কবিতার ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। কবে, কীভাবে শুরু হয়েছিল, তার সঠিক ইতিহাস আমাদের জানা নেই; কিন্তু দীর্ঘ যাত্রায় কবিতার চিত্রকল্প, ভাব, ভাষা ও ছন্দে অর্জন করেছে বিপুল বৈচিত্র্য। কবিতার এই যাত্রায় শাহ মোহাম্মদ সানাউল হকের কাব্যগ্রন্থ ‘প্রতিবিম্ব কবিতা’ একটি ব্যতিক্রমী সংযোজন। একটি দৃশ্য তাঁর কবিতায় দুটি স্বতন্ত্র কাব্যিক ভাষ্য লাভ করে। একজন মানুষ আয়নায় নিজেকে দেখে; কিন্তু আয়নার সেই প্রতিচ্ছবি কি হুবহু সে নিজে? সেখানে থাকে আলোর খেলা, প্রতিফলন, প্রতিসরণসহ কত কিছু! কবি শাহ সানাউল হকের ‘প্রতিবিম্ব কবিতা’ অবশ্য আয়নার হুবহু প্রতিচ্ছবির ধারণা নয়; বরং একই দৃশ্য, মুহূর্ত বা অভিজ্ঞতা কবিচেতনায় দুইভাবে প্রতিফলিত হয়। জন্ম দেয় দুটি স্বতন্ত্র কবিতার। একটি অন্যটির অনুলিপি, পুনর্লিখন বা ছায়া নয়। একই উৎস থেকে সেগুলো ভিন্ন ভাষা, চিত্রকল্প ও অনুভব নিয়ে আলাদা হয়ে ওঠে। এদিক থেকে ‘প্রতিবিম্ব কবিতা’ একধরনের কাব্যিক ও দার্শনিক নিরীক্ষা। এখানে পাঠককে দুই কবিতার মধ্যে সেতু খুঁজতে হয়, আবার সেগুলোর স্বাতন্ত্র্যও আবিষ্কার করতে হয়।
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইউরোপীয় কবিতার ভাষা ও প্রকাশভঙ্গিতে নানা ধরনের পরিবর্তন আসে। ইতালীয় কবিতায় গড়ে ওঠে ‘হার্মেটিক’ বা ‘Ermetismo’ নামে পরিচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা। জিউসেপ্পে উঙ্গারেত্তি, সালভাতোরে কোয়াজিমোদো প্রমুখ কবির রচনায় সংহত ভাষা, ইঙ্গিত, নীরবতা এবং প্রত্যক্ষ বক্তব্যের বদলে গভীরতর অন্তর্জগতের প্রকাশ বিশেষ গুরুত্ব পায়। এই কাব্যপ্রবণতার সঙ্গে ‘প্রতিবিম্ব কবিতা’র সরাসরি কোনো উত্তরাধিকারের সম্পর্ক নেই; তবে সানাউল হকের অনেক কবিতায় সংহত ভাষা, দূরবর্তী ইঙ্গিত, প্রতীক ও দৃশ্যের আড়ালে আরেকটি অর্থস্তর তৈরির প্রবণতা হার্মেটিক কবিতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
‘প্রতিবিম্ব কবিতা’ গ্রন্থের ভূমিকায় কোয়াজিমোদোর বহুল পরিচিত কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তিও উদ্ধৃত হয়েছে—
‘সবাই একা পৃথিবীর কেন্দ্রে,
একটি রোদের রশ্মি বিদ্ধ করে তাদের—
আর হঠাৎ তখনই নেমে আসে সন্ধ্যা।’
হার্মেটিক কবিতায় শব্দের পরিমিত ব্যবহার, গভীর নীরবতা এবং ভাষার ভেতরে আরেক ভাষার ইঙ্গিত গুরুত্বপূর্ণ। শাহ সানাউল হকের কবিতার একটি অংশে এই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তবে ‘প্রতিবিম্ব কবিতা’র নিজস্ব নির্মাণকৌশল অন্য জায়গায়। এটি অনেকটা একই দৃশ্যকে ক্যামেরার দুটি আলাদা ক্লিকে দেখার মতো। দৃশ্য বা উৎসবিন্দু এক; কিন্তু দৃষ্টিকোণ, ফ্রেম, আলো কিংবা মুহূর্তের হেরফেরে ছবি পাল্টে যায়।
‘প্রতিবিম্ব কবিতা’ গ্রন্থে রয়েছে ১০০ কবিতা। কবিতাগুলো ৫০টি জোড়ায় বিন্যস্ত; কিন্তু এখানে ৫০টি ‘মূল কবিতা’ এবং বাকি ৫০টি তাদের প্রতিচ্ছবি—বিষয়টি এমন নয়। প্রতিটি জোড়ার দুটি কবিতাই স্বতন্ত্র সৃষ্টি। সেগুলোর মধ্যে সংযোগ একটি অভিন্ন দৃশ্য, মুহূর্ত, অনুভব বা ভাবনার উৎস থেকে দুটি পৃথক কাব্যিক সম্ভাবনার জন্ম। একটি অন্যটির অধীন নয়। দুটি কবিতাই একই উৎসের দুই স্বাধীন প্রতিফলন। কবি কেন এই পথ বেছে নিলেন? হয়তো তিনি দেখাতে চেয়েছেন, একটি দৃশ্যের কেবল একটিই পাঠ থাকে না। দেখার অবস্থান বদলালে অনুভব বদলায়, ভাষা বদলায়, এমনকি অর্থের অভিমুখও বদলে যেতে পারে। একই দৃশ্য একটি কবিতায় যে অনুভূতি জাগায়, আরেকটিতে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো স্মৃতি, চিত্রকল্প বা দার্শনিক প্রশ্নের দিকে চলে যেতে পারে। উৎসমূলের যোগটি থেকে যায়; কিন্তু কবিতা দুটি নিজের পথে হাঁটে।
এখানেই সানাউল হকের নিরীক্ষাটি আকর্ষণীয়। ‘প্রতিবিম্ব’ তাঁর কাছে শুধু আয়নায় ফিরে আসা ছায়া নয়; বরং একটি বাস্তবতা কবিচেতনায় প্রবেশ করে কীভাবে একাধিক কাব্যিক বাস্তবতা তৈরি করতে পারে, তারই অনুসন্ধান। একই দৃশ্যকে দ্বিতীয়বার দেখলে প্রথম দেখাটি আর হুবহু ফিরে আসে না। স্মৃতি, সময়, অনুভূতি ও কল্পনা সেটি বদলে দেয়। ফলে একই উৎস থেকে জন্ম নিয়েও দুটি কবিতা হয়ে ওঠে স্বতন্ত্র। এই গ্রন্থের কবিতাগুলোকে যমজ ভাই–বোনের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। তাদের জন্মসূত্র এক; কিন্তু তাদের নিজস্ব সত্তা আছে। একজনের উপস্থিতি অন্যজনকে চিনতে সাহায্য করে, অথচ একজন আরেকজনের অনুলিপি নয়। কোনো জোড়ায় প্রথম কবিতাটি হয়তো দৃশ্যের কটি দিক উন্মোচন করে, দ্বিতীয়টি চলে যায় অন্য একটি অনুভব বা অর্থস্তরে। আবার কোথাও তাদের সম্পর্ক আরও দূরবর্তী। পাঠককে তখন সেই অদৃশ্য যোগসূত্রটি খুঁজে নিতে হয়।
বাংলা কবিতায় এ ধরনের পরিকল্পিত নিরীক্ষা খুব বেশি দেখা যায় না। সাধারণত একটি কবিতা একটি স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবেই পাঠকের সামনে আসে। সানাউল হক সেখানে পাশাপাশি দুটি স্বতন্ত্র কাব্যভাষাকে এমনভাবে স্থাপন করেছেন যে পাঠক অনিবার্যভাবেই একটির আলোয় অন্যটিকেও দেখতে শুরু করেন। তিনি শব্দ ব্যবহার করেছেন, আবার সেই শব্দের প্রত্যাশিত অর্থ থেকে সরে গেছেন। একটি কবিতায় যে দৃশ্য আলো হয়ে আসে, একই উৎস অন্য কবিতায় রহস্যময় অন্ধকার কিংবা সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো চিত্রকল্প তৈরি করতে পারে। এই বিন্যাস পাঠকের মস্তিষ্ককে সচল রাখে। পাঠক একই সঙ্গে দুটি পাঠের ভেতর নিজের তৃতীয় পাঠটিও আবিষ্কার করেন।
যেমন ‘মাটির বেহালা’ শিরোনামে কবিতার দুটি ভাষ্যের কিছু অংশ এমন—
মাটির বেহালা ১
পূর্বপুরুষের কাছ থেকে ঋণ করা জন্মদাগ—
ভেবেছিলাম আপনাকেই দেব! আপনি ভাবলেন অন্য কিছু;
বললেন: কে রাখে জলচিহ্ন! নদীর কি গন্তব্য থাকে?
শয্যা, শরীর বা গর্ভপাত অথবা নিষেধের স্বরলিপি
আপনাকে চমকে দিয়ে সব উড়ে গেছে—
মাটির গায়ে দাগ দিয়ে আঁকা বেহালার ঘূর্ণিপথে!
মাটির বেহালা ২ কবিতাটি ভাষার বৈচিত্র্য নিয়ে ১৭ পঙ্ক্তিতে দাঁড়িয়েছে; যার মাঝের স্তবকে তিনি লেখেন—
… … …
আমার আঙুল ছুঁয়ে গেয়ে উঠল মাটির বেহালা
সেখানে ব্যথার স্পর্শে জন্ম নিল কবুতর; একে একে
উড়ে গেল একেকটা জন্মান্তর—ঢেউয়ে-ঢেউয়ে
আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। কোনো পিছুটান নেই
যা আমাকে টেনে ধরে; এমনকি আমার
আজও কোনো গন্তব্য নেই
শুধু ঢেউ আর আমি—অদৃষ্টের অনাথ আত্মীয়!
… … …
‘মাটির বেহালা’র কবিতা দুটি একই উৎসের সঙ্গে যুক্ত হয়েও ভিন্ন কাব্যিক অভিজ্ঞতা তৈরি করে। প্রথমটিতে ‘জন্মদাগ’, ‘জলচিহ্ন’, ‘নদী’, ‘শয্যা’, ‘গর্ভপাত’ এবং ‘বেহালার ঘূর্ণিপথ’ পরস্পরের সঙ্গে মিশে সম্পর্ক, উত্তরাধিকার, আকাঙ্ক্ষা ও বিলুপ্তির একটি জটিল আবহ তৈরি করেছে। এখানে অর্থ কোনো একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যায় স্থির থাকে না।
‘মাটির বেহালা ২’ তুলনায় অনেক বেশি প্রত্যক্ষ ও মানবিক। এখানে গন্তব্য, ভ্রূণ, শয্যাসঙ্গী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং হতাশা সামনে চলে আসে। অথচ দ্বিতীয় কবিতাটি প্রথমটির ব্যাখ্যা নয়; বরং একই উৎসের অনুভব এখানে অন্য ভাষা ও অন্য মানসিক অবস্থান লাভ করেছে। প্রথমটির বিমূর্ততা ও দ্বিতীয়টির প্রত্যক্ষতার মধ্যবর্তী দূরত্বই পাঠককে ভাবায়—একই অভিজ্ঞতা কীভাবে দুটি পৃথক কবিতায় বদলে যেতে পারে। কবির অনেক জোড়া কবিতাতেই এমন সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়। কোথাও সম্পর্কটি স্পষ্ট, কোথাও দূরবর্তী। আর এই দূরত্বই ‘প্রতিবিম্ব কবিতা’র পাঠকে আকর্ষণীয় করে।
শাহ সানাউল হকের এই ভাবনা কখনো কখনো প্লেটোর গুহার রূপকের কথাও মনে করিয়ে দিতে পারে—যদিও দুটির উদ্দেশ্য এক নয়। প্লেটোর গুহায় মানুষ ছায়াকেই বাস্তব মনে করে; প্রকৃত সত্যের সন্ধান পেতে তাকে সেই সীমাবদ্ধ প্রত্যক্ষতার বাইরে যেতে হয়। ‘প্রতিবিম্ব কবিতা’য়ও দেখা ও সত্যের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন জাগে, তবে এখানে কোনো একটি ভাষ্যকে ‘আসল’ এবং অন্যটিকে ‘ছায়া’ বলা যায় না; বরং একই দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে ভিন্ন দৃষ্টিতে ভিন্ন বাস্তবতা আবিষ্কারের সম্ভাবনাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অস্তিত্ববাদী ভাবনাও কোনো কোনো কবিতার পাঠে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে। মানুষ একই, অথচ তার ভেতরে অনুভবের বহুস্তর। একই ঘটনা ভিন্ন সময়ে কিংবা ভিন্ন মানসিক অবস্থায় সম্পূর্ণ আলাদা অর্থ বহন করতে পারে। ‘প্রতিবিম্ব কবিতা’ সেই বহুমাত্রিক অনুভবের দিকে পাঠকের দৃষ্টি ফেরায়।
শাহ সানাউল হকের কবিতার বাক্য অনেক ক্ষেত্রেই ছোট ও মেদহীন। শব্দের আড়ম্বরের চেয়ে ইঙ্গিতের দিকে তাঁর ঝোঁক বেশি। রচনাশৈলীতে নান্দনিকতা আছে; জোর করে চাপিয়ে দেওয়া শব্দ কম। আপাত সহজ বাক্যের নিচে কখনো কখনো অন্য অর্থের প্রবাহ থাকে। সহজ ভাষায় গভীর অনুভব প্রকাশ করা সহজ কাজ নয়। রবীন্দ্রনাথের সেই পরিচিত কথাই মনে পড়ে, ‘সহজ কথা বলতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায় না বলা সহজে।’ শাহ সানাউল হকের অনেক কবিতায় এই আপাত-সহজতার ভেতরেই অর্থের জটিলতা তৈরি হয়।
সাধারণত একই ধরনের কবিতা বারবার পড়লে পাঠক ক্লান্ত হতে পারেন; কিন্তু ‘প্রতিবিম্ব কবিতা’র আকর্ষণ অন্য জায়গায়। এক জোড়া কবিতার একটি পড়ার পর অন্যটি পড়ার জন্য কৌতূহল জন্মায়। পাঠক মেলাতে চান—কোথায় সেগুলোর যোগ, কোথায় বিচ্ছেদ। কোন দৃশ্য, শব্দ কিংবা অনুভব অদৃশ্য সেতু তৈরি করেছে। এই তুলনার আনন্দই পাঠককে এক জোড়া থেকে আরেক জোড়ায় নিয়ে যায়। অনেকটা দাবা খেলার মতো—একটি চালের সঙ্গে পরের চালের সম্পর্ক আছে; কিন্তু পরের চালটি আগেরটির পুনরাবৃত্তি নয়।
শাহ মোহাম্মদ সানাউল হকের ‘প্রতিবিম্ব কবিতা’ আমাদের দেখার অভ্যাস নিয়েও প্রশ্ন তোলে। আমরা যা দেখি, তার বাইরেও দেখার সম্ভাবনা থাকে। একই দৃশ্য দ্বিতীয়বার দেখলে তা আর আগের দৃশ্য থাকে না। কারণ, দর্শকও ততক্ষণে বদলে যায়। এই কাব্যগ্রন্থ তাই শুধু একটি আয়নাঘর নয়। একই দৃশ্যের সামনে রাখা দুটি আলাদা আয়না। সেগুলোর প্রতিফলন মিলতেও পারে, দূরে সরে যেতেও পারে; আর সেই দুই প্রতিফলনের মাঝখানের শূন্য জায়গায় পাঠক নিজের অর্থ খুঁজে নেন।
শেষ কথা, কবি সানাউল হকের ‘প্রতিবিম্ব কবিতা’ বাংলা কবিতায় একটি স্বতন্ত্র কাব্যিক নিরীক্ষা। এখানে প্রতিটি জোড়া কবিতা পাঠককে একই উৎসের দুটি পৃথক কাব্যিক সম্ভাবনার সামনে দাঁড় করায়। প্রতিবিম্ব এখানে স্থির নয়, হুবহু প্রতিচ্ছবিও নয়; দেখার সঙ্গে সঙ্গে তা বদলায়। কখনো আলো, কখনো ছায়া, কখনো তাদের মধ্যবর্তী অনির্ণেয় অঞ্চলটি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
কবিতা শেষ পর্যন্ত শুধু বলার নয়, কবিতা না-বলারও শিল্প। শাহ সানাউল হক সেই বলা ও না-বলার মধ্যবর্তী জায়গাটি জোড়ায় জোড়ায় অনুসন্ধান করেছেন। যাঁরা কবিতায় চিন্তার খোরাক খোঁজেন, শব্দের কারুকাজের পাশাপাশি ইঙ্গিত ও বহুস্তরীয় পাঠ ভালোবাসেন, তাঁদের কাছে ‘প্রতিবিম্ব কবিতা’ ভিন্ন ধরনের পাঠ-অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে। একই দৃশ্য থেকে দুটি স্বতন্ত্র কবিতা নির্মাণের এই পরিকল্পিত প্রয়াস বাংলাদেশের সমকালীন কবিতায় একটি সাহসী ও আগ্রহোদ্দীপক নিরীক্ষা।
প্রাবন্ধিক, সংগঠক ও সাংবাদিক
সূত্র: প্রথম আলো