গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:১৮ এএম

উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার গুরুত্ব কি কমতে শুরু করেছে

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার গুরুত্ব কি কমতে শুরু করেছে

২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল অনেককেই বিস্মিত করেছে। কিন্তু যাঁরা কয়েক বছর ধরে ফলাফল পর্যবেক্ষণ করছেন, তাঁদের কাছে এটা খুব বেশি অপ্রত্যাশিত ছিল না। কারণ, শিক্ষা বোর্ডের নীতির কারণে ফলাফলে যে প্রভাব পড়ে, সেটা শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা আগেও স্বীকার করেছেন।

পাসের হার বেশি দেখানোর জন্য কোনো কোনো বছর ‘সরলভাবে’ খাতা দেখার নির্দেশনার কথাও আমরা শুনেছি। এভাবে পাসের হার হয়তো বেড়েছে, কিন্তু তাতে শিক্ষার মান কতটুকু বেড়েছে, সেই প্রশ্ন থেকে গেছে।

এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফল কেন খারাপ হলো

তবে আরেকটা প্রশ্ন নিয়েও ভাবা দরকার—উচ্চমাধ্যমিক স্তরের গুরুত্ব কি কমতে শুরু করেছে? তাই যদি না হবে তো এত শিক্ষার্থী কোথায় গেল? ২০২৪ সালে যারা এসএসসি পাস করেছিল, তারাই এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ২০২৪ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেছিল ১৬ লাখ ৭২ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী। অথচ ২০২৬ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১২ লাখ ৭০ হাজারের মতো শিক্ষার্থী।

এই হিসাবেই অন্তত ৪ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ভর্তি হয়নি কিংবা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। বাস্তবে এই সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি। কারণ, গত বছর ২০২৫ সালে ৫ লাখের বেশি পরীক্ষার্থী এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি; তাদের একটি বড় অংশও এ বছর পরীক্ষা দিয়েছে। তার মানে, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর কাছে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের গুরুত্ব হারিয়েছে।

এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলও নানা কারণে গুরুত্ব হারাতে শুরু করেছে। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রধান বিবেচ্য হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষায় ভালো করার একটা চাপ থাকে। কিন্তু স্নাতক পর্যায়ে ভর্তির ক্ষেত্রে এইচএসসির ফলাফল প্রায় বিবেচিতই হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তির জন্য আলাদা করে পরীক্ষা নেওয়া হয়।

এ কারণে এমনও দেখা যায়, কিছু শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনার পাশাপাশি ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে! এইচএসসির ফলাফল পরবর্তী চাকরির বাজারেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে না। সেখানেও মূলত বহুনির্বাচনী বা লিখিত পরীক্ষা এবং ভাইভার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়, কিংবা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়।

এইচএসসি ফল বিপর্যয়: ব্যর্থতা নয়, জাগরণের বার্তা
আমাদের খেয়াল রাখা দরকার, এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বা অনুত্তীর্ণ সব শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা স্তরে ভর্তি হবে না। কিন্তু এখান থেকে যারা কর্মক্ষেত্রে ঢুকবে, তারা কোন যোগ্যতা বা দক্ষতার ভিত্তিতে নিজেদের জায়গা করে নেবে, সেটা চিন্তা করা জরুরি। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট দরিদ্র পরিবারগুলোকে নানামুখী চাপের মধ্যে রাখে। সেগুলোকে বিচেনায় নিয়েই আমাদের শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনের কথা ভাবতে হবে।

এ বছর যারা এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের জন্য এসব বিষয়ে এক মাসের মধ্যে আবার পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি শিক্ষার্থীদের স্বস্তি দেবে, সন্দেহ নেই। কিন্তু তাদের ফল প্রকাশের জন্য বাড়তি কিছু সময় লেগে যাবে। এর দরুন আরেক সংকট তৈরি হবে। কারণ ইতিমধ্যে মেডিক্যাল, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি গুচ্ছসহ বিভিন্ন ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি পরীক্ষার নির্ধারিত তারিখ পিছিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে। সেটি করা না হলে এই শিক্ষার্থীরা আরেক ধরনের সংকটে পড়বে।

এবারের এইচএসসির ফলাফলকে প্রায় সবাই ‘বিপর্যয়’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। কিন্তু একজন পরীক্ষার্থীর জিপিএ তার মেধার সমতুল—এটা কিসের ভিত্তিতে আমরা বলতে পারব? কারণ, খাতা দেখার ক্ষেত্রে পরীক্ষকদের স্বেচ্ছাচার ও অমনোযোগের নজির আছে। তা ছাড়া সব পরীক্ষকের মূল্যায়নের ধারা এক রকম নয়।

এই সমস্যা কাটানোর জন্য বিষয়ভিত্তিক প্রতিটি প্রশ্নের জন্য আলাদা রুব্রিক্স বা মানদণ্ড নির্ধারণ করা দরকার। এটি করা সম্ভব হলে পরীক্ষকদের খাতা মূল্যায়নের ব্যবধান কমিয়ে আনা সম্ভব। তা ছাড়া প্রতিটি খাতা যদি দুজন পরীক্ষকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়, তবে এইচএসসির ফলাফল আরও বেশি গ্রহণযোগ্য হবে।

উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে সমন্বিত পরীক্ষাপদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে শিক্ষার্থীদের কয়েক মাস ধরে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বা একাধিক ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে যেতে হয়। এখানে শুধু অর্থ ব্যয়ের প্রসঙ্গ জড়িয়ে থাকে না, একই সঙ্গে এসব পরীক্ষা এইচএসসির ফলাফলকেও ‘গুরুত্বহীন’ বা ‘অকারণ’ করে তুলছে। এইচএসসির ফলাফলকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারলে উচ্চশিক্ষা স্তরে ভর্তির জন্য এটিই প্রধান বিবেচ্য হতে পারে। তবে বিশেষায়িত ক্ষেত্রে ভর্তির জন্য আলাদা করে পরীক্ষা নেওয়া সমীচীন হবে।

এ বছর শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা যেমন কমেছে, তেমনি শতভাগ ফেল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। গ্রাম ও শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবধান কমিয়ে আনার কথা সাম্প্রতিক সময়ে অনেকেই বলেছেন। কিন্তু শহরের মধ্যেও সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থা এক নয়।

এই সমস্যা দূর করার জন্য কোনো উদ্যোগই নেওয়া হচ্ছে না। অথচ উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি একই একাডেমিক ক্যালেন্ডারে চলে এবং প্রতিটি বিষয় নির্দিষ্ট লেকচারপ্ল্যান বা ক্লাস-পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত হয়, তবে তাতেও খানিকটা কাজ হতে পারে। তা ছাড়া শিক্ষকদের বাধ্য করতে হবে, যাতে তিনি শ্রেণিকক্ষের বাইরে আলাদা করে ব্যাচ বা প্রাইভেট না পড়ান।

পড়াশোনা অনেক আগে থেকেই নোটভিত্তিক ও মুখস্থনির্ভর ছিল। বর্তমান সময়ে শিক্ষা হয়ে পড়েছে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতানির্ভর। কিন্তু সেই অনুযায়ী শিক্ষাক্রমের বা পাঠ্যক্রমের বদল হয়নি। পরীক্ষাপদ্ধতির কিছু বদল হলেও তা মোটেও কাজে লাগেনি। এ কারণে দেখা যায়, বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাও নোট বা শিট মুখস্থ করে ভালো নম্বর পাচ্ছে।

বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজিসহ বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকের অভাবও রয়েছে। তা ছাড়া বিজ্ঞান পড়ানো হয় এমন কলেজগুলোর বেশির ভাগেরই ল্যাবরেটরি নেই, কিংবা সেখানে ঠিকমতো ব্যবহারিক ক্লাস হয় না। এ কারণে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা স্তরে শুরুতেই হোঁচট খাচ্ছে; ভাষাজ্ঞানের দুর্বলতার কারণেও তাদের সমস্যা হচ্ছে।

এইচএসসি পরীক্ষার পাস-ফেলের হার দেখে শিক্ষার মান সম্পর্কে স্থির সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। তবে এই দুই বছরের ফলাফল বিপর্যয় আমাদের এটা দেখিয়ে দিয়েছে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার মধ্যবর্তী স্তরে গুরুতর সংকট রয়েছে। নইলে এত শিক্ষার্থী ফেল করবে কেন? দুই বছরে শিক্ষার্থীরা কি কিছুই পড়াশোনা করেনি? তাদের শিখন-ঘাটতি বা শিখন-দুর্বলতা যদি থেকেই থাকে, তবে কেন তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি? এসব কারণে ছয় বা বারো মাস শেষে পরীক্ষা নেওয়াকে আমরা নিরুৎসাহিত করি। এর বদলে সারা বছর ধরে ধারাবাহিক মূল্যায়নে গুরুত্ব বাড়াতে হবে।

শিক্ষাব্যবস্থাকে যদি সত্যিকার অর্থেই সফল করে তুলতে হয়, তবে শিক্ষার অব্যবস্থাপনা আগে দূর করা উচিত। সংবাদমাধ্যমে নানা সময়ে অব্যবস্থাপনার নিত্যনতুন খবর পরিবেশিত হতে দেখি। শিক্ষাকে যারা বাণিজ্য করে তুলছে, তাদের শাস্তির আওতায় আনা দরকার। আর সবচেয়ে যেটি বেশি দরকার—একটি আধুনিক শিক্ষাক্রম। বর্তমান শিক্ষাক্রম ২০১২ সালের; কিন্তু ২০০২ সালের শিক্ষাক্রমের চেয়ে এর বিশেষ পার্থক্য নেই। নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নের জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে সফল দেশগুলোর শিক্ষাপদ্ধতি বিশেষভাবে দেখা দরকার। তবে সবকিছু করতে হবে আমাদের অবস্থা ও বাস্তবতার নিরিখে।

আমাদের খেয়াল রাখা দরকার, এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বা অনুত্তীর্ণ সব শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা স্তরে ভর্তি হবে না। কিন্তু এখান থেকে যারা কর্মক্ষেত্রে ঢুকবে, তারা কোন যোগ্যতা বা দক্ষতার ভিত্তিতে নিজেদের জায়গা করে নেবে, সেটা চিন্তা করা জরুরি। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট দরিদ্র পরিবারগুলোকে নানামুখী চাপের মধ্যে রাখে। সেগুলোকে বিচেনায় নিয়েই আমাদের শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনের কথা ভাবতে হবে।

• তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

মতামত লেখকের নিজস্ব

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।