গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:৫৯ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:১৫ এএম

সিনেমা শিখতে এসে ‘জীবন’ শিখে ফিরলাম

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
সিনেমা শিখতে এসে ‘জীবন’ শিখে ফিরলাম

দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান এশিয়ান ফিল্ম স্কুলের ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম বিজনেস একাডেমি’–তে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন নির্মাতা রাকা নোশিন নাওয়ার। পড়ুন তাঁর অভিজ্ঞতা।

এক স্যুটকেস স্বপ্ন, কিছু শীতের কাপড় আর মাথাভর্তি সিনেমা নিয়ে হাজির হই দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে। ১৯ মার্চ ২০২৬। উদ্দেশ্য—চলচ্চিত্র প্রযোজনা শিখব, নিজের সিনেমার প্রকল্প নিয়ে কাজ করব, বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রযোজক ও বিনিয়োগকারীদের সামনে সেই প্রকল্প তুলে ধরব, পরিচিত হব বিশ্বের নানা প্রান্তের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সঙ্গে।

তখনো জানতাম না, পরের আট মাসে সিনেমার পাশাপাশি আমাকে বাসন মাজা, বাজার করা, রান্না করা, খরচের হিসাব, এমনকি দোকানে নিজে নিজে পণ্য স্ক্যান করে বিল দেওয়াও শিখতে হবে!

বুসানের গিউমনেউসান পাহাড়ের পাশে বুসান ফিল্ম কমিশন পরিচালিত বুসান এশিয়ান ফিল্ম স্কুল। আট মাসে প্রতিষ্ঠানটি আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। এখন মনে হয়, এটা শুধু ‘ফিল্ম স্কুল’ নয়, ‘জীবন স্কুল’ও!

প্রায় দুই লাখ টাকার শাড়ি পরে মিস ইউনিভার্সে অংশ নিতে গেলেন ভারতের কাজিয়া

আট মাসের এই কোর্সে পড়ার সুযোগ আমি পেয়েছি বুসান এশিয়ান ফিল্ম স্কুলের ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম বিজনেস একাডেমি’ (আইএফবিএ) থেকে। টিউশন ফি থেকে শুরু করে থাকা কিংবা যাওয়া-আসার টিকিট, সবই ছিল বৃত্তির অধীনে।

১২টি দেশের চলচ্চিত্র প্রযোজক ও নির্মাতাদের সঙ্গে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছেন রাকা

১২ দেশের নির্মাতা, ১২ রকম অভিজ্ঞতা

এশিয়ার ১২টি দেশের চলচ্চিত্র প্রযোজক ও নির্মাতাদের সঙ্গে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছি। প্রত্যেকের সংস্কৃতি আলাদা, গল্প বলার ধরন আলাদা, সিনেমা নিয়ে ভাবনাও আলাদা। অথচ কখনো কখনো মনে হয়েছে, আমরা সবাই একই ভাষায় কথা বলছি। আবার কখনো একই সিনেমা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মনে হয়েছে, আমরা যেন ভিন্ন ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা!

আমার সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে আরও একজন ফেলো ছিলেন, শুভ কুমার পাল। এত দেশের নির্মাতার সামনে দুজন বাংলাদেশি নিজেদের সমাজ, সংস্কৃতি আর সিনেমার স্বপ্ন তুলে ধরছি, ভাবতেই ভালো লাগত।

চিত্রনাট্য তৈরি, সিনেমার বাজেট ও আর্থিক পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক যৌথ প্রযোজনা, চলচ্চিত্রের ইতিহাস, নীতিমালা, চুক্তি, বিপণন—কত কিছুই না শিখেছি! সবচেয়ে ভালো লেগেছে অধ্যাপক জেমস ব্যাংয়ের ‘স্টোরিটেলিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজি’ ক্লাস। একটা গল্পের মূল ভাবনা থেকে শুরু করে চিত্রনাট্য, প্রকল্প প্রস্তাব, পিচ স্ক্রিপ্ট কিংবা প্রেজেন্টেশন তৈরির নানা কৌশল শিখেছি।

দুই সেমিস্টারে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প, ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি, সিনেমাটোগ্রাফিসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রেজেন্টেশন দিতে হয়েছে। বুঝেছি, দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় কীভাবে একটা সিনেমা তৈরি হতে পারে।

এ সময়ে আমার নিজের সিনেমা লেস মিট নিয়েও কাজ করেছি। একজন নারীর শরীর, সমাজের সৌন্দর্যের ধারণা আর এক অদ্ভুত মাংসের দানবকে ঘিরে ‘বডি হরর’ ঘরানার গল্প। শেষ সপ্তাহের ক্লাসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এই সিনেমার একটা ‘প্রিভিজুয়ালাইজেশন ট্রেলার’ও বানিয়েছি।

বুসানে থাকার অন্যতম বড় প্রাপ্তি বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

স্বপ্নের মানুষদের কাছাকাছি

বুসানে থাকার অন্যতম বড় প্রাপ্তি বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। এত বড় চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা আমার আগে ছিল না।

সকাল সাড়ে আটটায় উঠে টিকিট কাটার প্রতিযোগিতা, একের পর এক সিনেমা দেখা, এশিয়ান কনটেন্টস অ্যান্ড ফিল্ম মার্কেটে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক, স্কুলের লাউঞ্জে আড্ডা—সব মিলিয়ে দারুণ কেটেছে দিনগুলো। এত দিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের যে জগৎকে দূর থেকে দেখেছি, এবার নিজেকে সেই জগতের অংশ মনে হচ্ছিল।

বিশ্বখ্যাত নির্মাতা, শিল্পী, সমালোচক ও প্রযোজকদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। তাঁদের আন্তরিকতায় অবাক হয়েছি। মন দিয়ে আমার প্রকল্পের কথা শুনেছেন, প্রশ্ন করেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন। নতুন সহযোগিতার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। এ সুযোগ করে দেওয়ার জন্য স্কুলের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

রান্নাঘরেও ‘যৌথ প্রযোজনা’

স্কুলের সবচেয়ে মজার যৌথ প্রযোজনাগুলো সম্ভবত ক্লাসরুমে নয়, আমাদের রান্নাঘরে হয়েছে। একসঙ্গে বাজার করা, রান্না করা, খাবার ভাগাভাগি, তারপর পাহাড়সমান বাসন মাজা। ফিলিপাইনের এক সহপাঠীর কাছ থেকে বেশ কিছু রান্নাও শিখেছি।

ভিনদেশে নববর্ষের রান্না

আর ছিল ‘স্প্লিটওয়াইজ অ্যাপ’। কে কত টাকা দিল, কে কার কাছে কত পাবে…এক কাপ চায়ের খরচও যেন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চুক্তির অংশ!

দেশে ফেরার পর মা আর আমার বিড়াল পুচ্ছ নিশ্চয়ই আমাকে দেখে খুব খুশি হবে। কারণ, ফিল্ম স্কুল আমাকে শুধু চলচ্চিত্র নির্মাতা নয়, অনেক বেশি স্বনির্ভর মানুষও বানিয়েছে।

স্বাধীনভাবে বেড়ানোর আনন্দ

বুসানে আমার বড় আবিষ্কারগুলোর একটি গণপরিবহনব্যবস্থা। সাবওয়ে আর বাসে চড়ে প্রায় পুরো শহর ঘুরেছি। বারবার মনে হয়েছে, আহা, আমাদের বাংলাদেশও যদি এমন হতো!

ছুটিতে জেজু দ্বীপে গিয়েছি। বুচনে বিফান চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়েছি। সিউলে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করেছি। নতুন শহর, রাস্তা, সমুদ্র আর মানুষের কত স্মৃতি জমেছে!

রাকা নোশিন নাওয়ার

অবশ্য পড়াশোনার চাপও কম ছিল না। বাংলাদেশে আমার দলের দীপ, নজরুল ভাই আর স্কুলের ভারতীয় বন্ধু আদিত্যর সঙ্গে দিনরাত কাজ করেছি লেস মিট নিয়ে। ছয় ঘণ্টা ক্লাসের পর আরও পাঁচ-ছয় ঘণ্টা বসে লিখতে গিয়ে দ্বিতীয় সেমিস্টারে পিঠে ব্যথা শুরু হয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ফিজিওথেরাপিও নিতে হয়েছে।

তবে গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠানটি ছিল অসম্ভব সুন্দর। আট মাসের পরিশ্রম, শেখা আর বন্ধুত্বের স্মৃতিগুলো যেন একসঙ্গে ফিরে এসেছিল।

সমুদ্র আর একগাদা নুডলস

গোয়াংআল্লি, সংদো, ইয়ংদো, দাদেপোর সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, অলিগলি, ক্যাফে আর সাবওয়ে স্টেশন—সবকিছুর সঙ্গেই ধীরে ধীরে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

সময় আর টাকা বাঁচাতে কত রকম নুডলস খেয়েছি, হিসাব নেই। তবে যত ভালো কোরীয় খাবারই খাই, মায়ের হাতের রান্নার তুলনা হয় না।

এ শহরে অনেক মমতাময়ী ‘আজুম্মা’র সঙ্গে দেখা হয়েছে। কোরীয় ভাষায় বয়স্ক নারীদের এভাবে সম্বোধন করা হয়। ভাষা না বুঝলেও তাঁদের হাসি, আন্তরিকতা আর ছোট ছোট সাহায্য মনে থাকবে।

স্কুলের বাইরেও বন্ধু হয়েছে অনেক। শিক্ষক, অভিনেতা, কমেডিয়ান, ক্যাফের মালিক—কত বিচিত্র মানুষ! সবাই আমাকে ডাকত ‘রাকা ফ্রম ঢাকা’ বলে।

আবারও বুসানে ফিরে যেতে চান রাকা

আবার দেখা হবে, বুসান

স্কুলের লাইব্রেরিটা ছিল গুপ্তধনের ভান্ডার। কত বই, কত সিনেমা! আফসোস, সব পড়া হলো না, সব দেখাও হলো না। পরবর্তী ব্যাচের ফেলোদের বলব, যতটা সম্ভব শিখুন, প্রশ্ন করুন, বই পড়ুন, সিনেমা দেখুন। আর সপ্তাহান্তে অবশ্যই বুসান ঘুরে দেখুন। শহরটাও আপনাকে অনেক কিছু শেখাবে। এখন কিন্তু আইএফবিএর আবেদন গ্রহণ চলছে! বিস্তারিত পেয়ে যাবেন ফিল্ম স্কুলের ফেসবুক পেজে।

বুসান আমার জীবনের অন্যতম সেরা অধ্যায়। আবার ফিরতে চাই নিজের চলচ্চিত্র, নতুন প্রকল্প আর নতুন স্বপ্ন নিয়ে। হয়তো একদিন বুসান চলচ্চিত্র উৎসবের পর্দায় আমার সিনেমা চলবে। দর্শকসারিতে বসে মনে পড়বে এই আট মাসের কথা।

এ সময়ে আমার সিনেমা আর জীবনে কমেডি ছিল, ড্রামা ছিল, রোমাঞ্চ ছিল, কিছুটা হররও ছিল। শেষ পর্যন্ত আমার সিনেমাই বলে দেবে, বুসান থেকে আসলে কতটা শিখেছি, কী পেয়েছি।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।