গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৯:০৮ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:৩০ এএম

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন–ভাতার অসংগতি দূর করতে উদ্যোগ, ছয় মন্ত্রীকে নিয়ে কমিটি গঠন

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন–ভাতার অসংগতি দূর করতে উদ্যোগ, ছয় মন্ত্রীকে নিয়ে কমিটি গঠন

সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামোয় গ্রেডের ক্রম, পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেড নিয়ে যে অসংগতি দেখা দিয়েছে, তা দূর করতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব অভিযোগ পর্যালোচনা করে বেতন গ্রেড পুনর্বিন্যাস, নতুন ঝুঁকি ভাতা চালু এবং বিদ্যমান ভাতার হার পরিবর্তনের সুপারিশ করতে সরকার ছয় সদস্যের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে গঠিত এর আনুষ্ঠানিক নাম ‘কর্মচারীদের বেতন গ্রেড–ভাতা নির্ধারণ ও পরিবর্ধন–পরিমার্জনের বিষয় পর্যালোচনা কমিটি।’

কোনো কোনো পদের বেতন গ্রেড বাড়ানো বা কমানো, বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে সামঞ্জস্য আনা এবং নতুন ভাতা চালুর বিষয়ে সুপারিশ করবে এই কমিটি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ২ নভেম্বর এ–সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং জনপ্রশাসন ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কর্মচারীদের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগ পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেবে কমিটি। কমিটিকে সহায়তা করবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার ও জনপ্রশাসনসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবেরাও সহায়তা করবেন।

অর্থ বিভাগ নবগঠিত কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে। এ কমিটি প্রয়োজনে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। তবে সুপারিশ দেওয়ার জন্য কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। সুপারিশ বাস্তবায়নের সময়ও জানানো হয়নি। ফলে বেতনকাঠামোর অসংগতি দূর করতে কর্মচারীদের আরও অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে করছেন সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীরা।

ওপরের গ্রেডে বেতন কম

সরকারি চাকরিতে বিভিন্ন পদ ও পেশার কর্মীদের বেতন গ্রেড নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। একই ধরনের দায়িত্ব পালন করেও কোনো কোনো পদে বেতন গ্রেডের পার্থক্য, পদমর্যাদার সঙ্গে গ্রেডের অসামঞ্জস্য এবং পদোন্নতির পর আর্থিক সুবিধা কমে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর করতে গিয়ে এসব অসংগতি আরও স্পষ্ট হয়েছে।

অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মচারীরা এসব বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জ্যেষ্ঠতা, গ্রেডের ক্রম, উচ্চতর গ্রেড ও বাড়িভাড়া ভাতা নির্ধারণের অসংগতির কথা জানিয়ে তাঁরা অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের কাছে সম্প্রতি আবেদন করেছেন।

আবেদনগুলোয় অসংগতির উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। নতুন বেতনকাঠামোর একটি অসংগতি হচ্ছে ১১তম ও ১২তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণে। নতুন কাঠামোয় ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা। আর ১২তম গ্রেডে তা ২৪ হাজার ৩০০ টাকা। প্রারম্ভিক বেতনে ১১তম গ্রেড এগিয়ে থাকলেও আগের বেতন সমন্বয়ের পর তা উল্টে যাচ্ছে।

একজন কর্মকর্তা অঙ্ক করে বিষয়টি তুলে ধরেন প্রথম আলোর কাছে। তিনি জানান, ১১তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর গত ৩০ জুন মূল বেতন ছিল ২৩ হাজার ৬৬০ টাকা। আগের কাঠামোয় তাঁর বেতন বেড়েছিল ১১ হাজার ১৬০ টাকা। নতুন কাঠামোর প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে এই বৃদ্ধি যোগ করলে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ১৬০ টাকা। তবে নতুন কাঠামোয় এই অঙ্কের ধাপ না থাকায় পরবর্তী ধাপে তাঁর বেতন নির্ধারিত হচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ১২তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর একই সময়ে মূল বেতন ছিল ২৩ হাজার ৫৮০ টাকা। আগের কাঠামোয় তাঁর বেতন বেড়েছিল ১২ হাজার ২৮০ টাকা। নতুন কাঠামোয় হিসাব করলে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ৫৮০ টাকা। তবে পরবর্তী ধাপে তাঁর মূল বেতন হচ্ছে ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা। সে হিসাবে ১১তম গ্রেডের কর্মচারীর চেয়ে ১২তম গ্রেডের কর্মচারী ৭০০ টাকা বেশি মূল বেতন পাচ্ছেন।

পদোন্নতি পেলেও কমতে পারে আয়

কর্মচারীদের আরেকটি অভিযোগ, পদোন্নতির পর কারও কারও মোট আয় কমে যেতে পারে। তাঁদের দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, দশম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা। পদোন্নতি পেয়ে নবম গ্রেডে গেলে তাঁর মূল বেতন বেড়ে হয় ৫১ হাজার টাকা।

কিন্তু নতুন গ্রেডে বাড়িভাড়া ভাতার হার ৫০ শতাংশ থেকে কমে ৪৫ শতাংশ হওয়ায় ভাতার পরিমাণ কমে যাচ্ছে। আগে দশম গ্রেডের কর্মচারী বাড়িভাড়া পেতেন ২৪ হাজার ৮৫০ টাকা, পদোন্নতির পর তা দাঁড়ায় ২২ হাজার ৯৫০ টাকা। ফলে মূল বেতন ও বাড়িভাড়া ভাতা মিলিয়ে পদোন্নতির পর তাঁর আয় কমে যাবে ৬০০ টাকা।

উচ্চতর গ্রেড নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে কর্মচারীদের। অভিযোগ হচ্ছে, নির্দিষ্ট সময় চাকরি পূর্ণ করার ভিত্তিতে উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ কর্মচারীর বেতন কাছাকাছি হয়ে যাচ্ছে। এমনকি কনিষ্ঠ কর্মচারীর বেতন জ্যেষ্ঠ কর্মচারীর চেয়ে বেশি হওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে।

নতুন ঝুঁকি ভাতা চালুর সুযোগ

ছয় সদস্যের মন্ত্রী নিয়ে গঠিত কমিটির কার্যপরিধিতে শুধু বেতন গ্রেডের অসংগতি নিরসন নয়, বিভিন্ন পদের গ্রেড উন্নীত বা অবনমন এবং গ্রেডের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের বিষয়ও রয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে ঝুঁকি ভাতা ও অন্যান্য ভাতা চালু এবং বিদ্যমান ভাতার হার বাড়ানো বা কমানোর সুপারিশ করতে পারবে কমিটি।

অর্থাৎ ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন ভাতা চালুর বিষয়টি পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি কমিটির কার্যপরিধিতে রয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন ভাতার হারও পুনর্নির্ধারণের সুপারিশ করতে পারবে এ কমিটি।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর নতুন বেতনকাঠামোর গেজেট জারি হয়। এরপর ৫ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের সময়সীমা ছিল। ওই ২০ দিন যাঁরা বেতন নির্ধারণ করতে পেরেছেন, তাঁরা ১ নভেম্বর নতুন কাঠামোয় জুলাই থেকে হিসাব করে বকেয়াসহ বাড়তি বেতন পেয়েছেন। এ জন্য ব্যবহৃত হয় সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আইবাস++। তবে বেতন নির্ধারণ করতে গিয়ে প্রযুক্তিগত জটিলতার পাশাপাশি গেজেটের কয়েকটি বিধান নিয়েও ব্যাখ্যার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘২০১৫ সালের বেতনকাঠামোর পরও একই ধরনের কমিটি করা হয়েছিল। তবে ওই কমিটি তখন জটিলতা নিরসনে কোনো অবদান রাখতে পারেনি। এবারের ছয় সদস্যের মন্ত্রীদের কমিটি অসংগতি দূর করতে সত্যিকার অর্থে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা রাখছি।’

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।