গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:৫৩ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:০৫ এএম

বিদেশি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ থেকে সরে যাচ্ছে কেন

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
বিদেশি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ থেকে সরে যাচ্ছে কেন

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও এইচএসবিসির বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। এটি কি বাংলাদেশের বাজারের প্রতি আন্তর্জাতিক ব্যাংকের আস্থার সংকট, নাকি বৈশ্বিক ব্যাংকিং কৌশলের পরিবর্তনের প্রতিফলন? এ বিষয়ে বিশ্লেষণ করেছেন মামুন রশীদ

একসময় বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আন্তর্জাতিক ব্যাংকের উপস্থিতি ছিল পেশাদারি, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত গ্রাহকসেবা ও সুশাসনের প্রতীক। বিশেষ করে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও এইচএসবিসির মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কয়েক প্রজন্মের গ্রাহকের আস্থা ও নির্ভরতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাই স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং বা খুচরা ব্যবসা বিক্রির সিদ্ধান্ত এবং এর আগে এইচএসবিসির রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার ঘোষণা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করেছে—আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো কি বাংলাদেশের বাজারের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে, নাকি আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ের ব্যবসায়িক মডেলেই মৌলিক পরিবর্তন ঘটছে?

প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের বৈশ্বিক ব্যাংকিং কৌশল, স্থানীয় বাজারের প্রতিযোগিতা এবং পরিচালন ব্যয়ের অর্থনীতি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

ব্যাংকিং খাত পুনরুদ্ধার প্রকল্প কতটা কঠোর হবে

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার, রিটেইল ব্যাংকিং থেকে সরে আসা মানেই বাংলাদেশ থেকে পুরোপুরি বিদায় নেওয়া নয়। ব্যক্তিগত গ্রাহকদের আমানত, ক্রেডিট কার্ড, গৃহঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ, অর্থ পরিশোধ সেবা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা রিটেইল ব্যাংকিংয়ের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে করপোরেট ব্যাংকিং, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন, ট্রেজারি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ভিন্ন ব্যবসায়িক ক্ষেত্র। আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো অনেক ক্ষেত্রেই রিটেইল ব্যাংকিংয়ের পরিসর কমিয়ে এসব কার্যক্রমে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি হলো ব্যবসার অর্থনীতি। একটি বহুজাতিক ব্যাংককে শুধু শাখা পরিচালনা কিংবা গ্রাহকসেবার ব্যয় বহন করলেই চলে না। বৈশ্বিক প্রযুক্তি অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা, অর্থ পাচার প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা যাচাই, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মূলধন সংরক্ষণ এবং গ্রুপ পর্যায়ের তদারকির জন্য উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করতে হয়।

এসব ব্যয়ের বড় অংশ গ্রাহকসংখ্যা কমলেও কমে না। ফলে কোনো দেশে ব্যাংকটির গ্রাহক ভিত্তি, আমানত, ঋণ ও লেনদেনের পরিসর পর্যাপ্ত বড় না হলে প্রতিটি গ্রাহকের বিপরীতে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা। এর জন্য প্রয়োজন যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তিদের ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে নিয়োগ, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা, স্বার্থসংশ্লিষ্ট ঋণ নিয়ন্ত্রণ, খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীন ও কঠোর তদারকি।

ব্যাংকের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে শুধু মুনাফা অর্জনই বিবেচ্য নয়; বিনিয়োগকৃত মূলধনের বিপরীতে কতটা রিটার্ন পাওয়া যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি ব্যাংক যদি কোনো দেশে রিটেইল ব্যাংকিং পরিচালনায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে তুলনামূলক কম মুনাফা অর্জন করে, তাহলে একই মূলধন অন্য কোনো বাজারে বা করপোরেট ব্যাংকিংয়ে বিনিয়োগ করে বেশি রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে স্বাভাবিকভাবেই তারা সেই বিকল্প বিবেচনা করবে। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর কাছে মূলধনের দক্ষ ব্যবহার এখন ব্যবসায়িক কৌশলের অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

বাংলাদেশের বাজারে দেশীয় ব্যাংকগুলোর রয়েছে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক, দীর্ঘদিনের গ্রাহক সম্পর্ক এবং স্থানীয় ব্যবসা ও ভোক্তার চাহিদা সম্পর্কে গভীর ধারণা। পাশাপাশি মোবাইল আর্থিক সেবা, ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসার গ্রাহকসেবার ধরন বদলে দিয়েছে।

একসময় আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট কার্ড, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক লেনদেন ও গ্রাহকসেবার সুবিধা ছিল বড় আকর্ষণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দেশীয় ব্যাংকগুলোও এসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। ফলে বিদেশি ব্যাংকগুলোর একসময়কার বিশেষ সুবিধা অনেকাংশে কমে এসেছে। তবে ডিজিটাল সেবার প্রসার মানেই সব দেশীয় ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানের সেবা দিতে সক্ষম হয়েছে, এমনটি ভাবারও কারণ নেই।

এ ধরনের ব্যবসায়িক পুনর্গঠন শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাপী বড় ব্যাংকগুলো এখন তাদের মূলধন এমন বাজার ও ব্যবসায় কেন্দ্রীভূত করতে চাইছে, যেখানে তুলনামূলক বেশি মুনাফা এবং বিনিয়োগের বিপরীতে ভালো রিটার্ন পাওয়া সম্ভব। ভারতের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালে সিটি ব্যাংক এনএ তাদের ভারতীয় ভোক্তা ব্যাংকিং ব্যবসা অ্যাক্সিস ব্যাংকের কাছে বিক্রি করে।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডও ব্যক্তিগত ঋণের পোর্টফোলিও কোটাক মাহিন্দ্রা ব্যাংকের কাছে বিক্রি করেছে এবং ২০২৬ সালে ফেডারেল ব্যাংকের কাছে বিপুলসংখ্যক ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকের পোর্টফোলিও হস্তান্তরের চুক্তি করেছে। তবে উচ্চ সম্পদশালী গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলও অনুসরণ করছে।

পাকিস্তানেও আরবিএস, বার্কলেইস ও এইচএসবিসির স্থানীয় কার্যক্রম বিভিন্ন দেশীয় ব্যাংকের কাছে হস্তান্তরের নজির রয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, শক্তিশালী স্থানীয় ব্যাংকগুলো সক্ষমতা অর্জন করলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকের ছেড়ে যাওয়া ব্যবসা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়।

বাংলাদেশে এইচএসবিসির সিদ্ধান্তকেও তাদের বৃহত্তর বৈশ্বিক পুনর্মূল্যায়নের অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। ব্যাংকটি অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন বাজারে রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের বাজার থেকে সরে আসার পেছনে বৈশ্বিক কৌশল, মূলধন ব্যবস্থাপনা এবং মুনাফার হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব বাজার পরিস্থিতিও উপেক্ষা করা যায় না।

দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, দুর্বল সুশাসন, অনিয়ম এবং আমানতকারীদের আস্থার সংকটের মতো সমস্যায় জর্জরিত। রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত ঋণ বিতরণ, স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ প্রদান এবং বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারা খাতটির প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকও দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মূলধন দুর্বলতার বিষয়টি তুলে ধরেছে।

এমন পরিস্থিতিতে দুটি সুপরিচিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকের রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়া বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে। তবে এই সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের অর্থনীতি বা ব্যাংকিং খাতের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। রিটেইল ব্যাংকিং থেকে সরে আসা এবং কোনো দেশ থেকে সম্পূর্ণ ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া এক বিষয় নয়।

আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো যদি করপোরেট ব্যাংকিং, বাণিজ্য অর্থায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সেবা চালিয়ে যায়, তাহলে তাদের বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক আগ্রহের বিষয়টি অস্বীকার করা যায় না। বরং প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কীভাবে এমন একটি ব্যবসায়িক ও নিয়ন্ত্রক পরিবেশ নিশ্চিত করবে, যেখানে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের আগ্রহ বজায় থাকবে।

বিদেশি ব্যাংকের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা দেশীয় ব্যাংকের কাছে হস্তান্তরিত হলে নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। অধিগ্রহণকারী ব্যাংক একসঙ্গে আমানত, ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক, দক্ষ জনবল এবং প্রতিষ্ঠিত গ্রাহক ভিত্তি অর্জন করতে পারে। এতে নতুন বাজার তৈরি করতে দীর্ঘ সময় ও বিনিয়োগের প্রয়োজন কমে যায়।

তবে বড় পোর্টফোলিও অধিগ্রহণ করলেই সাফল্য নিশ্চিত হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ঋণের মান যাচাই, গ্রাহক ধরে রাখা, প্রযুক্তিগত সমন্বয়, সাইবার নিরাপত্তা এবং গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তাই বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যবসার যথাযথ মূল্যায়ন, অধিগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই এবং গ্রাহক ও কর্মীদের স্বার্থ সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা। এর জন্য প্রয়োজন যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তিদের ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে নিয়োগ, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা, স্বার্থসংশ্লিষ্ট ঋণ নিয়ন্ত্রণ, খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীন ও কঠোর তদারকি। দেশীয় ব্যাংকগুলোকে শুধু শাখা সম্প্রসারণ কিংবা গ্রাহকসংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নিশ্চিত করতে হবে মূলধনের দক্ষ ব্যবহার, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক মানের কমপ্লায়েন্স।

আন্তর্জাতিক ব্যাংকের রিটেইল ব্যাংকিং থেকে সরে যাওয়াকে তাই একমাত্রিকভাবে দেখার সুযোগ নেই। এটি যেমন বৈশ্বিক ব্যাংকিং কৌশলের পরিবর্তনের প্রতিফলন, তেমনি বাংলাদেশের দেশীয় ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা প্রমাণেরও একটি সুযোগ। তবে বিদেশি ব্যাংকের গ্রাহক বা ব্যবসায়িক পোর্টফোলিও অধিগ্রহণ করা সহজ। সেই গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করাই কঠিন।

  • মামুন রশীদ ফিন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের লিড পার্টনার।

    মতামত লেখকের নিজস্ব

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।