গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:০৭ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:১৩ পিএম

সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করতেই চীন-পাকিস্তান তথ্য করিডোর

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করতেই চীন-পাকিস্তান তথ্য করিডোর
ভুয়া সংবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দোহাই দিয়ে চালু করা ‘চীন-পাকিস্তান তথ্য করিডোর’ (সিপিআইসি) মূলত সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করার এবং স্বাধীন গণমাধ্যম দমনের এক বিপজ্জনক যৌথ হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার তালিকার তলানিতে থাকা পাকিস্তান ও চীনের সরকার নিজেদের স্বার্থে নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার অধিকার ও চিন্তার স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণে এটি ব্যবহার করছে। দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৭ অক্টোবর ইসলামাবাদে অবস্থিত পাকিস্তান-চীন ফ্রেন্ডশিপ সেন্টারে আনুষ্ঠানিকভাবে সিপিআইসি চালু করা হয়। পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং এবং পাকিস্তানে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত জিয়াং জাইদং উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার প্রকল্পে সমর্থনের জন্য চীনা দূতাবাসকে ধন্যবাদ জানান। সিপিআইসির আওতায় দুই দেশের ১৮টি সংবাদমাধ্যম ও গবেষণা সংস্থা সংবাদ আদান-প্রদান, যৌথ কনটেন্ট তৈরি এবং তথাকথিত ‘বিভ্রান্তিকর’ খবরের জবাব দিতে কাজ করবে। মূলত বিলিয়ন ডলারের চীনা বিনিয়োগ প্রকল্প ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর’ (সিপেক)-এর ‘কণ্ঠস্বর’ হিসেবে এর ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রকাশ করাই এর মূল উদ্দেশ্য। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক প্রতিবেদনে এই উদ্যোগকে পাকিস্তানি গণমাধ্যমের ওপর চীনের বড় ধরনের কর্তৃত্ব ও তথ্য পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের যৌথ কৌশল হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এই পরিকল্পনার অধীনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ও কয়েকটি বেসরকারি চ্যানেলের পাশাপাশি চীনের সিনহুয়া, চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি) ও পিপলস ডেইলির মতো রাষ্ট্রীয় মাধ্যম যুক্ত করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো এর অধীনস্থ সরকারি ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ ইউনিট, যা মূলত স্বাধীন সাংবাদিকদের জন্য একটি নতুন ফাঁদ তৈরি করেছে। এমন এক সময়ে এই ইউনিট গঠন করা হয়েছে যখন পাকিস্তানে ‘ভুয়া খবর’ শব্দ দুটি ব্যবহার করেই যে কোনো সাংবাদিককে জেলে পুরে দেওয়া সম্ভব। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তান সরকার তাদের ইলেকট্রনিক অপরাধ প্রতিরোধ আইন (পেকা) সংশোধন করে ২৬-এ ধারা যুক্ত করে। এতে অসত্য তথ্য ছড়িয়ে আতঙ্ক তৈরির অভিযোগে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড ও ২০ লাখ রুপি জরিমানার বিধান রাখা হয়। পরবর্তীতে আইনটিকে স্বাধীন সাংবাদিকতা দমনে ব্যবহার করা হতে থাকে। বেলুচিস্তানের গ্বাদার বন্দরের দুর্নীতি কিংবা সিপেক-এর ঋণ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা ‘ডন’ ও ‘রাফতার’-এর মতো প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকদের গ্রেফতার ও আইনি নোটিশের মুখোমুখি হতে হয়েছে। স্বাধীন সংস্থা ‘ফ্রিডম নেটওয়ার্ক’-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে পাকিস্তানে সাংবাদিকদের ওপর ১২৯টি আইনি ও শারীরিক নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে, যার বড় অংশই ঘটেছে পেকা আইনে। আরএসএফের ২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান ১৫৩তম। কঠোর আইনি হয়রানির ভয়ে সাংবাদিকরা এখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করছেন। অপরদিকে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচকে চীনের অবস্থান ১৭৮তম এবং বর্তমানে ১২১ জন সংবাদকর্মীকে বন্দি করে দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘সাংবাদিকদের কারাগারে’ পরিণত হয়েছে। কভিড-১৯ এর সময় উহান থেকে রিপোর্ট করায় কারাবরণকারী নাগরিক সাংবাদিক ঝাং ঝানকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পুনরায় চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এমন এক পরিস্থিতিতে চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো এখন সিপিআইসির মাধ্যমে পাকিস্তানে সংবাদের সত্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতা নির্ধারণের এখতিয়ার পাচ্ছে। ফ্রিডম হাউসের তথ্য মতে, বেইজিংয়ের অপছন্দের সংবাদ বন্ধে বিভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপ করা চীনের পুরোনো কৌশল। কোন তথ্য বিভ্রান্তিকর তা নির্ধারণের ক্ষমতা নিরপেক্ষ কোনো কাঠামোর হাতে না রেখে সরাসরি সংশ্লিষ্ট সরকারের হাতে তুলে দেওয়ায় চরম স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। যে সরকারগুলোর অনিয়ম উন্মোচন করা সাংবাদিকদের কাজ, তারাই এখন খবরের সত্যতা বিচারক। ফলে সিপেকের ঋণ, বিদ্যুৎ বিলের বকেয়া, গ্বাদারের প্রতিবাদ কিংবা চীনা কর্মীদের ওপর হামলা নিয়ে প্রশ্ন তুললেই সাংবাদিকদের ‘ভুয়া খবর’ ছড়ানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করা সহজ হবে। তথ্য যাচাই (ফ্যাক্ট-চেকিং) নীতিগতভাবে প্রয়োজনীয় হলেও সরকার যখন নিজের বিরুদ্ধে যাওয়া অনুসন্ধানের বিচারক বনে যায়, তখন নিরপেক্ষতা বজায় থাকে না। একটি নিরপেক্ষ রিপোর্ট প্রকাশ করার মাশুল হিসেবে যদি চাকরি হারানো বা গ্রেপ্তার হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তবে অনেক সাংবাদিকই আর অনুসন্ধানী প্রশ্ন তোলার ঝুঁকি নেবেন না। পরিণতিতে সত্য খবর জনসমক্ষে অধরাই থেকে যাবে এবং ক্ষমতাবানরা নিজেদের সর্বময় জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।