বন্ধুত্বের মাধ্যমেই মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও নৈতিকতা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়। তাই কোরআনে আল্লাহ মুমিনদের নিষেধ করেছেন কিছু মানুষকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে।
কেন এই নিষেধ, তার স্পষ্ট কারণও বর্ণনা করা হয়েছে।
যাদের বন্ধু বানাতে নিষেধ করা হয়েছে
পবিত্র কোরআনে সুনির্দিষ্ট তিন শ্রেণির মানুষকে মুমিনদের অন্তরঙ্গ বন্ধু বা অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে:
১. ইসলামকে শত্রু ভাবে যে অবিশ্বাসী: যারা প্রকাশ্যেই ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুতা করে এবং ইসলাম নিয়ে উপহাস করে, তাদের বন্ধু বানাতে নিষেধ করা হয়েছে।
আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদারগণ, যারা তোমাদের ধর্মকে উপহাস ও খেলো মনে করে, তোমরা তাদের এবং কিতাবধারী ও অবিশ্বাসীদের নিজেদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না...।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৫৭)
যাদের কাছে আসমানি কিতাব ছিল কিন্তু তারা তা বিকৃত করেছে এবং ইসলামবিদ্বেষী কার্যকলাপে লিপ্ত, তাদের থেকেও দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়েছে।
২. কপট বিশ্বাসী: যারা মুখে ইমানের কথা বলে কিন্তু অন্তরে কুফরি লুকিয়ে রাখে এবং মুসলমানদের ক্ষতি করার ষড়যন্ত্র করে, তাদের ক্ষেত্রে আল্লাহ সতর্ক করেছেন। কেননা, তারা মুনাফিক।
বলেছেন, ‘মুনাফিকদের সুসংবাদ দাও যে তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আজাব। যারা মুমিনদের পরিবর্তে কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করে...।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৩৮-১৩৯)
৩. কিতাবধারী যারা শত্রুভাবাপন্ন: যাদের কাছে আসমানি কিতাব ছিল কিন্তু তারা তা বিকৃত করেছে এবং ইসলামবিদ্বেষী কার্যকলাপে লিপ্ত, তাদের থেকেও দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়েছে। (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৫১)
কেন নিষেধ করা হয়েছে
আল্লাহ কেন তাদের বন্ধু বানাতে নিষেধ করেছেন, তার যৌক্তিক কারণগুলো কোরআনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
১. ক্ষতি ও অনিরাপত্তা: অবিশ্বাসী বা শত্রুদের অন্তরঙ্গ বন্ধু বানালে তারা মুসলমানদের গোপনীয়তা শত্রুর কাছে ফাঁস করে দেবে এবং মুসলমানদের ধ্বংসের সুযোগ খুঁজবে।
আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা নিজেদের বাইরে অন্য কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না, তারা তোমাদের ক্ষতি সাধনে কোনো ত্রুটি করে না; তারা চায় তোমরা কষ্টে থাকো...।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১৮)
২. ইমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব: বন্ধুত্বের একটি স্বাভাবিক ফল হলো একে অপরের চিন্তাভাবনা ও আচার-আচরণে প্রভাবিত হওয়া।
ক্ষতিকর ও অবাধ্য মানুষদের বন্ধু বানালে ধীরে ধীরে মানুষ সৎপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে কুফরি বা পাপাচারের দিকে ধাবিত হয়।
৩. আল্লাহর অসন্তুষ্টি: যারা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে ইসলামের শত্রুদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বানায়, তারা মূলত আল্লাহর সাহায্য ও অভিভাবকত্ব থেকে বঞ্চিত হয়।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে কেউ তাদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে, সে তাদেরই দলভুক্ত বলে গণ্য হবে।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৫১)
বন্ধুত্ব নয়, সুন্দর ব্যবহার
অমুসলিম বা সমাজের অন্যান্য মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা যাবে না। কোরআনে বন্ধু বোঝাতে গিয়ে ‘ওয়ালি’ বলা হয়েছে, যার অর্থ, গোপনীয়তা শেয়ার করার মতো অন্তরঙ্গ মিত্র, যাদের ওপর অন্ধ ভরসা করা হয় এবং নীতিগত অভিভাবক হিসেবে মেনে নেওয়া হয়।
কিন্তু সাধারণ নাগরিক অধিকার, ন্যায়বিচার, সদাচার এবং অমুসলিম প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ইসলাম কোনো বাধা দেয়নি।
আল্লাহ পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, ‘যে সকল অবিশ্বাসী তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের দেশ থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে এবং তাদের সঙ্গে সদাচরণ করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না।’ (সুরা মুমতাহিনা, আয়াত: ৮)
পরিশেষে, বন্ধুত্ব হলো মানুষের বিশ্বাসের আস্থায়ী দুর্গ। নিজের ইমান, নৈতিকতা ও পরকালের মুক্তির সুরক্ষার জন্য কাদের সঙ্গে ওঠা-বসা করা উচিত এবং কাদের বর্জন করা উচিত—কোরআনের এই নির্দেশনাগুলো মুমিন জীবনের জন্য এক অতুলনীয় দিশারি।
সূত্র: প্রথম আলো