গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:৫৭ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:২২ এএম

চীনে বেড়েছে ম্যানগ্রোভ বনের আয়তন ও পাখির সংখ্যা, বাংলাদেশে কী সম্ভব

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
চীনে বেড়েছে ম্যানগ্রোভ বনের আয়তন ও পাখির সংখ্যা, বাংলাদেশে কী সম্ভব

চীনে ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা সফল হয়েছে। ১৯৯৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দেশটির ম্যানগ্রোভ এলাকার আয়তন ১৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বন বৃদ্ধি ফলে পাখির প্রজাতি ১৪৮ থেকে বেড়ে ৩৯৭-এ পৌঁছেছে। ২২ বছরের গবেষণায় এটা দেখা গেছে। গবেষকেরা বলছেন, চীনের নীতিমালা ম্যানগ্রোভ সম্প্রসারণকে ত্বরান্বিত করেছে।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন চীনের নিংবো ইউনিভার্সিটির ভূগোল ও স্থানিক তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের পাঁচ গবেষক। সেল প্রেসের অংশীদার ও বিখ্যাত আন্তর্জাতিক পিউয়ার-রিভিউড জার্নাল ‘দ্য ইনোভেশন’-এ বছরের অক্টোবর মাসে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, আইইউসিএনের হুমকির তালিকায় থাকা পাখির সংখ্যা ম্যানগ্রোভ এলাকায় ৯১ শতাংশ বেড়েছে।

কেন ও কোথায় গবেষণা

বিশ্বব্যাপী ম্যানগ্রোভ বনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গত প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে ধ্বংস হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সনদ ও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চীন সরকারের পক্ষ থেকে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার বা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন নীতিমালা ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সরকারি নীতিমালার মাধ্যমে বন বাড়ানোর ফলে জীববৈচিত্র্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে কি না, তা নিয়ে স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ঘাটতি ছিল। এই শূন্যতা দূর করতে ও নীতিমালার কার্যকারিতা যাচাই করতেই মূলত এই গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। গবেষণার মূল ক্ষেত্র ছিল চীনের মূল ভূখণ্ডের পাঁচটি উপকূলীয় প্রদেশ—ঝচিয়াং বা ঝেজিয়াং, ফুতচিয়ান বা ফুজিয়ান, কুয়াংতুং বা গুয়াংডং, কুয়াংসি বা গুয়াংসি ও হাইনান এবং হংকং ও ম্যাকাও বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল।

গবেষণার পদ্ধতি ও ফলাফল

গবেষকেরা গুগল আর্থ ইঞ্জিন ব্যবহার ও ১৩ হাজার ৩০০টির বেশি ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে ম্যানগ্রোভ এলাকার পরিধি ও ঘনত্ব বের করেছেন। পাখির তথ্য নেওয়া হয়েছে জিবিআইএফের (GBIF) ই-বার্ড (eBird) ডেটাসেট থেকে। এ ছাড়া সামুদ্রিক পরিবেশ, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ও আবহাওয়ার বিভিন্ন প্যারামিটার ব্যবহার করা হয়েছে।

পাখির বৈচিত্র্যের সঙ্গে ম্যানগ্রোভ এলাকার সম্পর্ক নির্ধারণের জন্য রৈখিক সমীকরণ বা লিনিয়ার রিগ্রেশন মডেল ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন পরিবেশগত চালকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব মাপার জন্য ‘পার্শিয়াল লিস্ট স্কয়ার পাথ মডেলিং’ (PLS-PM) পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে চীনের ম্যানগ্রোভ বনের মোট আয়তন ১০ হাজার ৬১৭ হেক্টর থেকে বেড়ে ২৮ হাজার ১৯৪ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। আয়তন বৃদ্ধির হার প্রায় ১৬৬ শতাংশ। উপকূলীয় অঞ্চলে রেকর্ড করা পাখির প্রজাতি ১৪৮টি থেকে বেড়ে ৩৯৭টিতে পৌঁছেছে। আইইউসিএনের লাল তালিকাভুক্ত সংকটাপন্ন প্রজাতির সংখ্যা ১১ থেকে বেড়ে ২১ হয়েছে। এর অর্থ সংকটাপন্ন পাখি ৯১ শতাংশ বেড়েছে।

গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে ম্যানগ্রোভ বৃদ্ধি সরাসরি সামুদ্রিক পরিবেশের মান উন্নত করেছে, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে পাখির প্রাচুর্য ও প্রজাতি সমৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

কীভাবে বন ও পাখি বাড়ল

চীন সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ও লক্ষ্যভিত্তিক নীতিমালা এই বন বিস্তারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে আছে ২০০০ সালের ‘চীন জলাভূমি সংরক্ষণ কর্মপরিকল্পনা’ ও ২০০৯ সালের সংশোধিত ‘সামুদ্রিক পরিবেশ সুরক্ষা আইন’। এ ছাড়া ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কার্যকর হওয়া ‘জলাভূমি সুরক্ষা আইন’ ম্যানগ্রোভ সুরক্ষাকে একটি আইনি কাঠামোর আওতায় এনেছে।

সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের জন্য প্রধানত তিনটি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। কৃত্রিম উপায়ে ম্যানগ্রোভ চারা রোপণ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বনায়ন; চিংড়ি বা মাছ চাষের ঘের বা পুকুরগুলো আবার ম্যানগ্রোভ বনভূমিতে রূপান্তর করা এবং ক্ষতিকর ও আগ্রাসী প্রজাতিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ।

এ ছাড়া বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চীনের ওই সব অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে ম্যানগ্রোভের জন্য উপযোগী প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা চারা টিকিয়ে রাখতে ও বনের উত্তরমুখী প্রসারে ভূমিকা রেখেছে।

ম্যানগ্রোভ বনের আয়তন ও ঘনত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে উপকূলীয় এলাকার পানির মান উন্নত হয়েছে, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এবং ছোট মাছ, চিংড়ি ও মলাস্কের মতো জলজ প্রাণীর প্রাচুর্য বেড়েছে। এর ফলে পাখিরা খাদ্যের নিরাপদ উৎস ও বাসা বাঁধার উপযুক্ত পরিবেশ পেয়েছে। আশ্রয়স্থল পাওয়ায় ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি ফিরে এসেছে।

কতটা প্রাসঙ্গিক

বাংলাদেশের সুন্দরবন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। নানা কারণে এই বন ঝুঁকিতে আছে, দিন দিন সেই ঝুঁকি বাড়ছে। এ ছাড়া চকরিয়া অঞ্চলের সুন্দরবন ধ্বংস হয়েছে চিংড়ি চাষসহ নানা কারণে। সরকার সুন্দরবন রক্ষা ও চকরিয়া সুন্দরবন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। গাছ লাগানোর পাশাপাশি উপকূলের পানি ও মাটির মান, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ও খাদ্যশৃঙ্খল সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে বাংলাদেশ চীনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারবে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।