস্তার, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং নারীদের প্রজনন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে পরিবর্তন দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করেছে। এসব পরিবর্তনের কিছু স্তন ক্যানসারের স্বীকৃত ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক পরিবর্তনকে এককভাবে স্তন ক্যানসার বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

১. জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও অতিরিক্ত ওজন: প্রযুক্তি, অনলাইন কার্যক্রম এবং ডেস্কভিত্তিক কাজের প্রসারের ফলে অনেক মানুষের দৈনন্দিন শারীরিক কর্মকাণ্ড কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশে অফিসকর্মীদের প্রায় ৫৬ শতাংশ শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় এবং তারা দৈনিক গড়ে ১০.৯ ঘণ্টা বসে বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় কাটান বলে কিছু গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি, ফাস্ট ফুড গ্রহণ ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার প্রবণতা বাড়াতে পারে। কিছু প্রতিবেদনে শহরাঞ্চলের প্রায় ৩৪ শতাংশ নারীর স্থূলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা, বিশেষত মেনোপজের পর, স্তন ক্যানসারের একটি স্বীকৃত ঝুঁকির কারণ। কিছু গবেষণায় উচ্চ মর্যাদার পেশায় নিয়োজিত নারীদের মধ্যে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। তবে এর পেছনে পেশাগত মর্যাদার সরাসরি প্রভাবের চেয়ে সন্তান জন্মদানের বয়স, সন্তানসংখ্যা, জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ ও রোগ শনাক্তকরণের পার্থক্য ভূমিকা রাখতে পারে। তাই ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং সামগ্রিক সুস্থ জীবনযাপনে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

২. প্রজননগত পরিবর্তন ও হরমোনের প্রভাব: নগর ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সন্তান ধারণের বয়স, সন্তানসংখ্যা এবং স্তন্যদানের ধরনে পার্থক্য থাকতে পারে। প্রথম সন্তান দেরিতে জন্মদান, কম সন্তান নেওয়া এবং স্তন্যদানের সময়কালসহ কিছু প্রজননগত বৈশিষ্ট্য স্তন ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘ সময় ধরে নির্দিষ্ট ধরনের মেনোপজ-পরবর্তী হরমোন থেরাপি গ্রহণও ঝুঁকি বাড়াতে পারে; ঝুঁকির মাত্রা থেরাপির ধরন ও ব্যবহারের সময়কালের ওপর নির্ভর করে। তাই নারীদের সন্তান ধারণ বা স্তন্যদানের বিষয়ে দোষারোপ না করে, প্রমাণভিত্তিক তথ্য, উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরামর্শ নিশ্চিত করা জরুরি।

৩. রাসায়নিক পদার্থ ও পরিবেশগত সংস্পর্শ: কিছু কীটনাশক, শিল্পজাত রাসায়নিক এবং প্লাস্টিক ও প্রসাধন সামগ্রীতে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট উপাদানের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণা চলছে। ম্যালাথিয়ন, অর্গানোক্লোরিন যৌগ, ক্লোরপাইরিফস এবং বিসফেনল এ (BPA)-এর মতো পদার্থের সংস্পর্শ ও স্তন ক্যানসারের সম্ভাব্য সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় মূল্যায়ন করা হয়েছে। তবে এসব পদার্থের প্রতিটির ক্ষেত্রে স্তন ক্যানসার সৃষ্টির কারণগত সম্পর্ক সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

বাংলাদেশে স্তন ক্যানসার মোকাবিলার বিশেষ চ্যালেঞ্জ

২. শিক্ষা, সচেতনতা ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা: NICRH-এর ২০১৫–২০১৭ সালের হাসপাতালভিত্তিক ক্যানসার রেজিস্ট্রি প্রতিবেদনে নারী ক্যানসার রোগীদের ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ নিরক্ষর এবং ৯২ দশমিক ৮ শতাংশ গৃহিণী ছিলেন। স্তনে অস্বাভাবিক চাকা, ত্বক বা বোঁটার পরিবর্তন কিংবা অস্বাভাবিক স্রাবের মতো লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, সামাজিক কুসংস্কার, লজ্জা এবং রোগ নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে বিলম্ব ঘটাতে পারে। পারিবারিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীলতা এবং আর্থিক অসচ্ছলতাও অনেক নারীর রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ সীমিত করে। স্তন ক্যানসার ঘিরে সামাজিক কলঙ্কের কারণে কোনো কোনো রোগী বিবাহবিচ্ছেদ, দাম্পত্য সম্পর্কের অবনতি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা পরিবারের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা করেন। এসব উদ্বেগ মানসিক সুস্থতা ও চিকিৎসা গ্রহণের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।

৩. রোগনির্ণয় ও চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা: বাংলাদেশে স্তন ক্যানসার মোকাবিলার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ, নির্ভুল রোগনির্ণয় এবং মানসম্মত চিকিৎসার সীমিত প্রাপ্যতা। উপযুক্ত ইমেজিং পরীক্ষা, বায়োপসি ও হিস্টোপ্যাথলজি নিশ্চিত রোগনির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রির মাধ্যমে ER, PR ও HER2-এর অবস্থা নির্ধারণ রোগীর ক্যানসারের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী হরমোন থেরাপি, HER2-নির্দেশিত চিকিৎসা এবং অন্যান্য চিকিৎসা নির্বাচন করতে সহায়তা করে। এসব পরীক্ষা ও প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের সীমিত প্রাপ্যতার কারণে বিশেষত ঢাকার বাইরের রোগীদের রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা শুরুতে বিলম্ব হতে পারে। স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, হরমোন থেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপির উপযুক্ত সমন্বয় জরুরি। ২০২৫ সালের নভেম্বরের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় ১৮০টি লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটরের (LINAC) বিপরীতে প্রায় ২৪টি থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। এই ঘাটতি রেডিওথেরাপির জন্য অপেক্ষার সময় বাড়াতে পারে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো পূর্ণাঙ্গ জনসংখ্যাভিত্তিক জাতীয় ক্যানসার রেজিস্ট্রির অভাব। ফলে স্তন ক্যানসারের প্রকৃত প্রকোপ, অঞ্চলভিত্তিক পার্থক্য, রোগ নির্ণয়ের সময় রোগের পর্যায় এবং দীর্ঘমেয়াদি বেঁচে থাকার হার সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য জাতীয় চিত্র পাওয়া কঠিন।

করণীয়: বাস্তবসম্মত ও সমাজভিত্তিক উদ্যোগ: বাংলাদেশে স্তন ক্যানসার নিয়ন্ত্রণের কৌশল দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এ জন্য সচেতনতা, দ্রুত রোগনির্ণয়, সময়মতো চিকিৎসা, আর্থিক সুরক্ষা এবং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।

প্রথমত, নারীর ক্ষমতায়ন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে: স্তনে অস্বাভাবিক চাকা, ত্বক বা বোঁটার পরিবর্তন কিংবা অন্য কোনো সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক কুসংস্কার ও আর্থিক বাধা দূর করতে পরিবার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, প্রমাণভিত্তিক প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও দ্রুত রেফারেল নিশ্চিত করতে হবে: বয়স, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইতিহাস এবং স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বিবেচনায় জাতীয় নির্দেশিকা তৈরি করা প্রয়োজন। সবার জন্য নির্বিচারে ম্যামোগ্রাফি চালুর পরিবর্তে উপযুক্ত জনগোষ্ঠী ও পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রাথমিক শনাক্তকরণ কৌশল নির্ধারণ করা উচিত। সন্দেহভাজন রোগীদের পরীক্ষা ও বিশেষায়িত চিকিৎসায় পৌঁছানোর সময় কমাতে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

তৃতীয়ত, মানসম্মত রোগনির্ণয় ও চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে হবে। ইমেজিং, বায়োপসি, হিস্টোপ্যাথলজি, ER/PR/HER2 পরীক্ষা, দক্ষ জনবল, অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সাশ্রয়ী প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি, দরিদ্র ও প্রান্তিক নারীদের আর্থিক সহায়তা, নমুনা পরিবহন, টেলিমেডিসিন এবং জেলা পর্যায় থেকে দ্রুত রেফারেলের ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।

চতুর্থত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবহার বাড়াতে হবে: AI-ভিত্তিক প্রযুক্তি ম্যামোগ্রাফি ও অন্যান্য চিকিৎসাচিত্র বিশ্লেষণ, প্যাথলজি স্লাইড মূল্যায়ন এবং সন্দেহভাজন রোগীদের অগ্রাধিকার নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে। তবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তথ্য দিয়ে মডেলের নির্ভুলতা, নির্ভরযোগ্যতা, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীতে কার্যকারিতা ও ব্যয় সাশ্রয়িতা যাচাই করতে হবে। রোগীর তথ্যের গোপনীয়তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করে AI-কে চিকিৎসকের বিকল্প নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।

পঞ্চমত, জাতীয় ক্যানসার রেজিস্ট্রি ও স্থানীয় গবেষণা জোরদার করতে হবে: রোগের পর্যায়, বায়োমার্কার, চিকিৎসা, ফলাফল ও বেঁচে থাকার তথ্য নথিভুক্ত করার মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে রোগের বোঝা এবং শহর-গ্রামের বৈষম্য নিরূপণ করা সম্ভব হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে নতুন রোগনির্ণয় পদ্ধতি, AI প্রযুক্তি এবং ব্যয়সাশ্রয়ী চিকিৎসার কার্যকারিতাও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা যেতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি (৩-৫ বছর) কর্মপরিকল্পনা বাংলাদেশে স্তন ক্যানসার নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি জাতীয় বহুপক্ষীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করা জরুরি। এতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ক্যানসার বিশেষজ্ঞ, গবেষক, রোগী প্রতিনিধি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং AI বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করে পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।

প্রস্তাবিত বাস্তবায়ন-লক্ষ্যগুলো হলো:

প্রাথমিক শনাক্তকরণ: পাঁচ বছরের মধ্যে নতুন স্তন ক্যানসারের অন্তত ৬০ শতাংশ স্টেজ I–II-তে শনাক্ত করা।

দ্রুত রোগনির্ণয়: তিন বছরের মধ্যে উপসর্গযুক্ত সন্দেহভাজন রোগীদের অন্তত ৮০ শতাংশের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও প্যাথলজি মূল্যায়ন ৬০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা।

পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা: পাঁচ বছরের মধ্যে চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত রোগীদের অন্তত ৮০ শতাংশের নির্ধারিত চিকিৎসা সম্পন্ন করার ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

গ্রামীণ সেবা ও আর্থিক সুরক্ষা: দুই-তিন বছরের মধ্যে নির্বাচিত জেলায় দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থা এবং নিম্ন-আয়ের রোগীদের জন্য চিকিৎসা-ব্যয় সহায়তা চালু করা।

জাতীয় তথ্যব্যবস্থা: এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে স্তন ক্যানসার রোগীর নিবন্ধন, রোগের পর্যায়, ER/PR/HER2 অবস্থা, চিকিৎসা ও ফলাফলসহ জাতীয় তথ্যব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা।

AI-এর নিরাপদ প্রয়োগ: প্রথম দুই বছরে অন্তত তিনটি হাসপাতালে AI-ভিত্তিক ইমেজিং বা প্যাথলজি প্রযুক্তির পাইলট প্রকল্প চালু করে স্থানীয় তথ্যের ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন করা।

জবাবদিহি: রোগনির্ণয়ের সময়, রোগের পর্যায়, চিকিৎসা সম্পন্নের হার এবং শহর-গ্রামের বৈষম্য নিয়ে বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা।

এসব লক্ষ্যমাত্রা প্রস্তাবিত; বাস্তবায়নের আগে জাতীয় প্রাথমিক পরিস্থিতি, অর্থায়ন ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা যাচাই করা প্রয়োজন। প্রতিটি লক্ষ্যের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, নির্দিষ্ট বাজেট, পরিমাপের পদ্ধতি এবং সময়সীমা নির্ধারণ করা উচিত।

উপসংহার

বাংলাদেশে স্তন ক্যানসারের বোঝা মোকাবিলায় নগরায়ণ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য, জনসচেতনতার ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজন দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, প্রমাণভিত্তিক ও সাশ্রয়ী প্রতিরোধ, প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা। জাতীয় সমন্বয়, গবেষণা, মানসম্মত চিকিৎসা, আর্থিক সুরক্ষা এবং AI-সহ উপযুক্ত প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার একসঙ্গে এগিয়ে নিতে পারলে রোগনির্ণয় ও চিকিৎসায় বিলম্ব কমানো এবং নারীদের স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করা সম্ভব। শেষ পর্যন্ত সাফল্যের মাপকাঠি হবে—কত দ্রুত রোগ শনাক্ত হচ্ছে, কতজন নারী প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা পাচ্ছেন, কতজন নির্ধারিত চিকিৎসা সম্পন্ন করতে পারছেন এবং শহর ও গ্রামের মধ্যে সেবার বৈষম্য কতটা কমছে।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান (মেডিকেল অনকোলজি)

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।