ট্রাম্প-পুতিনের চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রাশিয়ার ডিজেল নিয়ে যাত্রা শুরু করা অন্তত তিনটি তেলবাহী জাহাজ গতিপথ পরিবর্তন করেছে। এতে রুশ ডিজেল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সরবরাহের চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রাশিয়াকে ডিজেলের মজুত যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারে ছাড়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্মতির প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রে এক ফোঁটা ডিজেলও পৌঁছায়নি। অথচ ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর দেশটিতে ডিজেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
চুক্তির পর রাশিয়া মোট চারটি জাহাজে ডিজেল পাঠিয়েছে। তবে আইনি ঝুঁকির কারণে ব্যবসায়ীরা এসব জ্বালানি কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
রাশিয়ার ডিজেলবাহী জাহাজগুলোর কী হয়েছে?
রাশিয়ার পতাকাবাহী ট্যাংকার ‘তালিসম্যান’ এবং সিয়েরা লিওনের পতাকাবাহী ‘লেরু’ গত মাসে বাল্টিক সাগরের প্রিমরস্ক বন্দর ছেড়ে যায়। জাহাজ দুটির ঘোষিত গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল।
তবে সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার ও জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারের মধ্যে একটি জাহাজ ব্রাজিলের দিকে এবং অন্যটি ভূমধ্যসাগরের দিকে যাত্রা শুরু করেছে।
উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে থাকা তৃতীয় একটি ট্যাংকারও গন্তব্য পরিবর্তন করেছে। আগে নিউইয়র্কের নাম উল্লেখ থাকলেও এখন সেটির গন্তব্য দেখানো হচ্ছে ‘নির্দেশের অপেক্ষায়’। অর্থাৎ কোথায় জ্বালানি খালাস করা হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
এদিকে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, সেশেলসের মালিকানাধীন এবং নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ‘বিস্ট’ নামের আরেকটি ট্যাংকার অক্টোবরের শেষ দিকে প্রিমরস্ক বন্দরে ডিজেল বোঝাই করে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। বর্তমানে জাহাজটির গন্তব্য হিসেবে আটলান্টিক মহাসাগরের কথা দেখানো হচ্ছে।
ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে কী চুক্তি হয়েছিল?
চুক্তিতে বিপুল পরিমাণ ডিজেল সরবরাহের কথা বলা হলেও বিস্তারিত তথ্য ছিল সীমিত। গত ৯ অক্টোবর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপের পর ট্রাম্প প্রথম চুক্তির ঘোষণা দেন। তিনি জানান, রাশিয়া অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারের জন্য তিন লাখ টনের বেশি ডিজেল ছাড়বে।
দূরপাল্লার জ্বালানিবাহী ট্যাংকারে সাধারণত একবারে প্রায় এক লাখ টন ডিজেল পরিবহন করা যায়। ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানান, নভেম্বরে আরও পাঁচ লাখ টন এবং এরপরপরই আরও ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে।
ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ৭ এপ্রিল পর্যন্ত রাশিয়ার ডিজেল বিক্রি, পরিবহন, খালাস ও আমদানি করা যাবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে রুশ জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলার কারণে ডিজেলের সংকট তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে ট্রাম্প এ উদ্যোগ নেন।
তবে চুক্তির অনেক বিষয় এখনো অস্পষ্ট। হোয়াইট হাউস কিংবা ক্রেমলিন কেউই জানায়নি, চুক্তিটি লিখিতভাবে হয়েছে কি না। ডিজেলের দাম, অর্থ পরিশোধের শর্ত কিংবা কোন কোন প্রতিষ্ঠান এই লেনদেনে যুক্ত, তা-ও প্রকাশ করা হয়নি।
বিক্রির অপেক্ষায় কত ডিজেল রয়েছে?
ঠিক কত পরিমাণ ডিজেল বিক্রির অপেক্ষায় রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে ঘোষিত পরিমাণের চেয়ে বাস্তবে সরবরাহের পরিমাণ কম।
প্রথম চালানটি যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের জন্য উল্লেখযোগ্য স্বস্তি আনবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সেপ্টেম্বরে দেশটিতে খুচরা ডিজেলের দাম প্রতি গ্যালন ৬ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা প্রতি লিটারে প্রায় ১ দশমিক ৫৯ ডলার। যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এই দাম প্রায় দ্বিগুণ এবং এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে।
রাশিয়ার ডিজেল কিনতে চাইছেন না ব্যবসায়ীরা কেন?
মূল কারণ আইনি ঝুঁকি। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় সাময়িকভাবে রুশ ডিজেল বিক্রির অনুমতি দিলেও দেশটির কংগ্রেসে পাস হওয়া রুশ জ্বালানি আমদানির নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল রয়েছে। ফলে এই জ্বালানি কেনা, পরিবহন কিংবা খালাসের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
নিউ জার্সির গভর্নর মিকি শেরিল সোমবার তার রাজ্যের বন্দর ও জ্বালানি টার্মিনাল পরিচালনাকারীদের চিঠি দিয়ে রুশ জ্বালানিবাহী জাহাজ ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘রুশ জ্বালানির অবৈধ বাণিজ্য থেকে মুনাফা করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ শেরিলের যুক্তি, আমদানি নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার ক্ষমতা ট্রাম্প প্রশাসনের নেই।
এ ছাড়া আইনপ্রণেতারা ব্যাংক, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও জ্বালানি বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করেছেন। তাদের মতে, রুশ জ্বালানি আমদানির সঙ্গে যুক্ত হলে এসব প্রতিষ্ঠান দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার মুখে পড়তে পারে। ভবিষ্যতে কংগ্রেসের তদন্তেরও সম্মুখীন হতে পারে তারা।
শেষ পর্যন্ত কোথায় যাবে রুশ ডিজেল?
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এসব জ্বালানি সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাবে না। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গতিপথ পরিবর্তন করা প্রথম দুটি ট্যাংকারের একটি ব্রাজিল এবং অন্যটি ভূমধ্যসাগরের দিকে যাচ্ছে। তৃতীয় জাহাজটিও একই পথ অনুসরণ করতে পারে।
ম্যাট স্মিথ বলেন, ‘নিয়ন্ত্রক বিধিনিষেধ ও নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক উপকূলে এসব জ্বালানি খালাস হতে না-ও দেখা যেতে পারে।’
তবে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে আশাবাদী মস্কো। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, ‘সব ডিজেলেরই ক্রেতা পাওয়া যাবে।’
আর পুতিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো ভুয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে যাত্রা করা ট্যাংকারগুলো এখনো নির্ধারিত পথেই রয়েছে।
সূত্র : আল জাজিরা
সূত্র: কালবেলা