প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৯:০৯ এএম || প্রকাশের তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৮:০২ এএম
বাবার কোলে বসে ফুটফুটে হাসিতে মেতে আছে চার বছরের ইনারা জাহান চৌধুরী। বাবার আদর, আবদার আর ভালোবাসায় কাটত তার ছোট্ট পৃথিবী। অথচ সেই পৃথিবী থেকে বাবা এখন চিরতরে হারিয়ে গেছেন। বাবার সঙ্গে তোলা ছবিতে আজও সেই চেনা হাসিমুখ খুঁজে ফেরে শিশুটি। কখনো বাবার কাছে যাওয়ার বায়না ধরে, কখনো ‘বাবা’ বলে কেঁদে ওঠে। কিন্তু বাবাকে আর ফিরে পাবে না, সেই বাস্তবতা বোঝার বয়স এখনো হয়নি তার। ১৪৭ দিন ধরে বাবার অপেক্ষায় থাকা শিশুটি জানে না, একদল অস্ত্রধারী কেড়ে নিয়েছে তার জীবনের সবচেয়ে নির্ভরতার মানুষটিকে।
মেয়ের কাছে ফিরে আসার কথা ছিল যে মানুষটির, তিনি আর কোনো দিন ফিরবেন না। পরিবার ও স্বজনদের কাছে তিনি ছিলেন রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, এলাকাবাসীর কাছে পরিচিত মুখ, আর ছোট্ট ইনারার কাছে ছিলেন পৃথিবীর সবটুকু ভালোবাসা।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী ওরফে মাসুদের স্বপ্ন ছিল এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। পরিবারের দাবি, রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ও নির্বাচনী সম্ভাবনাই তাকে হত্যার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। তবে হত্যার পেছনে শুধু সরাসরি হামলাকারীরাই নয়, অর্থদাতা ও পরিকল্পনাকারীদেরও খুঁজে বের করার দাবি তুলছেন স্বজন ও স্থানীয়রা।
ওষুধ কিনতে গিয়ে গুলিতে প্রাণ গেল মাসুদের
চলতি বছরের ১৩ জুন দুপুর ১টা ২৩ মিনিট। রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারের আশরাফিয়া ফার্মেসির সামনে অবস্থান করছিলেন মাসুদ। ওষুধ কিনতে বাজারে গিয়েছিলেন তিনি। এ সময় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে অস্ত্রধারীরা এসে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন মাসুদ। কিছুদূর যাওয়ার পর গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এরপরও তাকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি ছোড়ে হামলাকারীরা। মৃত্যু নিশ্চিত করে ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে পালিয়ে যায় তারা। ঘটনাস্থলটি রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে মাত্র কয়েকশ গজ দূরে।
নিহত মাকসুদুল হক চৌধুরী রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তিনি বেতাগী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত খালেদ চৌধুরীর ছেলে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে এলাকায় তার নাম আলোচনায় ছিল। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ছিল। তার জনপ্রিয়তা, নির্বাচনী প্রস্তুতি এবং স্থানীয় নানা সমীকরণ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কাজ করেছে কি না, সেই প্রশ্ন এখন ঘুরছে স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে।
জনপ্রিয়তা ও নির্বাচন থেকে সরাতেই হত্যার পরিকল্পনা!
মাসুদ হত্যার ঘটনায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে রাউজান থানায় মামলা করেন তার বড় ভাই মুহাম্মদ পিয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন। ১৫ জুন করা মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৭ থেকে ৮ জনকে আসামি করা হয়।
এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলে এলাকায় তার ভাইয়ের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া এবং নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। এ কারণে ইউনিয়নের কয়েকজন নির্বাচনপ্রত্যাশী ও প্রতিহিংসাপরায়ণ ব্যক্তি তাকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিতে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার দিন মাসুদের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর ১ নম্বর আসামি রায়হানের নির্দেশে অন্য আসামিরা অস্ত্র নিয়ে সেখানে যান। কয়েকজন সরাসরি গুলি করেন, অন্যরা অবস্থান শনাক্ত ও হামলায় সহযোগিতা করেন। হত্যার পর তার পকেট থেকে মানিব্যাগ ও টাকা নিয়ে যাওয়ার কথাও এজাহারে উল্লেখ করেছেন বাদী। পরিবারের দাবি, এটি তাৎক্ষণিক কোনো বিরোধের ঘটনা নয়; অর্থের বিনিময়ে শুটার ভাড়া করে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, যারা সরাসরি গুলি চালিয়েছে, তারা মাসুদকে ব্যক্তিগতভাবে চিনত না। তাকে হত্যার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করে ছবি সরবরাহ করা হয়েছিল। অর্থদাতা ও নির্দেশদাতারা আড়ালে থেকে হামলাকারীদের ব্যবহার করেছেন। হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা অর্থ জুগিয়েছেন, কারা পরিকল্পনা করেছেন এবং স্থানীয়ভাবে কারা তথ্য সরবরাহ করেছেন, তাঁদেরও আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।
শুটারদের চেনা ছিল না মাসুদকে, ছবি দিয়েই লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ!
মামলার বাদী ও নিহতের বড় ভাই মুহাম্মদ পিয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা প্রথমে মামলা করতে গিয়ে ভিডিও ফুটেজে যাদের দেখেছি, তাদেরই আমার ভাইয়ের শত্রু মনে করেছিলাম। কিন্তু পরে কয়েকজন গ্রেপ্তার হওয়ার পর জানতে পারি, তারা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে বলেছে, তারা মাসুদকে চিনত না। তাদের কাছে আমার ভাইয়ের ছবি পাঠিয়ে হত্যার জন্য বলা হয়েছিল। মূলত তাদের ভাড়াটে শুটার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা আমার ভাইকে টাকা দিয়ে হত্যা করিয়েছে, তাদের পরিচয় বের হওয়া জরুরি। যারা ধরা পড়েছে, তারা বলেছে, ১ নম্বর আসামি তাদের কন্ট্রাক্ট করেছে এবং ছবি দিয়েছে। কিন্তু সে এখনো ধরা পড়েনি। এক নম্বর আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারলে সে কার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে, কার নির্দেশে আমার ভাইকে হত্যা করেছে, সেসব তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।’
হত্যাকাণ্ডের পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের বেতাগীর প্রভাবশালী লোকজন এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত আছে। তবে সবকিছু এখনই খোলাসা করে বলতে পারছি না। তারা আমাদেরও লক্ষ্য করেছে, আমাদের নিরাপত্তা নেই। আমরা পুলিশকে কিছু তথ্য ও ক্লু দিয়েছি। সেগুলো নিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেছি। আমি বারবার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে যাচ্ছি। এসপি মাসুদ আলম নিজেও আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছেন। এমপি মহোদয়ও বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। কিন্তু মূল সমস্যা হলো, যারা টাকা দিয়ে আমার ভাইকে হত্যা করিয়েছে, তাদের পরিচয় এখনো সামনে আসেনি।’
পিয়ারুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমরা চাই, শুধু যারা গুলি করেছে তাদের বিচার নয়, যারা পেছন থেকে টাকা দিয়েছে এবং হত্যার পরিকল্পনা করেছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হোক। আমার ভাই দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছে, মানুষের পাশে থেকেছে। তার এমন পরিণতি আমরা মেনে নিতে পারছি না। সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, হত্যার নেপথ্যে থাকা প্রত্যেককে খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি করা হোক।’
ছোট্ট ইনারার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমার ভাইয়ের চার বছরের একটি মেয়ে আছে। সে বাবাকে ডাকতে পারে না, বাবার কাছে যেতে পারে না। মেয়েটি বাবার হাসিখুশিতে মেতে থাকত। যত কষ্টই হোক, মেয়েকে কোলে নিলেই আমার ভাই শান্তি পেত। আজ তার বাবা দুনিয়ায় নেই। এই কষ্ট মেনে নেওয়া যায় না। আমরা সরকারের কাছে হত্যার মূল হোতাদের বের করে বিচারের দাবি জানাচ্ছি।’
স্থানীয়দের সন্দেহের তির বেতাগীর প্রভাবশালীদের দিকে
মাসুদ হত্যার ঘটনায় এলাকায় এখনো ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা সরাসরি হামলায় অংশ নিলেও তাদের পেছনে থাকা অর্থদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের পরিচয় সামনে আসেনি। তাদের দাবি, মামলার ১ নম্বর আসামি রায়হানকে গ্রেপ্তার করতে পারলে হত্যার নেপথ্যের অনেক তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক যুবক বলেন, ‘আপনি দেখেন, এক নম্বর আসামি রায়হান এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাকে গ্রেপ্তার করতে পারলে কারা টাকা দিয়েছে, কীভাবে টাকা দেওয়া হয়েছে, কারা হত্যার পরিকল্পনা করেছে, এসব তথ্য বেরিয়ে আসত। এখন পর্যন্ত যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা মূলত টাকার বিনিময়ে মানুষ হত্যা করে। তারা নিজেরাও পুলিশকে বলেছে, মাসুদকে তারা চিনত না। তাদের কাছে ছবি পাঠানো হয়েছিল। তাহলে যারা ছবি পাঠিয়েছে, যারা টাকা দিয়েছে, তারা কোথায়?’
তিনি আরও বলেন, ‘মাসুদ এলাকায় জনপ্রিয় ছিল। মানুষের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক ছিল। যারা গুলি করেছে, তাদের সঙ্গে মাসুদের ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না। তাহলে কেন তারা তাকে হত্যা করবে? নিশ্চয়ই তাদের পেছনে কেউ ছিল। এখন বেতাগীতে চেয়ারম্যান পদে অনেকেই প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কারও কারও বিষয়ে মানুষের সন্দেহ আছে। তবে কারও নাম ধরে কাউকে দোষী বলছি না। প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি, যারা শুটারদের ব্যবহার করেছে, সেই মূল হোতাদের খুঁজে বের করতে হবে। শুধু অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার করে তদন্ত শেষ করলে হবে না।’
স্থানীয় বাসিন্দা শাহরিয়ার আহমেদ বলেন, ‘রাঙ্গুনিয়ার যুবদল নেতা শহীদ মাসুদ ভাইয়ের হত্যা মামলার প্রথম আসামি গ্রেপ্তার হলে অনেক তথ্য বেরিয়ে আসবে। ঘটনার পর চেয়ারম্যান নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি সামনে আসে। পরে বালুমহালের বিরোধের প্রসঙ্গও উঠে আসে। বিশাল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে একটি গ্রুপকে ভাড়া করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে। আমরা চাই, শুধু যারা সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছে তাদের নয়, এর পেছনের নাটের গুরুদেরও খুঁজে বের করা হোক।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের গ্রামে হঠাৎ করে অনেক চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন বলে মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তবে এটি আমার ব্যক্তিগত সন্দেহ, কারও বিরুদ্ধে প্রমাণিত কোনো অভিযোগ নয়। মাসুদ ভাই চেয়ারম্যান হয়ে এলাকার মানুষের জন্য কাজ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর সেই স্বপ্ন শেষ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা প্রশাসনের কাছে জানতে চাই, যারা তাঁকে হত্যার জন্য অর্থ দিয়েছে এবং যারা পরিকল্পনা করেছে, তারা কবে আইনের আওতায় আসবে।’
পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র দিয়ে মাথায় গুলি
মাসুদ হত্যার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে ২৬ আগস্ট। ওই দিন ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর পল্লানপাড়া এলাকায় পুলিশের অভিযানে শুটার মোহাম্মদ মোবারক ওরফে কালা মোবারকসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে জেলা পুলিশ। পরদিন ২৭ আগস্ট চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় পুলিশের সঙ্গে অপরাধীদের বন্দুকযুদ্ধ হয়। পরে ঘটনাস্থল থেকে থানা থেকে লুট হওয়া একটি ৯ এমএম পিস্তলসহ দুটি পিস্তল, একটি রিভলবার, একটি পাইপগান ও ২৩ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। বন্দুকযুদ্ধ ও আসামিদের গ্রেপ্তারের সময় ধস্তাধস্তিতে আহত হন হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী তারেক আজিজসহ ফটিকছড়ি থানার পাঁচ পুলিশ সদস্য।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘রাউজানে মাসুদ হত্যার সিসিটিভি ফুটেজে মোবারককে অস্ত্র হাতে দেখা গেছে। তার হাতে দুটি অস্ত্র ছিল। এর মধ্যে একটি থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র। মোবারক নিজেই ওই অস্ত্র দিয়ে মাসুদের মাথায় গুলি করেন। মোবাইল ফোনে মাসুদের ছবি পাঠিয়ে তাকে হত্যার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করে দেন পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান আলম।’
পুলিশ সুপার বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানা থেকে ম্যাগাজিনসহ লুট হয়েছিল। মোবারক জানিয়েছেন, তিনি অন্য একজনের কাছ থেকে অস্ত্রটি সংগ্রহ করেন। তিনি সাজ্জাদ গ্রুপের শুটার। নগরের বায়েজিদ বোস্তামীতে সরোয়ার বাবলা হত্যাকাণ্ডসহ রাউজান ও ফটিকছড়ির বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে তার অংশগ্রহণের তথ্য রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, মাসুদ হত্যার সিসিটিভি ফুটেজে পাঁচ অস্ত্রধারীকে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে বালুর ব্যবসার বিরোধ ও রাজনৈতিক আধিপত্যের বিষয়টিও হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
একের পর এক গ্রেপ্তার, তবু অধরা ১ নম্বর আসামি
হত্যাকাণ্ডের পরপরই জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ২১ জুন রাঙামাটির বাঘাইছড়ির দুর্গম দূরছড়ি এলাকা থেকে মামলার ৯ নম্বর আসামি মো. আইয়ুব আলীকে গ্রেপ্তার করে তৎকালীন র্যাব-৭। ২৭ জুলাই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মো. ইলিয়াস ওরফে ধামা ইলিয়াসকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।
পরবর্তী সময়ে সিসিটিভি ফুটেজে শনাক্ত হওয়া আবছার মিয়া ও দিদার আলমকে সীতাকুণ্ডের শীতলপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২৬ আগস্ট ফটিকছড়ির অভিযানে মোবারক ওরফে কালা মোবারকসহ আরও চারজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানায় পুলিশ।
মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে মোবারক, দিদার আলম, ইলিয়াস ওরফে ধামা ইলিয়াস, আবছার মিয়া ও আইয়ুব আলীসহ একাধিক ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে পরিবারের দাবি, মামলার ১ নম্বর আসামি রায়হান এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাঁর গ্রেপ্তার না হওয়ায় হত্যার অর্থদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
ব্যালিস্টিক প্রতিবেদনের অপেক্ষায় চার্জশিট
মাসুদ হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অসীম বলেন, মামলার মূল আসামিদের মধ্যে একজন ছাড়া অন্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত গুলির কার্তুজের ব্যালিস্টিক পরীক্ষা প্রয়োজন। ঘটনাস্থল ও নিহতের শরীর থেকে পাওয়া কার্তুজ পরীক্ষার জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছে। আদালতের প্রক্রিয়া শেষে সেগুলো ব্যালিস্টিক বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হবে। বিশেষজ্ঞের মতামত পাওয়ার পর অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা অনেক গুলি করেছে। সেসব গুলির কিছু কার্তুজ পাওয়া গেছে। এগুলো ব্যালিস্টিক পরীক্ষার জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছে। ব্যালিস্টিক বিশেষজ্ঞের মতামত চলে এলে এরপর চার্জশিট ফাইল করা যাবে।’
চার্জশিট জমা দিতে আরও কত দিন লাগতে পারে, জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি ব্যালিস্টিক বিশেষজ্ঞের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করছে। ব্যালিস্টিক ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের কাছে মামলার আলামত পাঠানো হলে প্রতিবেদন পেতে সময় লাগে। তবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দ্রুত প্রতিবেদন সংগ্রহের বিষয়ে তদারকি করছেন। যত দ্রুত সম্ভব অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘আমরা বিষয়টি আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত করছি। একজন ছাড়া মামলার মূল আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ ও আদর্শ চার্জশিট দিতে চাই। ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, সাক্ষ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করেছি। একটি প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছি। ইনশাআল্লাহ, দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলার চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।’
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স