সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে দীর্ঘ ২৩ বছর কারাবাসের পর সাজা মওকুফ হওয়ায় মুক্তির অপেক্ষায় ছিলেন চা-শ্রমিক নাইটু রাজু মুণ্ডা (৫০)। কিন্তু আদালতের নির্ধারিত ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড পরিশোধ করতে না পারায় আটকে ছিল তার মুক্তি। পরিবারের সামর্থ্য না থাকায় সেই টাকা জোগাড়ও হচ্ছিল না।
অবশেষে অসহায় রাজুর পাশে দাঁড়ান সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন। তার দেওয়া ৫০ হাজার টাকায় অর্থদণ্ড পরিশোধের পর রোববার (৮ নভেম্বর) সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান ২০০৩ সাল থেকে বন্দি থাকা নাইটু রাজু মুণ্ডা।
বিষয়টি কালবেলাকে নিশ্চিত করেছেন সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বনিক।
কারাগার সূত্র জানায়, একটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল রাজুর। ২০০৩ সাল থেকে তিনি কারাগারে ছিলেন। দীর্ঘদিন সাজা ভোগের পর জেল কোডের ৫৬৯ বিধান অনুযায়ী মানবিক বিবেচনায় তার মুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ বিধানে ২০ বছর সাজা ভোগের পর কোনো বন্দির মুক্তির সুযোগ রয়েছে।
সেই অনুযায়ী আবেদন করার পর তার সাজা মওকুফের আদেশ আসে। তবে আদালতের নির্ধারিত ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বাকি থাকায় মুক্তির প্রক্রিয়া আটকে যায়। সম্প্রতি জেলা আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সভায় রাজুর মুক্তি আটকে থাকার বিষয়টি উঠে আসে। তাঁর পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা ও অসহায়ত্বের কথা শুনে অর্থদণ্ড পরিশোধের দায়িত্ব নেন সভায় উপস্থিত সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন।
নাইটু রাজু মুণ্ডা হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বাসিন্দা ও একটি চা-বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তার বিয়ে হয়নি। দীর্ঘ ২৩ বছরের কারাবাসে অতীতের অনেক স্মৃতিই এখন অস্পষ্ট হয়ে গেছে। যে হত্যা মামলায় তার যাবজ্জীবন সাজা হয়েছিল, সেই ঘটনার কথাও খুব একটা মনে করতে পারেন না তিনি। মুক্তির পর রাজু বলেন, ভুলের মাশুল তো জেল খাটলাম। পাপ মুছেছে। এখন সামনের দিনটা ভালো করে কাটাতে চাই।
এ বিষয়ে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বনিক জানান, অর্থদণ্ড পরিশোধের সামর্থ্য ছিল না রাজুর পরিবারের। বিষয়টি সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কর্মকর্তা তৈমুর হোসেন চৌধুরীকে জানানো হলে তিনি অর্থের সংস্থান করতে উদ্যোগ নেন।
এ বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কর্মকর্তা তৈমুর হোসেন চৌধুরী বলেন, রাজুর মুক্তির জন্য একজন দাতা খুঁজছিলেন তিনি। কয়েক জায়গায় যোগাযোগ করেও প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করতে পারেননি। পরে জেলা আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সভায় বিষয়টি তুলে ধরেন। সভায় উপস্থিত নাসিম হোসাইন ৫০ হাজার টাকা দিতে সম্মত হন। সভা শেষে তিনি দ্রুত অর্থ পাঠিয়ে দেন এবং রাজুর মুক্তির ব্যবস্থা করতে বলেন।
তিনি আরও বলেন, নাসিম হোসাইনকে কারাগারের ফটকে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তবে তিনি সেখানে যেতে চাননি। তার চাওয়া ছিল, যত দ্রুত সম্ভব রাজুকে মুক্তি দেওয়া হোক। পরে রাজুর মুক্তির খবর তাকে জানানো হয়। রাজুও ফোনে কথা বলে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন কালবলোকে বলেন, ‘মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমি সবসময় অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। বিশেষ করে অর্থের অভাবে কেউ আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হলে কিংবা কারাগারে থাকা কোনো অসহায় মানুষের মুক্তির পথ আটকে গেলে, সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করি। এ ধরনের সহযোগিতা একান্তই ব্যক্তিগত ও মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে করা। এ নিয়ে প্রচার বা প্রচারণা করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই।
তিনি বলেন, আমি মনে করি মানুষের বিপদে নীরবে পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতেও কেউ অর্থের অভাবে আইনি জটিলতায় পড়লে কিংবা অসহায় অবস্থায় আমার কাছে এলে সাধ্যমতো সহযোগিতা করার চেষ্টা করব। তবে মানবিক সহায়তা কখনো লোক দেখানো বা প্রচারের বিষয় হওয়া উচিত নয়।
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স