গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:৩৬ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:৫০ এএম

সড়ক দুর্ঘটনা: ৬ বছরে প্রায় নিঃশেষ ৩০০ পরিবার, শেষকৃত্যের জন্য স্বজন খুঁজে পাওয়া যায় না

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
সড়ক দুর্ঘটনা: ৬ বছরে প্রায় নিঃশেষ ৩০০ পরিবার, শেষকৃত্যের জন্য স্বজন খুঁজে পাওয়া যায় না

২০২০ সালের ৪ ডিসেম্বর। বেলা সোয়া তিনটা। মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার মূলকান্দি এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান একই পরিবারের পাঁচজন। তাঁরা টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার চাষাভদ্রা গ্রামের বাসিন্দা।

স্বজনদের মৃত্যুতে শোক করার মতো মানুষও যখন আর অবশিষ্ট থাকে না, তখন সেই শোকের সঙ্গে যুক্ত হয় এক কঠিন মানবিক সংকট। তেমনটা হয়েছিল চাষাভদ্রা গ্রামেও। দুর্ঘটনার পর তাঁদের সৎকারের জন্য নিকটাত্মীয় খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছিল। স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে শেষ পর্যন্ত শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

নিহত ব্যক্তিরা ছিলেন হরেকৃষ্ণ বাদ্যকর (৫৫), তাঁর ছেলে গোবিন্দ বাদ্যকর (২৮), পুত্রবধূ ববিতা বাদ্যকর (২৫), নাতনি রাধে বাদ্যকর (৪) ও চাচাতো ভাই রামপ্রসাদ বাদ্যকর (৩০)।

একটি পরিবারের একাধিক সদস্যের এমন মৃত্যুর ঘটনার প্রভাব পড়ে পরিবারের বেঁচে থাকা সদস্য, স্বজন ও পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যের পাশাপাশি শিশু, নারী ও প্রবীণ সদস্যরাও প্রাণ হারান। ফলে পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক কাঠামোও ভেঙে পড়ে। সম্পন্ন পরিবার হয়ে পড়ে সহায়হীন। একটি দুর্ঘটনা দরিদ্র করে তোলে তাদের।

সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের প্রাণহানির এমন ঘটনা বাড়ছে। গত ৬ বছর ১০ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩০০ পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বলে ধারণা করছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে।

গতকাল রোববার প্রকাশিত ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও বাসের যাত্রী হিসেবে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কখনো স্বামী–স্ত্রী, কখনো মা–বাবা ও সন্তান, আবার কখনো একই পরিবারের তিন থেকে সাতজন কিংবা আরও বেশি সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।

অটোরিকশা ও মাইক্রোবাসে বেশি প্রাণহানি

মাদ্রাসার মাঠজুড়ে মানুষের জমায়েত। মাঝখানে পাশাপাশি রাখা দুটি খাটিয়া। এক শিক্ষক দম্পতির জন্য খাটিয়া দুটি রাখা হয়েছে। মাঠের এক কোণে এ দম্পতি ও তাঁদের সাত মাস বয়সী একমাত্র কন্যাসন্তানের শেষ গোসল দেওয়া হচ্ছিল। খাটিয়াগুলোর চারপাশে তখনো থামছে না স্বজনদের কান্না আর প্রতিবেশীদের দীর্ঘশ্বাস। আগের দিনও এই মাঠে তাঁরা হাসি–আনন্দে সময় কাটিয়েছেন শিক্ষার্থী ও সহকর্মী শিক্ষকদের সঙ্গে। এক দিনের ব্যবধানে সেখানে চলছে শেষবিদায়ের প্রস্তুতি।

গত শনিবার সকাল ১০টার দিকে জামালপুর–দেওয়ানগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের মেলান্দহ উপজেলার নয়ানগর ইউনিয়নের বুরুঙ্গা এলাকায় একটি দ্রুতগতির ট্রাক ব্যাটারিচালিত একটি অটোরিকশাকে চাপা দেয়। এতে অটোরিকশায় থাকা মা–বাবা ও তাঁদের একমাত্র সাত মাস বয়সী কন্যাসহ চারজন নিহত হন। আহত হন আরও দুজন।

নিহত ব্যক্তিরা হলেন ইসলামপুর উপজেলার ইন্দুল্লামারী এলাকার মোরশেদ আলম (২৪), তাঁর স্ত্রী ইকরামা (১৯) ও তাঁদের সাত মাস বয়সী মেয়ে রিফা। এই দম্পতি মাহমুদপুর হারুনুর রশিদ ইসলামী কমপ্লেক্সের শিক্ষক ছিলেন। এ ছাড়া নিহত মোটরসাইকেলের চালকের নাম লিখন আকন্দ (৩২)।

পরিবারের তিন সদস্যকে হারিয়ে ইকরামার চাচা ইদ্রিস আলী বলেন, ‘আমাদের পরিবারের তিনজন চলে গেছে। আমার ভাতিজি, জামাতা ও নাতনি। পরিবারে তো আর কেউ থাকল না।’

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, অটোরিকশায় যাত্রী হিসেবে একই পরিবারের দুই সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে ২১১টি দুর্ঘটনায়।

সড়ক দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, সড়কে কী এভাবে নিবন্ধনবিহীন অটোরিকশা চলবে? এর উত্তর কে দেবে? এটা আমাদের দেশের সার্বিক অনিয়মের একটি প্রতিফলন।

রোড সেফটির হিসাব অনুযায়ী, মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় একই পরিবারের দুই সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে ৪৮টি।

প্রাইভেট কারের ক্ষেত্রে একই পরিবারের দুই সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে ৩৪টি দুর্ঘটনায়।

অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনায় একই পরিবারের দুই সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১১টি। তিনজন ১৫টি, চারজন ৯টি, পাঁচজন সাতটি ও আটজন তিনটি দুর্ঘটনায়। মোট ৪৫টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৬২ জন। বাস দুর্ঘটনায় একই পরিবারের দুই সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১৭টি। তিনজন ৯টি ও চারজন ছয়টি দুর্ঘটনায়। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৮৫ জন।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়ও পরিবারের একাধিক সদস্যের প্রাণহানির ঘটনা রয়েছে। ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে স্বামী–স্ত্রী ও বাবা–সন্তানের একসঙ্গে নিহত হওয়ার বহু ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে।

কেন ঘটছে এমন দুর্ঘটনা

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে কাজে বা বেড়াতে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ায় একটি দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তবে শুধু একসঙ্গে যাতায়াতকে দায়ী করার সুযোগ নেই। যানবাহন ও সড়ক ব্যবস্থাপনার নানা দুর্বলতাও এ ধরনের প্রাণহানির পেছনে ভূমিকা রাখছে।

সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, মহাসড়কে অটোরিকশার চলাচল, অনেক মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সের ফিটনেস না থাকা, এসব যানবাহনের চালকদের অদক্ষতা ও বিশ্রাম ছাড়া দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। মোটরসাইকেল চালানোর সময় মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা, বেপরোয়া গতি ও ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতাও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিচালক সাইদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নিঃশেষ হয়ে যাওয়া পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৩০০ বলে যে ধারণা দেওয়া হয়েছে, তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে। তাঁরা নিজেরা দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে বা পরিবারগুলোর তথ্য অনুসন্ধান করে এই সংখ্যা যাচাই করেননি। তাঁর ভাষ্য, বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

ফলে এই সংখ্যাকে পূর্ণাঙ্গ বা চূড়ান্ত পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাগুলোয় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের প্রাণহানির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা সড়ক নিরাপত্তার দুর্বলতা নিয়ে নতুনভাবে প্রশ্ন তৈরি করে।

প্রতিরোধে প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ

দৌলতপুরের মূলকান্দিতে পাঁচজনের মৃত্যু কিংবা জামালপুরের মেলান্দহে শিক্ষক দম্পতি ও তাঁদের শিশুকন্যার প্রাণহানি—এমন ঘটনাগুলো মনে করিয়ে দেয়, সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতি শুধু নিহত মানুষের সংখ্যায় পরিমাপ করা যায় না। একটি দুর্ঘটনায় একসঙ্গে পরিবারের কয়েকজন সদস্যের মৃত্যু হলে তাঁদের ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলোও বিপর্যয়ের মুখে পড়েন। কখনো শেষকৃত্য সম্পন্ন করার মতো নিকটাত্মীয়ও খুঁজে পাওয়া যায় না।

সড়ক দুর্ঘটনা এবং এতে প্রাণহানি নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এ দুর্ঘটনার সংখ্যা যেমন কমছে না, তেমনি কমছে না মৃত্যু।

এআরআইয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় পুরো পরিবারের নিহত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে, তাতে সন্দেহ নেই। সড়ক দুর্ঘটনা একটি জটিল ব্যাধি। কিন্তু এর চিকিৎসায় যেসব পদ্ধতি নেওয়া হচ্ছে, তা যেমন একমুখী এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানসম্মত নয়। সব দুর্ঘটনার ধরন এক নয়, একে নিয়ন্ত্রণে পদ্ধতিও এক হতে পারে না।

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাতে মোটরসাইকেলচালক ও আরোহীদের মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার, ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। একই সঙ্গে মহাসড়কে রোড ডিভাইডার ও সার্ভিস রোড নির্মাণ, গ্রামীণ সড়কের সঙ্গে মহাসড়কের নিরাপদ সংযোগ তৈরি এবং যানবাহনের চলাচল নিয়মিত নজরদারির সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ করা, চালকদের দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘ সময় বিশ্রাম ছাড়া গাড়ি চালানোর প্রবণতা বন্ধ করাও জরুরি। পাশাপাশি সড়ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাই শুধু দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর সংখ্যা কমানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবারের অস্তিত্ব, মানুষের জীবনযাপন ও বেঁচে থাকা স্বজনদের ভবিষ্যৎ।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।