গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৯:১৫ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:৪৫ পিএম

কেউ যদি বলে, ‘ডিসেম্বর দরজায়’, তাহলে বুঝতে হবে, তাঁর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নেই: উপদেষ্টা তিতুমীর

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
কেউ যদি বলে, ‘ডিসেম্বর দরজায়’, তাহলে বুঝতে হবে, তাঁর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নেই: উপদেষ্টা তিতুমীর

আগামী ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের ফিরে আসা নিয়ে যাঁরা কথা বলছেন, তাঁদের বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এখন আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার মতো কেউ নেই; যেমনটি ১৯৭৫ সালের পরে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে দেখা গেছে।

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের মানুষের ‘বিতাড়িত করাকে’ বাংলাদেশের জয় হিসেবে দেখছেন অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। আজ রোববার বিকেলে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মনসুন থিয়েটার হলে ‘চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ: স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট’ শীর্ষক আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি। গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সেমিনার সিরিজের পঞ্চম পর্ব হিসেবে এ আলোচনার আয়োজক জুলাই গণ–অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘যদি কেউ বলে, “ডিসেম্বর দরজায়” কড়া নাড়ছে, তাহলে বুঝতে হবে, তার সঙ্গে বাংলাদেশের মাটির, বাংলাদেশের ঘাসের, বাংলাদেশের পানির কোনো সম্পর্ক নেই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কারণ শুধু খাদ্যসংকট বা বাজারব্যবস্থার ব্যর্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর পেছনে রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের বিচ্ছিন্নতা, ক্ষমতার বৈধতার সংকট ও সহিংসতার ভূমিকা ছিল।’

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি ও সহিংসতার মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা এই দুই সময়ের শাসনব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের ব্যাখ্যায় সাধারণত তিনটি তত্ত্ব সামনে আনা হয়। এগুলো হলো খাদ্যের সামগ্রিক প্রাপ্যতা কমে যাওয়া, মানুষের খাদ্য কেনার সক্ষমতা বা প্রবেশাধিকারের সংকট এবং দুর্ভিক্ষবিরোধী সামাজিক চুক্তির অনুপস্থিতি। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক খাদ্যসহায়তা ও স্নায়ুযুদ্ধের ভূরাজনীতির প্রভাবের কথাও বলা হয়। তবে তাঁর মতে, এসব ব্যাখ্যায় রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের সংকট যথাযথভাবে উঠে আসে না।

প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টার মতে, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ছিল না। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে জনগণের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যা গ্রাম থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ‘রেশন’ ও খাদ্যবণ্টনব্যবস্থার মধ্যেও সেই পৃষ্ঠপোষকতার প্রভাব ছিল।

১৯৭১ থেকে ’৭৫–এর মতো ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালেও বিরোধীদের দমন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও সহিংসতার মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রবণতা দেখা গেছে বলে উল্লেখ করেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম কমলেও বাংলাদেশের বাজারে দাম বেড়েছে, এমন পরিস্থিতিও দুই সময়ের মধ্যে মিল দেখায়। ১৯৭২ সালে প্রতি টন চালের আন্তর্জাতিক দাম ১৪৭ ডলার থাকলেও ১৯৭৪ সালে তা বেড়ে ৫৪২ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে বাংলাদেশের বাজারে দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বেশি ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানকে জনগণের বিজয় হিসেবে উল্লেখ করে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের মানুষ বারবার তাদের সার্বভৌমত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ১৯৭১, ১৯৭৫, ১৯৯০ ও ২০২৪ সালে জনগণ নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে। তবে এই বিজয় ধরে রাখতে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর করা জরুরি। এ প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের বৈধ ‘সহিংসতার’ একচ্ছত্র ক্ষমতা থাকতে হবে, তবে তা জবাবদিহির আওতায় রাখতে হবে। এ জন্য কার্যকর সংসদ প্রয়োজন। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে জনগণের সার্বভৌমত্বের যে স্বীকৃতি রয়েছে, তা প্রতিষ্ঠার জায়গা জাতীয় সংসদ। সংসদকে কার্যকর না করে রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়।

প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, রাষ্ট্র যখন জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং ক্ষমতায় টিকে থাকতে সহিংসতার আশ্রয় নেয়, তখন দুর্ভিক্ষ ও লুটপাটের মতো নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাই ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের আলোচনা করতে হলে শুধু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়, সে সময়ের রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও প্রাণহানির বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহ্সান মাহমুদ। এতে আরও বক্তব্য দেন লেখক ও পানাম ইনস্টিটিউটের কোষাধ্যক্ষ আসিফ ইকবাল, অর্থনীতিবিদ ও গবেষক নাহিয়ান বিন খালেদ।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।